ফুলে ফুলে ভরেছে শহীদ মিনার

একুশের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা

একুশের শহীদদের  প্রতি গভীর শ্রদ্ধা

স্টাফ রিপোর্টার: একুশ মানে মাথা নত না করা, একুশ মানে বাংলা জয়ের প্রথম প্রহর। সবার হাতে হাতে ফুল, কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। বিনম্র শ্রদ্ধা, যথাযথ মর্যাদা আর ভালোবাসায় বৃহস্পতিবার মধ্য রাত থেকে হাজারো মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তারা কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে অমর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রীবর্গ ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে শহীদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সকালে বিএনপির নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনার এলাকা ছেড়ে গেলে রাত ১২টা ১৬ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এরপর জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ শ্রদ্ধা জানান। পরে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলীয় নেতাদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়ররা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

 এ সময় জনতার ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারে আওয়ামী লীগ, ১৪ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকেও বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের বিচারপতিরা, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত, ওআইসি প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) উপাচার্য ও ঢাবির শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশান, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদ ও হল কর্তৃপক্ষ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, পূজা উদযাপন পরিষদ, বৌদ্ধ ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, স্বেচ্ছাসেবক ধারা, বিশ্ব বাঙালি সংঘ, বিপ্লবী পাদুকা শিল্প শ্রমিক সংহতি, হাজী মুহম্মদ মুহসিন হল, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। মাতৃভাষার প্রতি সম্মানের এ আয়োজনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সব বয়সী নারী-পুরুষ-শিশুসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণে মুখর ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। যেখানে যোগ দেন ভিনদেশী নাগরিকরাও। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ফুলে শুক্রবার দুপুরের আগেই ভরে উঠে পুরো শহীদ মিনারের বেদী। সেখানে দায়িত্বরত বিএনসিসি, রেডক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট, স্কাউটসহ স্বেচ্ছাসেবকরা শ্রদ্ধাঞ্জলির সেসব ফুল থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন বেদীতে। তাদের অনেকেই ফুল দিয়ে ফুটিয়ে তুলে ধরেছেন বিশ্বের বুকে দেশের মানচিত্র, বাংলা ভাষার বিভিন্ন অক্ষর। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে ভাষা শহীদদের। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।
ভাষা শহীদদের সমাধিতে ঢাবির শ্রদ্ধা
রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবসের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে প্রভাতফেরি করে আজিমপুর কবরস্থানে যান। সেখানে শহীদ বরকত, জব্বার ও শফিউরের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা। ভাষা শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয় সেখানে। এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ডিন, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। দুপুরে জুমার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ, সকল হলের মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে সন্ধ্যায় টিএসসি মিলনায়তনে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শহীদ মিনারে ডাকসুর শ্রদ্ধা
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতৃবৃন্দ। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালো ডাকসুর নির্বাচিত কোনো কমিটি। দিবসের প্রথম প্রহরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ছাত্র পরিবহন সম্পাদক শামস ই নোমান, ডাকসুর সদস্য রকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য, চিবল সাংমা, তিলোত্তমা শিকদারসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। তবে তাদের সঙ্গে দেখা যায়নি ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূরকে। তিনি শ্রদ্ধা জানান আলাদাভাবে। ভিপি নুরুল হক নূর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন আলাদাভাবে প্রভাতফেরিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করেন। এ সময় বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।