এই স্বীকৃতি আমাদের পাওনা ছিল

এই স্বীকৃতি আমাদের পাওনা ছিল

মাশরাফী হিরো:কবির প্রকাশ কবিতায়, লেখকের প্রবন্ধে, বিজ্ঞানীর আবিষ্কারে আর রাজনীতিবিদের বক্তৃতায়। আমি অনেকদিন শুনেছি, অমুক খুব ভাল রাজনীতিবিদ। কারণ ওনার বক্তৃতা খুব ভালো। বক্তৃতা হলো রাজনীতির মূল উপকরণ। যা মানুষকে বিমোহিত করে, প্রলুব্ধ করে এবং আকর্ষণ করে। বক্তৃতা সাধারণত দু’ধরনের হয়ে থাকে। যা বিশ্বাস করি তা বলা। আর অন্যটি হলো অন্যের কাছ থেকে ধার করে সুন্দর ও পরিপাটি করে বক্তৃতা করা। আমাদের রাজনীতিবিদরা এখন বক্তৃতা মুখস্থ করেন। সুন্দর সুন্দর পঙক্তি বলে হাততালি নেন। অনেক সময় অবলীলায় তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হই। কার মুখে কি কথা। গত কিছুদিন পূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল। অনেকে মনে করেছিলেন হিলারী ক্লিনটন বিজয়ী হবেন। কারণ তার বক্তৃতাগুলি অত্যন্ত পরিশীলিত ছিল। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছিল। তাছাড়া টিভি বিতর্কে প্রতিবারই ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হলেন হিলারী ক্লিনটন। অনেকে মনে করেন দু’বার ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ছিল। এবার রিপাবলিকানদের পালা। আবার আরেকটি বিষয় সবাই বলেছেন আমেরিকাতে মহিলা কেউ প্রেসিডেন্ট হননি। সবই সুন্দর যুক্তি। কিন্তু কেউ কেউ আবার বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যা ভেবেছেন তা ভুল হলেও বলেছেন। এমনকি সমালোচিত হলেও তোয়াক্কা করেননি। যা আমেরিকানরা অনেকটা পছন্দ করেছে।

যা হিলারীর বুদ্ধিদীপ্ত বক্তৃতার চাইতে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল ভোটারদের কাছে। ফলাফল ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। মানুষ স্বকীয়তাকে পছন্দ করে। অনেকে ভাবেন মানুষ হয়তো বোকা, তা নয়। বরং মানুষ আপনাদের মতো চালাক রাজনীতিবিদদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। সুতরাং বুদ্ধিমানদের সামনে চালাক না হওয়ায় ভালো। যা সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে পাওয়া যায়। তিনি শুরুতেই বলেছিলেন, ‘আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন’। বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন। এটি একদিনের ব্যাপার নয়। বরং এ বিশ্বাস এবং আস্থা গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ প্রায় ৩০বছর এক সাথে পথচলার পরিক্রমায়। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাস করেছিল। আর বঙ্গবন্ধুও সত্য কথাগুলি বলেছিলেন ৭ মার্চে। যা ভালোবাসা, আবেগ এবং যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত। সত্যের নিখাদ গাঁথুনি দ্বারা নির্মিত। তাঁকে অনেকেই অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় থেকে উত্থিত কথাগুলিই বলেছেন। যা বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সত্যের বন্ধনে আবর্ত পঙক্তির মতো হয়ে ধরা দিয়েছিল বাঙালির হৃদয়ে। পৃথিবীর এক কোণে দাঁড়িয়ে অঙ্গুলির উত্তোলনে বিশ্ব ইতিহাসের এক মানবতার কাব্য রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। যা আজও মানুষের মুখে-মুখে, হৃদয় স্পন্দনে। যা শুনলে গা শিউরে ওঠে। হাজারো নির্যাতিত মানুষের প্রেরণার উৎস এই ভাষণ। তৃতীয় বিশ্বের এই রাজনীতির মহাকবি রচনা করেছিলেন বিশ্ব ঐতিহ্যের মহাকাব্য।

 যা তৃতীয় বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের উপাখ্যান। আব্রাহাম লিঙ্কন, চার্চিলদের কাতারে  বঙ্গবন্ধুর সচকিত উপস্থিতির জানান দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ শোষিত মানুষের হৃদয়ের হাহাকারের প্রতিধ্বনি। যা স্মরণ করিয়ে দেয় ফিলিস্তিনিদের কথা,  মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের কথা, ভিয়েতনাম, ইরাক, সিরিয়ার মানুষের কথা। তাইতো বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অনুপম নিদর্শন। বঙ্গবন্ধু তাঁর আরেকটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুভাগে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ বিশ্ব শোষিতদের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আজ তাই ৪৬ বছর পর ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি। যার স্বীকৃতি বাঙালি জাতি দিয়েছিল ১৯৭১ সালে। ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। আর বঙ্গবন্ধু তা প্রমাণ রেখে গেছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে আত্মাহুতির মাধ্যমে। যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাই এই স্বীকৃতি আমাদের পাওনা ছিল।
লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫