এলোঙ্গীআটা একটি গ্রামের নাম

এলোঙ্গীআটা একটি গ্রামের নাম

তাহমিনা আকতার পাতা : আমাদের সমাজে যে সব অসহায় সুবিধা বঞ্চিত শিশু অবহেলায় বেড়ে ওঠে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত কারণ শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দুর্গম, প্রত্যন্ত এলাকায় বেড়ে ওঠা শিশুদেরকে আলোর পথ দেখানো দরকার। এ দায়ভার আমাদের সবারই। এছাড়া সমাজে নারীর উপর ঘটে যাওয়া নানা রকম নির্যাতন, অত্যাচার ঘটেই চলেছে। কখনও যৌতুকের শিকার কখনও পারিবারিক নানা লাঞ্ছনা গঞ্জনা অত্যাচারে নারীর জীবন অতিষ্ঠ হতে দেখেছি। নারী মানুষ হয়েও কেন একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে? নারীকে কেন শুধু নারী ভাবা হয়? জগৎ সংসারে নারীও মানুষ এ প্রশ্নগুলো ছোটবেলা থেকেই আমাকে নাড়া দিতো। উপলব্ধিগুলো আমার মধ্যে নারীর প্রতি কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহ জাগ্রত করেছে। বিশেষ করে সুবিধা বঞ্চিত নারী ও শিশুদের কষ্ট আর জীবন যন্ত্রণা ভীষণভাবে তাড়িত করে। আমার এ উপলব্ধি থেকেই “নারী স্বাধীনতা একটি জটিল প্রক্রিয়া” প্রবন্ধ গ্রন্থটি লেখার দায়িত্ব অনুভব করেছি। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যারা অসহায় পথ শিশু কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা বঞ্চিত সেই সব শিশুদের নিয়ে আমাদের ব্যাপক কাজ করা উচিত। তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রকৃত আলো পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করি। সেজন্য বই পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বই এর কোন বিকল্প নেই। বই হচ্ছে জ্ঞানের ধারক ও বাহক। জ্ঞান অর্জন করে একজন মানুষ বিবেকবান, সচ্চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। সৎ এবং বিবেকবান মানুষ আমাদের সমাজে খুবই প্রয়োজন। বই পড়ার মাধ্যমে একটা জাতি তার শিক্ষা, সংস্কৃতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই বই সবার মাঝে কিংবা যে কোন জায়গায় ছড়িয়ে দেবার মধ্যে কোন দ্বিধা নেই। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি সব ছাত্র-ছাত্রীকে বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক বই পড়তেও আগ্রহী হওয়া উচিত। এই ধারণা থেকে আমার মনে হয়েছে প্রত্যন্ত এবং দূর্গম চরাঞ্চল এলাকা যেখানে ছোট ছোট কোমলমতি ছেলে-মেয়েরা স্কুলের পাঠ্য বই ছাড়া অন্য কোন বই পড়তে জানে না।

 তাদের লক্ষ্যে আমি চৌহালী উপজেলার পুলিশ ষ্টেশন থানা এলাকা এনায়েতপুরে ১ নং ইউনিয়নের সদিয়া চাঁদপুর এলোঙ্গী আটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই পাঠাই এবং ছেলে- মেয়েদের জন্য একটা পাঠাগার করার স্বপ্ন নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু বই পাঠিয়ে দেই। এই স্কুলের বাচ্চারা পাঠ্য বই ছাড়া কোনদিন গল্পের বই বা অন্য কোন বই চোখে দেখেনি। আমার পাঠানো বই পড়ে তারা সর্বপ্রথম বুঝতে শিখেছে পাঠ্য বইয়ের বাইরেও পড়ার বই আছে এবং সে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন কেন এই দূর্গম চরে বই পাঠালাম। এর একটা জোরালো কারণ আছে। আমি নদী খুব পছন্দ করি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরা নদীর ওপারে চরে কি আছে, আমাদের নাগরিক জীবনের বাইরে চর অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রা কেমন এই ইচ্ছা ও জানার আগ্রহ থেকে ২০০২ সালে মে মাসে প্রায় দুই মাইল ধূ-ধূ বালুচরের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এলোঙ্গী আটা এলাকায় যাই। সেখানকার  স্কুলটি ২০০০ সালে স্থানীয় লোকজনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। তখন অল্প কিছু ছাত্র-ছাত্রী ও স্থানীয় দু,এক জন শিক্ষক নিজ দায়িত্বে পাঠ দান দিতে থাকেন। টিনের একটি দোচালা ঘর, চার পাশে চাটাই বেড়া লাগানো ঘরটিতে অল্প পরিসরে ক্লাস চলতে থাকে। স্কুলটি যখন দেখেছি তখন সবে শুরু হয়েছে।

 এরপর আস্তে আস্তে বেশ ভালোভাবে চলতে থাকে এবং ২০১৬ সালে এই স্কুল সরকারি হয়। সেখানে ফাঁকা মাঠ, বালু চর সহজ-সরল মানুষদের সুন্দর আচরণ আমাকে মুগ্ধ করে। শান্ত বাতাসের ঝাপটা নির্মল প্রকৃতির মাঝে ওই সব মানুষদের মনে হয়েছে তারা খুব নির্মল মনের সাদা-সিধে মানুষ। আমাদের নাগরিক যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এদের কে আমার কাছে মনে হয় খুব সুখী। সন্ধ্যার শুনশান নিশুতি শব্দে এরা ঘুমিয়ে যায়, আর ভোরের পাখির ডাকে তাদের ঘুম ভাঙে। তবে সেই সাথে আমার উপলদ্ধিতে একথাও কাজ করেছে যে প্রকৃতিগত ভাবে এরা যতোই সুখী হোক না কেন, এখানকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে পাঠ্য বইয়ের বাইরেও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে এসব ছেলেমেয়েরা বাইরের জগৎ সম্মন্ধে জানবে কিভাবে? তখন মনে মনে স্থির করি সময় সুযোগ বুঝে এ এলাকার বাচ্চাদের জন্য বই পাঠাবো। শহর ও শহরতলী কিংবা অন্যান্য স্বাভাবিক গ্রামাঞ্চলে আজকাল সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক পাঠাগার গড়ে উঠেছে। সেসব স্থানে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি প্রধানগণ সহজেই যাতায়াত করে জনসাধারণের মধ্যে সুযোগ সুবিধা করে দিতে পারেন। কিন্তু চরের মানুষের কাছে সব সময় সবার বার্তা পৌছানো সম্ভব হয় না। দূর্গম এলাকার নিরীহ মানুষ আধুনিক জীবন যাত্রার সাথে সম্পর্কিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বঞ্চিত হয়। পৃথিবী যেখানে প্রতিক্ষণ একটু একটু করে পরিবর্তন হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে  চরের ছেলে মেয়েরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, কল্প কথা, গল্প গাঁথা সহ নানা বিষয়ের উপর কেন অজ্ঞ থাকবে? তারা অনেক কিছুই জানে না। এ অনুভব-অনুভূতি  থেকে আমি এলোঙ্গী আটা গ্রামে বই পৌঁছায়েছি।
লেখক ঃ আইনজীবি-প্রাবন্ধিক
ঁজজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১-৮২৫৫৫৪