এলএনজি আমদানি সত্ত্বেও পুরনো গ্যাস সংকট

এলএনজি আমদানি সত্ত্বেও পুরনো গ্যাস সংকট

স্টাফ রিপোর্টার : তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি হলে গ্যাস সংকট থাকবে না, এমন প্রত্যাশা এখনও পূরণ হলো না। তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় শুরু হয়েছে গ্যসের সংকট। ক্রমে তা  বিগত বছরগুলোর মতো তীব্র আকার ধারণ করছে। যদিও এখনও শীতকাল শুরুই হয়নি। গত কয়েক বছর গ্যাসের ঘাটতির কথা বলা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রামে দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। কাতার থেকে আমদানি করা এই তরল গ্যাসে চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে সেখানে আর গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে এতদিন চট্টগ্রামে যে গ্যাস সরবরাহ করা হতো তা ঢাকাসহ আশপাশে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই গ্যাস যদি যুক্ত হলে নগরবাসীর গ্যাস সংকটে পড়ার কথা নয়। এখনও শীত শুরু হয়নি। অথচ হালকা আঁচের চুলায় রান্না করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। গত ১৮ আগস্ট থেকে ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে তোলা সম্পূর্ণ গ্যাসই (দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট) দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে  চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি কমে যাবে বলে জানায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে গত ৩ নভেম্বর থেকে ১৫ নভেম্বর এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় গ্যাস সংকটের কথা নতুন করে আলেচনায় আসে। ১৬ নভেম্বর থেকে আবার চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। এরপরও রাজধানীতে কমছে না গ্যাস সংকট। এ বিষয়ে তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) কামরুজ্জামান খান বলেন, চট্টগ্রামে এখন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে।

 পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড থেকে আরও ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ ছিল। এর মধ্যে আগে গড়ে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এলএনজি চট্টগ্রামে সরবরাহের ফলে ঢাকায় কিছু বাড়তি গ্যাস পাচ্ছে। সেই গ্যাস দিয়ে সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র চলছে। তিনটা সারকারখানা, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল। এই গ্যাস এখন সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে। রাজধানীর গ্যাস সংকটের বিষয়ে কামরুজ্জামান খান বলেন, কিছু সংকট থাকবেই। কারণ শীতকালে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। এখন গড়ে ৫-৭ ঘণ্টা গ্যাস ব্যবহার করা হয়। পানি গরম করা, কাপড় শুকানো, খাবার গরম করে বেশি, এমনকি ঘর গরম রাখার জন্যও অনেকে দিনের পর দিন গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখে। এজন্য গ্যাসের চাহিদাটা বেড়ে যায়। এছাড়া কারিগরি সমস্যার কারণেও অনেক সময় সব জায়গায় সমান গ্যাস সরবরাহ করা যায় না। তার মতে, চাহিদা অনুযায়ী যদি পুরো গ্যাসও সরবরাহ করা হয় তাও  ঘাটতি পুরোপুরি কেটে যাবে না। কারণ দিন দিন চাহিদাও বাড়ছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, সব মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা রয়েছে তাদের অধীন এলাকাগুলোয়। এছাড়া নতুন অনুমোদিত শিল্পে সংযোগ দেওয়া শুরু হলে আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদা বাড়বে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে আবাসিকে চাহিদা আছে ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, প্রথমত, যে পরিমাণ এলএনজি এসেছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংযোগও বাড়ানো হয়েছে।

 দ্বিতীয়ত, ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আনা হচ্ছে। বিপরীতে চট্টগ্রামে গ্যাসের বুভুক্ষ। সেখানে যে গ্যাস সরবরাহ করা হয় সেখান থেকে তো গ্যাস তুলে এনে রাজধানীতে সরবরাহ করা যাবে না। তৃতীয়ত, গ্যাস চুরি তো বন্ধ করা যায়নি। গ্যাস চুরি বন্ধ না করে পুরো গ্যাস সেক্টরকে তলাবিহীন ঝুড়ি বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। সেই তলা বন্ধ করতে হবে আগে। নইলে যা দেবেন তা দিয়ে সংকট কাটবে না, যদি চুরি অব্যাহত থাকে। সেই চুরি তো কেউ আমলে নিচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, রাধিকা মোহন বসাক লেন ও আশপাশের এলাকা, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট চলছে মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, রিং রোড, কল্যাণপুর, রামপুরা, বনশ্রীসহ আশপাশের এলাকায়। পাশাপাশি উত্তরার দিকেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বনশ্রীর বাসিন্দা হাফিজা আক্তার জানান, সকাল ৬টা থেকে তার বাসায় গ্যাস থাকে না। আসে দুপুর দেড়টা-দুটোর দিকে। এই সময়ে চুলায় গ্যাস একেবারেই থাকে না। ভাত রান্নাতো দূরের কথা পানিও গরম করা যায় না।  তিনি বলেন, ‘যেহেতু গ্যাস থাকেই না তাই বিকল্প উপায়ে রান্নার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। অন্যবার শীতের সঙ্গে এবার শীতে গ্যাস সরবরাহে কোনও পার্থক্য দেখছেন না হাফিজা আক্তার। মোহাম্মদপুরের সুরাইয়া বেগমের ভাষ্যও একই। গ্যাস সরবরাহে আদৌ কোনও উন্নতি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোথায় উন্নতি হয়েছে? গত বছর যেমন ছিল এবারও তো তাই দেখছি।’ বরং ভোগান্তি বাড়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আগে দুপুরের দিকে আসতো এখন দুপুর গড়িয়ে কখনও কখনও বিকেল হয়, তবেই গ্যাস আসে।