একুশ মানে কারো কাছে মাথা নত না করা

একুশ মানে কারো কাছে মাথা নত না করা

হমেদ তপাদার : পৃথিবীতে এমন ইতিহাস বিরল যে জাতিকে ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। প্রতিটি জাতি চায় নিজস্ব ভাষার স্বাধীনতা, প্রাণ খুলে কথা বলার অধিকার আর স্বাধীন ভূমিতে বসবাস করার স্বীকৃতি। বাঙালিদের ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধ জাতিকে এনে দিয়েছিল পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করে, মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আর একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতির স্বীকৃতি। আর তাইতো আমাদের গর্বের একুশে ফেব্রুয়ারী তার সাথে যুক্ত হয়েছে বই মেলা। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবস পালনে যে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আয়োজন তা যত বিশাল হোক, দেশ-বিদেশে যত সমাদৃত হোক, এর মধ্যে একমাত্র ইতিবাচক দিক হচ্ছে ভাষা আন্দোলন ও আনুষঙ্গিক ঘটনাবলি নিয়ে সাংস্কৃতিক মূল্যায়ন, নিরপেক্ষ বিচার-ব্যাখ্যা, সেমিনার, আলোচনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি মূলত বাংলা একাডেমি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ঘিরে। সন্দেহ নেই, এগুলোর নান্দনিক মূল্য রয়েছে। বইমেলা সম্পর্কে কমবেশি কিছুটা হলেও অনুরূপ কথা বলা চলে। এর বাইরে আমরা প্রকৃত একুশকে খুঁজে পাই না। পাই না তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে, যা সমাজশ্রেণি ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ ক্ষেত্রে সবটাই রাজনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। মানুষ পূর্ব-আবেগের কথা স্মরণ করে, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য আত্মদানের কথা স্মরণ করে আবেগের টানে রমনা এলাকায় ভিড় জমায়। ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করে। এই মিছিলে, সমাবেশে, শহীদ মিনারে রাত ১২টা-পরবর্তী উপস্থিতিতে একুশে নেই, আছে রাজনৈতিক দলের স্বার্থনির্ভর গতানুগতিকতা পালন।

একুশের মিছিলে অন্যতম প্রধান স্লোগান ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করো’ এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে। শাসনবলয়ে রাজা আসছেন, রাজা যাচ্ছেন। কিন্তু একুশের মূল আকাঙ্খা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। বছরের পর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। একুশ এলে বাংলা একাডেমিতে সমারোহ, শহীদ মিনারে যথারীতি কর্তব্য সমাপন, মিছিল, জনসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একুশের পরিসমাপ্তি। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি শুধু লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। একাকিত্বের মধ্যে যদি সঙ্গ দেওয়ার কোনো ব্যাপার থাকে, তাহলে তা বই থেকে পাওয়া যায়। তাছাড়া এত যে মানুষ, যারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে, মোবাইলের মাধ্যমে-তারা নিজেদের আবিষ্কার করার জন্য হলেও তো যেতে হবে বইয়ের কাছে। একটি শাড়ি, একটি জামা কেনার সঙ্গে যদি একটি বই কেনা হয় তাহলে দেখা যাবে শুধু বাইরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি হচ্ছে না, হচ্ছে ভেতরেরও। আর ভেতরেরটা হলে বাইরেরটার খুঁটি শক্ত হয়। নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস জেগে ওঠে। একেকটি বইয়ের মুখ একেকজন সুন্দরীর মুখের থেকেও বেশি লাবণ্যময়। মন দিয়ে একটু আবিষ্কার করার চেষ্টা করলে তার সত্যতা পাওয়া যাবে। আর কারও সঙ্গে একটা ভালো বই থাকা মানে একটি বাড়তি প্রেরণা। বাড়তি প্রেরণার উৎসাহ সবার সঙ্গে থাকুক। ফেব্রুয়ারি মাস এলে ‘মহান একুশে’ নিয়ে ব্যাপক মাতামাতি বড় কৃত্রিম মনে হয়। মনে হয় এ কারণে যে, আমাদের কর্ম ও আচরণে একুশের আদর্শিক চরিত্র ও তার আকাঙ্খা প্রকাশ পায় না।

পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলোয় একুশে বন্দনার অতিরঞ্জন, বাস্তবতাকে অনেক অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। এই অতিরঞ্জন আবেগের রঙে লেখা বর্ণলিপিতে। আত্মচেতনা ও অন্যদের চেতনার হিসাব-নিকাশ না করে। একুশে ও বাঙালিয়ানা নিয়ে একদা আবেগের যে আদর্শিক শুদ্ধতা, তা অনেক আগেই রাজনৈতিক-সামাজিক স্বার্থপরতা শুষে নিয়েছে। তার আর কিছু অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। তাই সচেতন বা অচেতনভাবে এসব নেহাত আত্মপ্রতারণার শামিল। এখন প্রশ্ন এই যে, আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবন’ এ প্রত্যয় কিসের, তা প্রতিবেদক আর ব্যাখ্যা করেননি। যদি তা হয়ে থাকে একুশের আদর্শিক চেতনাবিষয়ক প্রত্যয়, তা হলে স্বভাবতই প্রশ্ন : বাস্তবে ওই প্রতিবেদকসহ আমরা সবাই উল্লিখিত প্রত্যয়ে কতটা উজ্জীবিত? উজ্জীবিত যদি হয়েই থাকি, তা হলে তার ঘাটতি পূরণে কতটা তৎপর? নাকি ফেব্রুয়ারি মাস এলেই কলমে ঝরিয়ে বা যথারীতি মঞ্চে আগুনঝরা বক্তৃতা দিয়ে আবেগের ক্যাথারসিস ঘটিয়ে শান্তি নিয়ে ঘরে ফিরি। অপেক্ষা পরবর্তী বছরের একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য। এ অপ্রিয় কথাটি সত্য একুশের ঘাটতি ও অনর্জিত বাস্তবতা নিয়ে। সোজা-সরল ভাষায় বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানে যদিও একটি মাত্র বাক্যে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা’, তবু এর বিশ্লেষণে এমন বক্তব্য উঠে আসে যে, জাতীয় জীবনের, রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে ব্যবহারিক ভাষা বাংলা। যদি এ ভাষা সঠিক বিবেচিত না হয়, তা হলে সংবিধানে উল্লিখিত বাক্যটির সঙ্গে এক বা একাধিক বিশ্লেষণাত্মক বাক্য যোগ করে বিষয়টি স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করে তোলা হোক।

এযাবৎ আমরা সংবিধানের ওই বাক্যটিকে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে দিনের পর দিন উচ্চারিত সেøাগান ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করো’র সঙ্গে একাত্ম করে নিয়েছি। ১৯৭২ সালে সরকারি তৎপরতায় তেমনটিই প্রকাশ পেয়েছে। তাই চেষ্টা চলে সচিবালয়ের কাজকর্মে বাংলা ভাষা ব্যবহারের (কারো কারো আপত্তি সত্ত্বেও)। শিক্ষাক্ষেত্রে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠমাধ্যম হলো বাংলা। কিন্তু এর পর? উচ্চশিক্ষার সর্বত্র প্রচলিত ইংরেজি মাধ্যমই যথারীতি তার অবস্থান ধরে রেখেছে। উচ্চ আদালতে বাকবিনিময়ের বা রায় প্রদানের ভাষাই শুধু ইংরেজি থাকেনি, সংশ্লিষ্ট রাজসংস্কৃতিও তার রাজকীয় মর্যাদা অক্ষুণœ রাখে ঔপনিবেশিক কায়দায়। ইংরেজ শাসকের চাপিয়ে দেওয়া প্রভুত্ববাদী সম্বোধন কি একটি স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য খাটে? ব্যক্তি ও সমাজের গণতান্ত্রিক মর্যাদা কি তাতে ক্ষুণœ হয় না? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভেবে দেখবেন।ইতোমধ্যে সরকারি উদাসীনতায় রাজধানী ঢাকায় ধনিকশ্রেণির দ্রুত উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে মূল্যবোধসংক্রান্ত আমূল পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ভাষিক জাতীয়তাবাদী আত্মমর্যাদাবোধ ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া মূল্যবোধের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পিছু হঠতে থাকে। আন্তর্জাতিকতার (সাম্রাজ্যবাদী) নামে পূর্বোক্ত আর্থসামাজিক মূল্যবোধ ও আচরণের ডালপালার বিস্তার ঘটতে থাকে। বাড়তে থাকে ইংরেজির প্রভাব, তার সাংস্কৃতিক মর্যাদা-মান। দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বিপুলসংখ্যক ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায়তন কিন্ডারগার্টেন থেকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং তা বেসরকারি পর্যায়ে।

বাংলার অবস্থান নিয়েও তারা ভাবিত হননি। শিক্ষাক্ষেত্রে চরম অবহেলায় সমাজের উচ্চস্তরের শিক্ষায়তনে বাংলা ভাষার বেহাল। শিক্ষার মাধ্যম বিচারে শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষানীতি হয়ে দাঁড়াল পরস্পরবিরোধী ত্রিমুখী সর্বোচ্চ অবস্থানে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা (বিশেষ করে শক্তির বিচারে), তার পরই আরবি মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা, সব শেষে অবহেলিত বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা মুখ গোঁজে এক কোণে। এ অবস্থার বিস্তার ঘটে চলেছে দ্রুত-শক্তি ও মর্যাদার প্রকাশে, এমনকি সামাজিক আচার-আচরণে। একদা যে বাংলা নিয়ে এত গর্ব, গাড়ির নামফলক থেকে বিজ্ঞাপনের ভাষ্যে, তা এখন ক্রমেই বছর থেকে বছরে ইংরেজির কাছে মাথা নিচু করে পেছনে সরে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন খাত থেকে সর্বত্র একই অবস্থা। ভুল বানানের কিছু বাংলা সাইনবোর্ড নিজের অবস্থানটিও বুঝে উঠতে পারছে না। তার চেষ্টা অস্তিত্ব রক্ষা। এখন বিয়ের কার্ডও ছাপা হচ্ছে ইংরেজিতে মহামূল্যবান সুদর্শন অক্ষরমালায় সাজিয়ে। এতে কোনো লজ্জাবোধ নেই, আত্মগ্লানি তো দূরের কথা। বরং এতে ধনগরিমা, আত্মগরিমারই প্রকাশ ঘটছে শ্রেণিগত আভিজাত্যে। সংস্কৃতিক্ষেত্রে যতটুকু জাতীয়তা-চেতনা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে, তাতে ভাষিক গরিমার প্রকাশ সামান্যই। নির্মোহ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে একুশে নিয়ে এই যে ফেব্রুয়ারি মাসভিত্তিক নানামাত্রিক সমারোহ এবং পরবর্তী ফেব্রুয়ারির জন্য অপেক্ষা, এর কোনো যুক্তিসঙ্গত কার্যকারণ সমন্বিত ভিত্তি আমরা খুঁজে পাই না। এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারিতে মধ্যরাতে শহীদ মিনারকেন্দ্রিক রমনা এলাকায় রাজনৈতিক, সামরিক-বেসামরিক মহলসহ জনসাধারণের প্লাবন এর মধ্যে আমরা ভাষা সংগ্রামীরা একুশের কোনো আদর্শিক সারমর্ম খুঁজে পাই না।

গোটা বিষয়টিই অতীতের বিকৃত ধারাবাহিকতায় একুশের জাতীয়তাবাদী চেতনার এক বিপুল বিশাল মহড়া ছাড়া কিছু নয়, গতানুগতিকতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এর কোনো মূল্য নেই। একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের এই দস্তুর কি ভাষাসংগ্রামীদের কাছে গ্রহণযোগ্য, না সমর্থনযোগ্য। কিন্তু এখন তারা অসহায় জীর্ণ-ফসিল। তাদের শক্তি নেই বায়ান্নকে ফিরিয়ে এনে নতুন করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো। এ কাজ এখন ভাষাচেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের। জানি না, কবে তারা জাগবে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। পারস্পারিক যোগাযোগ ও ভাবাবেগ প্রকাশের সবচেয়ে বড় নির্ভরতা ভাষা। আর ভাষার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বাংলা পঙ্গু করার হীন চেষ্টার প্রতিবাদে বায়ান্ন’র ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ছাত্রজনতা ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ছিনিয়ে আনে মাতৃভাষার কথা বলার অধিকার। রক্তাক্ত সেই স্মৃতিময় দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের সংস্কৃতি বর্তমানে অবহেলিতই বলবো। আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বলিষ্ঠ ও মানসম্মত অনুষ্ঠান যেন এখন আর খুঁজে পাওয়া ভার। বাংলার আদর্শ গৃহিণীরা অবসরে দিনভর তাই প্রতিবেশী চ্যানেলে ডুবে থাকেন। এক্ষেত্রে আমাদের সংস্কৃতির মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। বাংলা ও বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতির দৈন্যদশা প্রমাণ করে। আমরা নিজেদের সংস্কৃতিকে আর হারাতে চাই না। আমাদের সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলুক তা চাই না, যেমনই আছি, যেমনই থাকি, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়েই বড় হতে চাই। তাতেই হবে আমাদের মুক্তি, তাতেই আসবে আমাদের শান্তি।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট