এক সাহসী সংগ্রামের নাম মহান একুশ

এক সাহসী সংগ্রামের  নাম মহান একুশ

আব্দুদ দাইন সরকার:প্রত্যেক ভাষাভাষি মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। মাতৃভাষা প্রত্যেক জাতির খুবই আদরের, খুবই দরদের, অমুল্য সম্পদ। শিশু জন্মের পর থেকে মাতৃভাষা শেখে। তাই প্রাকৃতিক নিয়মেই স্বাভাবিকভাবে মাতৃভাষার প্রতি তার প্রগাঢ় ভালবাসা জন্মে।  কিন্তু মাতৃভাষার জন্য জীবন দানের গর্বিত ইতিহাস পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালি জাতিরই রয়েছে। যা অন্যকোন জাতিতে পাওয়া যায়নি। বাঙালি জাতি রক্তদিয়ে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সারা বিশ্বকে শিখিয়ে দিয়েছে মাতৃভাষাকে ভালবাসার মন্ত্র। যা ঘটেছিলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এ দিনটি রক্ত খচিত একটি দিন। এই রক্ত খচিত দিন আজ স্বতন্ত্রভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভ করেছে। যা দেশ মাতৃকার গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারী এখন আর শুধু বাঙালির মাতৃভাষা দিবস নয়, প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সুপরিচিত করেছিল। আর একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ এইদেশ ও ভাষাকে পৃথিবীর কাছে দুর্লভ সন্মানে ভূষিত করেছে। এ দিনটি একদিকে যেমন ত্যাগের অন্যদিকে গৌরবের মহিমায় ভাস্বর। তাই প্রতি বছর এই দিনে বাংলাদেশের প্রাণথেকে উৎসারিত হয় সেই অবিনাশী শোকসঙ্গীত “আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি? ” ২১শে ফেব্রুয়ারী বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস। সকল আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্র বিন্দু। এই চেতনার সিড়ি বেয়ে এসেছে স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম। প্রকৃত পক্ষে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজটি প্রথম অংকুরিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীতেই। সে দিনের সেই অংকুর একাত্তুরে এসে স্বাধীনতার প্রাপ্তির মাধ্যমে পরিণত হয় বিরাট মহীরুপে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে একুশ যে ভাবে আন্দোলন ও সংগ্রামের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে তেমনি ভাবে স্বাধীনতার পরেও একুশ বাঙালিকে ধাবিত করেছে স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে। একুশের শহীদ মিনার বাঙালির প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মূর্ত প্রতীক। বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দু,সুতিকাগার। একুশ আমাদের দীক্ষা। একুশ আমাদের মহাজাগরণ, মহাবিদ্রোহ। এ জাগরণের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার নিজের পরিচয় শনাক্ত করে।একুশ মানেই মাথা নত না করা। বাঙালির মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক সাহসী সংগ্রামের নাম “মহান একুশ”। প্রকৃতঅর্থে একুশ কোন বিশেষ দিনক্ষন বা তিথি নয়, একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ থেকে লাভা ছড়ানো আগ্নেয়গিরি। কখনো অন্তর্দাহে গর্জন করছে, আর কখনো চারিদিকে অগ্নি ছড়াচ্ছে। একুশের চেতনায়  বাঙালি জাতি ভাবতে শেখে তার জাতিসত্বার কথা, রাষ্ট্রীয় সত্বার কথা। মহান একুশ এদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে আপোষহীন সংগ্রাম ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। আমরা দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে বলতে চাই, একুশ হোক সকল অনৈক্য সংঘাত ও অশান্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ হাতিয়ার, হোক সমুদ্র পথের ঝঞ্জা বিক্ষুদ্ধ অন্ধকার রাতের আশার প্রদীপ। অমর একুশ হোক, “দিক নির্দেশক আলোকবর্তিকা। ” ২০২০এর একুশের পাদপীঠে দাঁড়িয়ে ওই আলোক বর্তিকার স্পর্শ মেখে ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের চলমান অগ্রতিকে আরও বেগমান ও প্রানচঞ্চল করি। জাতীয় স্বার্থে পরমত সহিষ্ণু রাজনৈতিক চর্চা শানিত হোক। দেশ ও জাতির স্বার্থে অসংসদীয় আচরনে থেকে বিরত থাকি। দেশ থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার সম্পূর্ণ অবসান হোক। একুশের চেতনা দীপ্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াকু বাঙালির মহাননেতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণ করি। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকুক গোট বিশ^। একুশ হোক বাঙালির প্রতিদিনের জেগে ওঠার আলোকিত আহবান।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক (অব:)-সাংবাদিক
সাঁথিয়া, পাবনা
[email protected]
০১৭১৬-২১০৪২৮