ঐতিহ্যবাহী শুভ হিজরী নববর্ষ

ঐতিহ্যবাহী শুভ হিজরী নববর্ষ

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : মুসলমানদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইবাদত বন্দেগি সবকিছুই হিজরি সালের সাথে সম্পৃক্ত। জীবন প্রবাহের গতিময়তায় কালের বিবর্তনের অমোঘ নিয়মে বিশ্ব মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে সমাগত হয়েছে আরেকটি ঐতিহ্যবাহী শুভ হিজরি নববর্ষ ১৪৪১। এখানে চাঁদকে কেন্দ্র করে সময়কাল নির্ধারণ করা হয় বলে এটি চন্দ্র বর্ষ। আমাদের এ দেশ দীর্ঘদিন ইংরেজরা শাসন করেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হয় ইংরেজি সাল। তাই এদেশের মানুষ যাবতীয় কর্মকান্ডে ইংরেজি নববর্ষকে অনুকরণ করে থাকে। আন্তর্জাতিক কারণে মানুষ ইংরেজি বর্ষকে বিপুল উদ্দীপনায় উদযাপন করে থাকে। যেমনটি করা হয় না মুসলিম মিল্লাতের ঐতিহ্যবাহী হিজরি নববর্ষের ক্ষেত্রে। অথচ ইসলামে হিজরি বর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী। মুসলমান হিসাবে হিজরী সালের প্রতি গুরুত্ব দেয়া অত্যন্ত জরুরি। কেননা মহান আল্লাহ স্বয়ং এ বর্ষের কথা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন। এই হিজরি বর্ষের সাথে ইসলাম ধর্মের অনেক বিধি-বিধানের সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছে। ইসলাম এক অখন্ড জীবন সাধনার পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা যেখানে সামাজিক ও ধর্ম চর্চা একই সাথে গাঁথা। রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কথা অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ। যে ধর্মে রয়েছে মানব জীবনের যাবতীয় সমস্যার সুষম ও সুষ্পষ্ট সমাধান। যার কারণে বলা হয়েছে ইসলাম হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এই পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার মধ্যে যদি দিন, মাস বা বছর গণনার নিয়ম পদ্ধতি না থাকত তাহলে অবশ্যই নানামুখী সমস্যা দেখা দিত। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা হিজরি বর্ষের অনেক মাস, দিন ও রাতকে মহিমান্বিত করেছে। করেছে অধিক পণ্য ও কল্যাণের সাথে তাৎপর্য মন্ডিত। ইবাদতের সাথে রয়েছে হিজরির নিবিড় সম্পর্ক।

অতএব সঙ্গত কারণে এর গুরুত্ব ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম। ইসলামী অনুষ্ঠানমালার সাথে হিজরি সালের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত অর্থাৎ ইবাদতের সাথে রয়েছে হিজরী সালের মিলন। কেননা এ বর্ষগণনার মাধ্যমে সময়কাল নির্ধারণ করত জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষের সম্মুখে প্রতিভাত হয়। যেমন ১০ই মহররম পবিত্র আশুরা, সফর মাসের শেষ বুধবারে পালিত হয় আখেরি চাহার সোম্বা, ১২ রবিউল আউয়ালে পালিত হয় ঈদে মিলাদুন্নবী (সা), ১১ই রবিউসসানি পালিত হয় ফাতেহা ইয়াজ দহম, ২৭ রজব পালিত হয় শবে মিরাজ, ১৪ই শাবান দিবাগত রাতে পালিত হয় শবে বরাত, পবিত্র রমজানের ১ মাস পালিত হয় সিয়াম ও সাধনা, ২৬শে রমজান দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত হয় লাইলাতুল কদর, শাওয়াল  মাসের ১ তারিখে পালিত হয় মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর, এরপর জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত উদযাপিত হয় পবিত্র হজ্ব। আর ১০ জিলহজ্ব পালিত হয় ত্যাগের মহিমায় দিপ্ত ঈদ-উল-আযহা বা কোরবানীর ঈদ। মোট কথা মুসলিম সমাজের দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে হিজরি বছরের গুরুত্ব অবর্ণনীয়। হিজরি বর্ষ ইসলামের পরিচয়কে লালন করে এর মহত্ত্বকে চিত্রায়িত করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মুসলমানগণ এ বর্ষ গণনা শুরু করে হিজরি সাল হতে। অর্থাৎ ৬৩৯ খ্রিঃ হযরত উমর (রা) এর খেলাফত আমলে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা) এর খেলাফতের সময় ইরাক ও কুফার গভর্নর ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু মুসা আশআরী (রা)। একদিন তিনি খলিফা ওমর (রা) এর নিকট চিঠি লিখলেন যে হে আমিরুল মোমেনিন আপনার পক্ষ থেকে নছিহত, পরামর্শ ও নির্দেশনা সম্বলিত যে সমস্ত চিঠিপত্র আমাদের নিকট এসে হাজির হয় তাতে কোন তারিখ বা সে রকম কোন ইঙ্গিত না থাকায় কার্য সম্পাদনা বা নির্দেশ পালনে বিপাকে পড়তে হয়। পূর্বাপরের নির্দেশনার সাথে পার্থক্য করাও দূরুহ হয়ে পড়ে। কুফার গভর্নরের এই চিঠি পেয়ে দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা) একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে। যেখানে হযরত ওসমান (রা), হযরত আলী (রা) সহ অনেক বিশিষ্ট সাহাবী উপস্থিত থেকে একটি স্বতন্ত্র সন ও তারিখ প্রবর্তনের ওপর ঐকমত্য পোষণ করেন। কিন্তু সনটির সূচনা নির্ধারণ এবং কোন মাসের কত তারিখ থেকে এই সালের গণনা শুরু হবে এ নিয়ে চলে মত পার্থক্য।

কোন কোন সাহাবী রাসুল (সা) এর জন্ম তারিখ থেকে সাল গণনার প্রস্তাব দেন। আবার কেউ কেউ নবুয়ত প্রাপ্তির সাল হতে গণনা শুরু করার প্রস্তাব দেয়। কেউ কেউ নবী (সা) এর মৃত্যুর তারিখ হতে নতুন সাল গণনার কথা বলে। হযরত ওমর (রা) সকলের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেন যদি নবী (সা) এর জন্ম তারিখ ধরা হয় তবে সেটা খ্রিষ্টানদের অনুকরণ করা হবে, তারা ঈসা (আ) এর জন্ম তারিখ থেকে সাল গণনা শুরু করেছেন। অন্যদিকে মৃত্যুর সাল গণনা করলে সেটা হবে জাহেলি যুগের অনুকরণ। নানাবিধ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে স্বয়ং আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর (রা) নিজস্ব একটি প্রস্তাব পেশ করে বলেন যে ইসলামের একটি যুগান্তকারী ঐতিহাসিক দিন হিজরত থেকে সাল গণনা শুরু করা হোক। সকলেই এক বাক্যে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রকাশ থাকে যে, ইসলামী চেতনা যখন এ ধরাধামে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল, মহানবী (সা) ধর্মের প্রচার ও প্রসারে নিরলস-ভাবে এগুচ্ছিলেন, তখন মক্কার নিষ্ঠুর পৌত্তলিক সম্প্রদায় কতিপয় নবীন মুসলমানদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালাতে থাকেন। উত্তপ্ত বালুতে টেনে হিচড়ে জ্বলন্ত অংগারে রেখে বুকের উপর চেপে দিতেন বড় বড় পাথর। সাহাবীদের শরীর ঝলসে যেত মরুভূমির উত্তাপ ও ফুটন্তবালুর গরমে। দেখা যেত প্রচন্ড বালির গরমে অনেক সাহাবীর শরীরের চামড়া পুড়ে চর্বি গলে তেল বের হয়ে মরুভূমির বালি ভিজে যেত। ইতিহাসের অমানবিক নিষ্ঠুরতায় পৈশাচিকতায় সাহাবীরা অবর্ণনীয় নির্যাতন নিপীড়নে শিকার হয়ে ধৈর্য্যরে মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখেছিলেন এই হিজরতের মাধ্যমে নবুয়তের পঞ্চম বর্ষে প্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরত এবং ষষ্ঠ সনে দ্বিতীয় দফায় ওই দেশে সাহাবীরা হিজরত করেন। পর্যায়ক্রমে শুরু হয় মদিনায় হিজরতের সুচনা। কাফেরদের অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যায়, বর্বর নির্যাতন হিংস্রতা বিরূপ আকৃতি লাভ করে। তাদের অসভ্যতা ও নিষ্ঠুরতা চরম আকার ধারণ করে। ফলে এই বেঈমান অসভ্য, হিংস্র দানবগুলো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা) কে দুনিয়া থেকে চির বিদায় করে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ১০০টি উট।

যে ব্যক্তি মহানবী (সা) কে জীবিত বা মৃত অবস্থায় এনে দিতে পারবে তাকেই দেয়া হবে এই লোভনীয় ১০০টি উট পুরস্কার। এই উটের লোভে হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে অনেক তীরন্দাজ। কোষমুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘেরাও করে মহানবী (সা) এর বাড়ি। চতুস্পার্শ্বে অবরোধ করে রাখে। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে। মহানবী (সা) মাত্র এক মুষ্টি বালি ছিটিয়ে দিয়ে কোরাইশদের সকল অবরোধ ও ষড়যন্ত্র ভেদ করে বেরিয়ে পড়েন। হযরত আবু বক্কর (রা) কে সাথে নিয়ে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি পেরিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। ফলে শুরু হয় ইসলামের নয়া দিগন্ত, স্থাপিত হয় মসজিদের নববী, কায়েম হয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, নাযিল হয় রমজানে এক মাস রোজা, যাকাত ও হজ্বের বিধান। প্রণীত হয় পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান মদিনা সনদ ও হোদায়বিয়ার সন্ধি। যা কোরআনের ভাষায় ফাতহুম মোবিন বলা হয়। যা ছিল প্রকাশ্য বিজয়। এক কথায় ইসলাম পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে এই হিজরতের মাধ্যমে। তাই হিজরতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম বলে হযরত ওমর (রা) এ হিজরত থেকে নতুন সাল গণনা শুরু করেন। নবী (সা) এর হিজরত অনুসারেই এই সালকে হিজরি সাল হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। রবিউল আউয়াল মাসে এই হিজরত বাস্তবায়িত হলেও এর প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয় মহররমে মাসে তাই মহররম মাসকেই হিজরি বছরের প্রথম মাস গণনা শুরু করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই হিজরি সাল ধরেই যাবতীয় দলিল, দস্তাবেজ, নথি, চিঠি, খতিয়ান, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি জরুরি ক্ষেত্রে সন তারিখের গুরুত্ব অনুধাবন করে হযরত ওমর (রা) একটি খাঁটি ইসলামী ক্যালেন্ডার প্রণয়নের নির্দেশ দেন। তখন থেকেই শুরু হয় হিজরি সালের উদ্ভব। এই হিজরি সালের প্রথম মাসেই রয়েছে অনেক ঐতিহ্যবাহী ও ফজিলতপূর্ণ ঘটনা। রয়েছে আশুরার মত বরকত ও ফযিলতের দিন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হিসাবে ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের জন্য হিজরি বর্ষের গুরুত্ব অনুধাবন, অনুকরণ ও অনুসরণ করা মুসলিম দেশগুলোর একান্ত কর্তব্য বলে আমি মনে করি। আল্লাহ আমাদেরকে নতুন বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় ধর্মীয় কর্মকান্ড  বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন। সেই সাথে সকল পাঠক ও শুভাকাঙ্খিদের জানাই হিজরী নববর্ষের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
লেখক : প্রভাষক-কলামিস্ট [email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮