ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হয় সভ্যতার প্রয়োজনে

ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হয় সভ্যতার প্রয়োজনে

আতাউর রহমান মিটন:বছরের শুরু আর সরকারের শেষ সময়ে দাবি আদায়ে একের পর এক মাঠে নামছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের টানা ১৭ দিনের সংগ্রামে সাফল্য অর্জনের ঘটনায় অন্যান্যদের মধ্যে উৎসাহ জেগে উঠেছে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব এর সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচি গ্রহণ করে গণমাধ্যমের সহায়তায় নীতি নির্ধারকদের নজর কেড়ে নিজেদের দাবি মেটানো একটা জনপ্রিয় কৌশলে পরিণত হয়েছে। শেষ সময়ে সরকারকে যেন কেউ বেকায়দায় ফেলতে না পারে বা অন্য কোন মহল যেন এসব আন্দোলন থেকে নিজেদের ঘরে ফসল তুলতে না পারে সেজন্য সরকারও এসব আন্দোলনকে বেশ নমনীয়ভাবে  গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে।  

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা যোগ্য গ্রেডেশন ও আপ্যায়ন ভাতা বৃদ্ধির পুরনো দাবি আদায়ে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। জানা গেছে, বিসিএস কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিরাও ভেতরে ভেতরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সবাই সরকারের শেষ সময়কে নিজেদের দাবি পূরণের একটা মোক্ষম সময় হিসেবে বিবেচনা করছে। অনেকে অবশ্য এসব আন্দোলনের নেপথ্যে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা বা সরকারকে বিব্রত করার অপপ্রয়াসও দেখতে পাচ্ছেন।

‘সারা অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’? বঞ্চনা আর বৈষম্যে ভরপুর আমাদের মত সমাজে মানুষের নানামুখি দাবি-দাওয়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক। দেশের ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক প্রতিনিধিবৃন্দ তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে ‘আমরণ অনশন’ শুরু করেছেন। অন্যদিকে, দেশের সব জেলায় আগামী ২২ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে ঐসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় সাত লাখ শিক্ষক-কর্মচারি। বছরের শুরুটা হয়েছে আন্দোলন দিয়ে, আন্দোলন এখনও চলছে এবং আগামী দিনগুলোতেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে সেটা ধরে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। ভুক্তভোগীদের ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি আমাদের সহানুভূতি আছে কিন্তু সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের কৌশল পাল্টানো দরকার।  

আর সরকারেরও উচিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে ভুক্তভুগিদের বা সাধারণ মানুষের আবেগ বিবেচনায় নেয়া। এমন অনেক বিষয় আছে যা সরকারের জন্য বা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একইসাথে পরিবেশ ও প্রতিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। এই সরকারের বিগত সময়ে মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর স্থাপনের একটি প্রকল্প সরকারকে আন্দোলনের মুখে ‘স্থগিত’ করতে হয়েছে। আবার বাগেরহাটের রামপালে জনমতের তোয়াক্কা না করেই সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে। পাবনার রূপপুরে সরকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিরোধিতাকে সরকারের বিরোধিতা বা ‘পশ্চাৎপদ উন্নয়ন ভাবনা’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। জনমনে এ বিষয়গুলোতে মত-পার্থক্য রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে একগুয়েমির পরিচয় দিয়ে সরকারের রাজনৈতিক তেমন কোন লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না।

সরকারকে উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। আমরা জানি, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবেশের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সব সময় দুটো মতই দেখা যায়। যেমন, আমরা বন্যার কবল থেকে বাঁচতে চাই আবার বাঁধ নির্মাণেরও বিরোধিতা করি। নৌ-যোগাযোগ আমাদের মত নদীমাতৃক দেশে সবচেয়ে ভাল বিকল্প হলেও আমরা সড়ক পথ নির্মাণকেই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে ধরে নেই। একটি যমুনা সেতু বা একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ তাই আমাদের কাছে সরকারের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারও সেটা বোঝেন, তাই পরিবেশ উপেক্ষা করে হলেও মেগা সব প্রকল্প হাতে নিয়ে তাঁরা জনগণের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার ষোল আনা চেষ্টা করেন। তবে সরকার একটু সদয় হলে মানুষের আবেগ আহত না করেও উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারেন।
গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে হলে এই সড়কে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত, শতবর্ষী গাছগুলোকে কেটে ফেলতে হবে।

 পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ৬ই জানুয়ারি শনিবার যশোর জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে এই গাছগুলো কেটে ফেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। খুব সঙ্গত কারণেই আমিও সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাই এবং সরকারকে বিষয়টি সহৃদয়তার সাথে পুনর্বিবেচনার দাবী জানাই। আমার বিশ্বাস চিন্তাশীল ও দরদি যে কোন মানুষ এই গাছগুলো রক্ষার ব্যাপারে একমত হবেন। এটা কেবলমাত্র নকশা পরিবর্তনের বিষয় যা সরকারের নির্বাহী আদেশেই করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলেই এই নকশা দ্রুততার সাথে পরিবর্তন করে সরকারের কাঙ্খিত সময়ের সাথে তাল রেখেই প্রকল্প এগিয়ে নেয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। রাস্তা প্রশস্ত করার সাথে গাছ কাটার সম্পর্ক নেই বরং ‘গাছখেকো’দের লোলুপ দৃষ্টি এখানে মূল কারণ বলে স্থানীয় পরিবেশ বন্ধুরা মনে করেন।

উল্লেখ্য, যশোর শহর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত ৩৮ কি.মি. রাস্তায় প্রায় ২৩ শত ১২টি গাছ রয়েছে যার মধ্যে প্রায় ২০০’র বেশি গাছ রয়েছে যাদের বয়স ১৭০ বছরের বেশি। এই গাছগুলোর সাথে এই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্মৃতি জড়িত থাকা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের আবেগ বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। আন্দোলনকারীদের দাবি গাছগুলো ভেতরে রেখে দুপাশ দিয়ে রাস্তা সম্প্রসারণ করা, কোন কোন স্থানে প্রয়োজনে বিকল্প বা বাইপাস সড়ক তৈরী করা হোক। যশোর-বেনাপোল একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক এবং আগামীতে এই সড়কের উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল আরও বৃদ্ধি পাবে। এই সড়কটি শুধু চার লেন নয়, একদিন হয়তো ঢাকা চট্টগ্রামের মত ৬ বা ৮ লেনেও উন্নীত করতে হতে পারে। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখে নতুন করে ডিজাইন করে কাজে হাত দেয়ার জন্য দেশব্যাপী দাবি উঠেছে।

‘গাছখেকো’ মহলটি নানাভাবে যুক্তি দিয়ে গাছ কাটার পক্ষেই বলবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইস্যুটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। বৃটিশ আমলে যশোরে একটি বিমানঘাঁটি নির্মিত  হয়েছিল। কলকাতার সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য বর্তমানের এই পাকা সড়কটি বৃটিশ আমলে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। যশোর রোড নামে পরিচিত এই সড়কটি বনগাঁ হয়ে কলকাতার দমদম পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৭১ সালে এই রোড দিয়েই লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ভারতে গিয়েছিল আশ্রয়ের জন্য। বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে বিখ্যাত গায়ক বব ডিলান সেই কবিতাকে গানেও রূপ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আবেগের সাথে তাই ‘যশোর রোড’ একাকার হয়ে আছে।

গাছেরও জীবন আছে। প্রকৃতির নিয়মে গাছগুলো হয়তো একদিন মারাও যাবে কিন্তু স্মৃতি তো মুছে যাবে না! গত ৪৬ বছরে নিঃসন্দেহে অনেক গাছই মরে গেছে। অনেক গাছ হয়তো দৃর্বৃত্তের কোপে আহত হয়ে ধীরে ধীরে প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু মানুষের মন তো মরে যায় নি। ঐ সড়কে যারাই একবার গিয়েছেন তারা এখনও মুগ্ধ হয়ে ঐ গাছগুলো দেখেন। বাংলাদেশের আর কোথায় আছে এমন পুরনো সব গাছ? এগুলো তো প্রকৃতির এক অনন্য জাদুঘর! প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যমাখা এই গাছগুলো ঘিরে রয়েছে অনেক গল্প। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এমন একটি গল্প শুনেছিলাম। স্থানীয় এলাকায় কথিত আছে মোঘল স¤্রাট আকবরের আমলে তৎকালীন মোহাম্মদ শাহী পরগণার অন্তর্গত নলডাঙ্গার রাজা প্রমথ ভূষণ রায় বাহাদুর এর মা কলকাতা যেন নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারেন সেজন্য রাজা প্রমথ ভূষণ রায় এই গাছগুলো লাগিয়েছিলেন। সে কারণে কালীগঞ্জ এবং ঝিনাইদহ সড়কেও একই ধরনের পুরনো গাছ দেখা যায়।

অন্য আরেকটি গল্প থেকে থেকে জানা যায়, যশোরের (নড়াইলের) জমিদার কালী পোদ্দারের মা যেন ছায়ায় ছায়ায় গঙ্গাস্নানে কলকাতা যেতে পারেন সে উদ্দেশ্যে জমিদার কালী পোদ্দার ১৮৪০ সালে যশোর শহরের বকচর থেকে ভারতের নদীয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ১৮৪২ সালে সড়কটি নির্মাণের কাজ শেষে তিনিই বিদেশ থেকে অতিবর্ধনশীল রেইন্ট্রি বৃক্ষের চারা এনে সড়কের দুধারে রোপণ করেন। সেই বৃক্ষগুলোই যশোর-বেনাপোল রোডকে এখনো ছায়া দিচ্ছে।
দুটো গল্পেরই মূল্য বক্তব্য একজন মায়ের যাত্রাপথ নির্বিঘœ করা, ছায়া সুশীতল প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলা।

 এর সাথে যোগ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, যিনি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন, সেই একজন দরদি মায়ের কাছে দেশের লক্ষ কোটি মানুষ আকুল আবেদন জানাচ্ছে এই গাছগুলো রক্ষা করার। যশোরে জন্ম নেয়া জনপ্রিয় অভিনেতা রিয়াজ বলেছেন, ‘গাছ আমাদের পরম মমতায় শীতল ছায়া দেয়, দেয় ফল, ফুল, নির্মল বাতাস। একজন মমতাময়ী মায়ের কাছে ২০০০+ গাছের জীবন ভিক্ষা চাই।’ উন্নয়নের জন্য মানুষের আবেগকে আহত করা আমি সমর্থন করি না। ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে সভ্যতার প্রয়োজনে। আজ এই বিধ্বংসী কাজ রুখে দাঁড়াতে না পারলে আগামী প্রজন্ম আমাদের দায়ী করবে। সেই ব্যর্থতার দায় বর্তমান নেতৃত্ব নিবেন কি না সেটা তাঁরাই ঠিক করুন। প্রয়োজনে বিকল্প বা বাইপাস সড়ক নির্মাণ করুন। যশোর রোডের স্মৃতি অম্লান থাকুক।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১৫২৬৯৭৯