এ মিল মনুষ্যত্বের, এ মিল বিশ্বশান্তির

এ মিল  মনুষ্যত্বের,  এ মিল  বিশ্বশান্তির

মাশরাফী হিরো : বঙ্গবন্ধু মুক্তিরবার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন ৭ মার্চ। তখন সারা বাংলাদেশ উত্তাল। সবাই তাকিয়ে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দিকে। আলোচনার আড়ালে বাঙালি নিধনের ষড়যন্ত্র। হঠাৎ ২৫ মার্চ বাঙালির জীবনে নেমে এলো সেই কাল রাত্রি। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে শুরু হলো হত্যা আর ধর্ষণ। অগ্নিসংযোগ করা হলো মানুষের বাড়িতে। সেই দিনই রাত ১২টা ২৫ মিনিটে ওয়্যারলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। গ্রেফতার করা হলো তাকে। নিয়ে যাওয়া হলো পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। বঙ্গবন্ধুর বিচারও শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু জানতেন না তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়ে গেছে। অন্ধকার সেলের পাশেই কবর খোঁড়া হয়েছিলো। তারপরও বঙ্গবন্ধুকে দমানো যায়নি। শত ভয়-ভীতি তাঁকে তার সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারেনি। তিনি জানতেন না তাঁর কপালে কি আছে অথবা বাংলাদেশে কি ঘটছে? শুধু এটুকুই আত্মবিশ্বাস ছিলো বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

তিনি কখনো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর কাছে মাথা নত করেননি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও ততদিনে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। নিরস্ত্র শান্তিপ্রিয় বাঙালি জাতি ততদিনে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মাতৃভূমি রক্ষার জন্য তারা যে এতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে তা সম্ভবত পাকিস্তানিদের জানা ছিল না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ততদিনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির যথার্থতা প্রমাণে সক্ষম হয়েছেন। ফলে ফাঁসির রায় হলেও তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের কারণে। অবশেষে সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে এলো স্বাধীন আলোক ছটা। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বাধীন হলো। বাংলা প্রায় দুইশ বছর পর স্বাধীনতার স্বাদ পেলো। ক্ষণিকের জন্য আনন্দ পেলেও সম্বিত ফিরে পেয়েই বাঙালি জাতি খুঁজে ফিরলো তাদের নেতা বঙ্গবন্ধুকে। শুরু হলো বঙ্গবন্ধু ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। অবশেষে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অত্যন্ত গোপনে মুক্তি দেয়া হলো। জুলফিকার আলী ভুট্টো তখন বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, সম্পর্কের কোনো বাঁধন রাখা যায় কিনা? জবাবে বঙ্গবন্ধু শুধু বলেছিলেন, বাংলাদেশে কি ঘটেছে আমি তার কোনো কিছুই জানি না। তাই দেশে ফিরেই সবকিছু বলতে পারবো। তখনও তিনি জানতেন না বাংলাদেশে এত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে গোপনে মুক্তি দেওয়ার কারণ ছিল একটাই তাহলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তা মেনে নিতে পারছিলেন না। পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু সরাসরি চলে গেলেন লন্ডনে। সেখানে ৯ জানুয়ারি ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখলেন। বললেন বাংলাদেশে কি ঘটেছে তা আমি জানি না। তবে অনুমান করতে পারি পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
অবশেষে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রওনা হলেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে। পথে ভারতে যাত্রা বিরতি। ভারতের এয়ারপোর্টে তাকে স্বাগত জানালেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তারপর তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো দিল্লির লালবাগে। সেখানে বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতবর্ষের সকল মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আপনার এত মিল কেন? আমি বলি, এ মিল গণতন্ত্রের, এ মিল সমাজতন্ত্রের, এ মিল অসাম্প্রদায়িকতার, এ মিল মনুষ্যত্বের, এ মিল বিশ্ব শান্তির। বঙ্গবন্ধু শুধু বক্তৃতা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি। বরং ভারতের সেনাবাহিনী কবে বাংলাদেশ থেকে ফেরৎ যাবে তার নির্দেশনাও চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, আপনি যখন চাইবেন তখনই ফেরৎ নেওয়া হবে। এই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে আত্মিক সম্পর্কের নমুনা। যারা একে অপরের আলাদা জাতি রাষ্ট্রের বাইরেও মানুষ হিসেবে একীভূত হওয়ার বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন।

অত:পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাঙালি জাতির পিতা ফিরে এলেন সেই প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশে। ততক্ষণে বঙ্গবন্ধু জেনে গেছেন ৩০ লক্ষ মানুষের শহীদের কথা, জেনে গেছেন ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হানির কথা, জেনে গেছেন বাংলাদেশ বিধ্বস্ত হওয়ার কথা। আবার সেই রেসকোর্স ময়দান। ৭ মার্চ থেকে আজ ১০ জানুয়ারি। পরাধীন বাংলাদেশ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ। মাঝখানে বয়ে গেছে দীর্ঘ  ১০ মাস। হারিয়ে গেছে বহু মানুষ, ভারি হয়ে গেছে বাংলার বাতাস, গগণ বিদারী শব্দে বিদীর্ণ হয়ে গেছে বাংলার আকাশ। এমনই এক মুহূর্তে বাঙালি জাতির পিতা আবারও রেসকোর্স ময়দানে হাজির হলেন বাঙালি জাতির সামনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে। সেই দিন লাখো শহীদদের স্মরণের পাশাপাশি ঘোষণা করলেন বাঙালি জাতির নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা। ঘোষণা করলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা। দুর্নীতি আর অবিচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। সর্বাগ্রে তুলে ধরলেন বাংলার দুঃখী মানুষের কথা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যেমন ধন্যবাদ জানালেন তেমনি জানালেন তাঁর দুঃখী মানুষের দিকে হাত বাড়ানোর কথা। বললেন আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত উক্তি, ৭ কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করেÑমানুষ করনি। এক কবির সেই চারণ মিথ্যা করে দিলেন আরেক কবি। যিনি ছিলেন বাঙালির স্বাধীনতা এবং মুক্তির কবি।
লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫