এক প্রকল্পে ওয়াসার ১১ কর্মকর্তার বিলাসী ব্যয়প্রস্তাব!

এক প্রকল্পে ওয়াসার ১১ কর্মকর্তার বিলাসী ব্যয়প্রস্তাব!

ঢাকাবাসীকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ‘পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার ফেইজ-১’ নামে নতুন প্রকল্প হাতে নিতে চলেছে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করেই এ প্রকল্পে নতুন করে ঢাকা ওয়াসার ১১ কর্মকর্তার নিয়োগবাবদ পরিকল্পনা কমিশনের কাছে বিলাসী ব্যয়প্রস্তাব করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ওয়াসার প্রস্তাবে এ প্রকল্পে আওতায় প্রতিষ্ঠানটির ১১ কর্মকর্তাকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের জনবল সংক্রান্ত কমিটির কোনো সুপারিশই গ্রহণ করা হয়নি। নিয়ম অনুসারে এ কমিটির সুপারিশ ছাড়া জনবল সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব দেওয়ার কথা নয়।

প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, ঢাকা ওয়াসার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রায়ই এ ধরনের প্রস্তাব দিয়ে থাকে, কিন্তু এটি প্রত্যাশিত নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবশ্যই অর্থ বিভাগের জনবল সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ নিতে হবে।

‘ওয়াসার নতুন এ প্রকল্পের আওতায় প্রশাসনিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অথচ কোন খাতে এই ব্যয় হবে, তার বিস্তারিত নেই। ১২টি কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনা বাবদ মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ টাকা। কোন কম্পিউটারে কতো ব্যয় হবে তারও উল্লেখ নেই।’ 

এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকার মিটফোর্ড, বাবুবাজার, সদরঘাট, লালবাগ, ধানমণ্ডি, পিলখানা, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া ও তৎসংলগ্ন এলাকায় পানি সরবরাহ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে মানুষ উপকৃত হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটি ২০২১ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

পরিকল্পনা কমিশনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নতুন করে নিয়োগবাবদ ১১ কর্মকর্তার জন্য বেতন ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা। এর বাইরে দায়িত্বভার ভাতা ৬ লাখ, বাড়ি ভাড়া ৫২ লাখ, উৎসব ভাতা ২৬ লাখ, আপ্যায়ন ভাতা ৫ লাখ ও সম্মানী ভাতা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ। অর্থাৎ দুই বছর মেয়াদী প্রকল্পে ১১ কর্মকর্তার পেছনে মোট ব্যয় হবে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।’ বিস্তারিত ব্যয় উল্লেখ না করে ওয়াসার এ ধরনের প্রস্তাবকে অনেকটাই অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন এ কর্মকর্তা। 

এদিকে এ প্রকল্প প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক, প্রকৌশলী মিহির কুমার দত্ত  বলেন, ঢাকাবাসীকে সুপেয় পানি দিতে পরিকল্পনা কমিশনে নতুন করে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় ঢাকা ওয়াসার ১১ কর্মকর্তাকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে। এখনও হয়নি। সুপারিশ গ্রহণের জন্য অর্থ বিভাগের জনবল কমিটিকে চিঠি পাঠানো হবে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে।

নতুন প্রকল্প পরিকল্পনার ব্যাপারে ওয়াসা সূত্র জানায়, ঢাকা ওয়াসা মহানগরবাসীর কাছে নিরাপদ ও  সুপেয় পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন সেবা দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। দ্য ইস্ট পাকিস্তান অর্ডিনেন্স, ১৯৬৩ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী বাণিজ্যিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগরবাসীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৪০০ এমএলডি পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। প্রায় ৮৫০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে এর ৮০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ উৎস ও ৫টি পানি শোধনাগারের মাধ্যমে ২০ শতাংশ ভূপৃষ্ঠস্থ উৎস থেকে  সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে বসবাসরত ১ কোটি ৬০ লাখ নগরবাসীর পানির চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৪০০ এমএলডি। 

সূত্র আরও জানায়, প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার অন্যদিকে গভীর নলকূপের উৎপাদন কমে যাচ্ছে গড়ে ৫ শতাংশ। ২০২৩ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা যায়। ফলে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে পানির চাহিদা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০২৩ সালে দৈনিক পানির চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৩ হাজার ৫০০ এমএলডি। সার্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা ওয়াসার লক্ষ্য হচ্ছে- ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভূপৃষ্ঠস্থ পানি সরবরাহ করা। সে জন্য সায়েদাবাদ ফেজ-৩, গন্ধর্বপুর ফেজ-১ পানি শোধনাগারগুলোর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এগুলো ২০২৪ সাল নাগাদ চালু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। সেই সময়কার পানির চাহিদার ভিত্তিতেই প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে ঢাকা ওয়াসা। 

নতুন এ প্রকল্পের আওতায় ০.২৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ, একটি জীপ, দুটি পিকআপ ও ১০টি মোটরসাইকেল কেনা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যাবতীয় ইউটিলিটি শিফটিং, রাস্তা খনন ও ৬টি জেনারেটর স্থাপন করা হবে।