উপজেলা নির্বাচনে ‘আত্মীয়করণ’ নয়

উপজেলা নির্বাচনে ‘আত্মীয়করণ’ নয়

আতাউর রহমান মিটন : আজ ৩০ জানুয়ারি, বুধবার, একাদশ জাতীয় সংসদ এর প্রথম অধিবেশন বসছে। সংবিধান অনুযায়ী অধিবেশনের প্রথমদিন সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি। নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন জুড়ে থাকবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর সাধারণ আলোচনা। তবে অধিবেশনের শুরুতেই হবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অল্প সময়ের জন্য অধিবেশন মুলতবি থাকবে। পরে নবনির্বাচিত স্পিকারের সভাপতিত্বে আবারও অধিবেশন শুরু হবে।ভূমিধ্বস বিজয় নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন এই সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিচ্ছে না। যদিও কোন কোন মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্ট এর অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দু’জন সদস্যের শপথ নেয়া এবং সংসদে যোগ দেয়ার গুঞ্জন থাকলেও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, ‘আমার মনে হয় অপপ্রচার হয়েছে’।

 গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে সত্যি কি ঘটেছে সেটা বাংলাদেশের মানুষ জানেন। অনেকেই মনে করেন, ভোট যেমনই হোক, আগামী পাঁচ বছর এই ফলকে অস্বীকার করে কোন লাভ হবে না। অন্ততঃ ২০১৪ সালের তথাকথিত নিয়মরক্ষার নির্বাচনটিও যেখানে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সেখানে এই নির্বাচনের ফল আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমতাবস্থায়, আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন গড়ে তোলার একটা কৌশল নেয়াটাই সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে বলে অনেকেই মনে করেন। রাজনীতির পথ নদীর ¯্রােতের মত। বাঁধ দিয়ে তার গতি পরিবর্তন করা যায় কিন্তু রোধ করা যায় না। তাই এগিয়ে যেতে হবে কৌশলের উপর ভর করে। ঠুনকো, উত্তেজক বক্তব্য বা উস্কানী দিয়ে সাময়িক বাহবা পাওয়া গেলেও ক্ষমতায় যাওয়ার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য সঠিক কৌশল, পরিশ্রম ও অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হবে।
দশম জাতীয় সংসদের মতো একাদশ সংসদেও প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। তবে এবারে বেগম রওশন এরশাদ এর পরিবর্তে এইচ এম এরশাদ বিরোধি দলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও গতবারের মত এবার জাতীয় পার্টি থেকে কেউ সরকারের মন্ত্রিসভায় নেই। তবু কেন জানি না কার্যকর বিরোধি দল হিসেবে মানুষ এখনও জাতীয় পার্টিকে ভাবতে পারছে না। যদিও জাপার পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, তারা এবার সত্যিকারের বিরোধি দল হিসেবেই কাজ করবে। কিন্তু মহাজোট থেকে বেরিয়ে না আসায় কিভাবে জাপা সরকার বিরোধি অবস্থান নিয়ে বিরোধি দলের ভূমিকা পালন করবে সেই প্রশ্নের কোন জবাব নেই। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাপা এই মুহূর্তে মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসবে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থবারের মত দায়িত্ব নিয়ে এবার বেশ কঠোরতার সাথে দেশ চালাবেন বলে মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে ডাক্তারের কর্মস্থলে হাজিরা নিশ্চিত করতে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। দুর্নীতি দমনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলছেন। মনে হচ্ছে দুদকও নড়েচড়ে বসেছে। দেশের কোচিং সেন্টারগুলো অন্ততঃ একমাসের জন্য বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। প্রশাসনের সর্বস্তরে কঠোরতার এই ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে আগামীতে বাংলাদেশের জন প্রশাসনে এক যুগান্তকারী মাইলফলক রচিত হবে। বাংলাদেশের এগিয়ে চলার গতি আরও বহুগুণে ত্বরান্বিত হবে। দেশের মানুষ সুশাসনের যে তেষ্টা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বসে আছে, সেই তেষ্টার কিছুটা হলেও অবসান হবে।  
আমরা বাংলাদেশের মানুষ অতীতের ঘর পোড়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে বসে আছি। তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলেই আমাদের ভয় লাগে। আমরা সরকারের শীর্ষ ব্যক্তির হুঙ্কার অতীতেও বহুবার শুনেছি, বিশেষ করে ক্ষমতার প্রথমদিকের সময়টাতে তারা বেশ কঠোরতা দেখালেও কিছুদিনের মধ্যেই সকলে সেই সাবেক রূপ ধারণ করেছেন। পুরোনো সেই অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ এখনও খানিকটা দ্বিধায়! আশাকরি এবার সেই পুরনো অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।
আগামী মার্চে সারাদেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জানামতে, এবার বিভাগওয়ারী ভোট গ্রহণ করা হবে। একদিনে দুই বিভাগ, এভাবে মোট চারদিনে ৮ বিভাগে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হবে। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিবে না জানিয়ে দিয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে তোড়জোড় চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। নেতা-কর্মীদের ধারণা, কোন রকমে দলীয় নমিনেশন নিশ্চিত করা গেলে জয় সুনিশ্চিত। নিজেদের যোগ্যতা যাই হোক, দলের জোরেই ভোটে জিতে যাবেন প্রার্থীরা। এমন আত্মবিশ্বাস গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য কতখানি মঙ্গলজনক সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। জনগণের ভোট পাওয়ার চেয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলে আগামীতে নেতৃবৃন্দ জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকতে আগ্রহী হবে না। কারণ, জনগণ নয় দলই তাদের ক্ষমতার উৎস! আর সেটা হলে আমাদের বলতে হবে ‘সবার চেয়ে দল বড়, তাহার উপরে নাই’! জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এবার উপজেলা নির্বাচনে এমপি’র কোন আত্মীয়দের মনোনয়ন দেয়া হবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর এই ঘোষণাকে রাজনীতিতে ‘পরিবারতন্ত্র’ অবসানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অনেকেই মনে করেছেন। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কথা রাখবেন। তিনি তাঁর দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে যে কথা বলেছেন তা অনেকের জন্য অস্বস্তির কারণ হলেও বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা চাই তিনি সফল হোন। তিনি আপোষহীন থেকে রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করুন। এর ফলে দলের ভেতরে ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। অবসান হবে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার।
জাতীয় সংসদের পরে এখনও তৃণমূলে উপজেলা পরিষদেরই গুরুত্ব বেশি। যদিও বাস্তবে উপজেলা পরিষদ এখনও স্থানীয় উন্নয়নে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি তথাপি এই পরিষদ এর গুরুত্ব মানুষের কাছে রয়েছে। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে সরকার উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। জাতীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এর ক্ষমতা ও কার্যপরিধির মধ্যে একটা বাস্তবসম্মত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। বর্তমানে একজন এমপি তার নির্বাচনী এলাকায় সর্বসময় অধিকর্তা হিসেবে অধিষ্ঠিত। ক্ষমতার এই একচ্ছত্র আধিপত্য অনেক এলাকাতেই একজন সংসদ সদস্যকে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতে সহায়তা করতে পারে। উপজেলা পরিষদকে কার্যকরী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অতীতে হয়নি বটে কিন্তু আগামীতে যেন হয় সেই অনুরোধ রাখছি।
আসন্ন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান পদে এমপিদের আত্মীয়দের মনোনয়ন না দেয়ার সিদ্ধান্তের মত আরও কিছু কার্যকর সিদ্ধান্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করবেন এটা আমাদের বিশেষ অনুরোধ। বিশেষ করে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে আমরা সরকারের কাছে কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আশাকরি। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকুরি না পায় বা কাজ না পায়।”
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে সর্বপ্রথম ১৯৯৯ সালে জাতীয় কৃষি নীতি প্রণয়ন করে। এরপর ২০১৩ সালে তাদের হাতেই আবার সেই কৃষি নীতি যুগোপযোগী হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের হাতেই ২০১৮ সালে এসে জাতীয় কৃষি নীতি আবারও সংশোধিত হয়। কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতির কারণেই বাংলাদেশ আজ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশে এখন আর খাদ্যের কোন অভাব নেই। আমাদের মাছ উৎপাদনও বেড়েছে। এখন চলছে দুধ ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াস। আশাকরি, বাংলাদেশ সেখানেও ভাল করবে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে কৃষি এখন ধীরে ধীরে সম্মানজনক পেশায় পরিণত হচ্ছে। সরকার কৃষিকে রপ্তানিমুখী করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই পেশায় শিক্ষিত তরুণেরা আরও বেশি বেশি এগিয়ে আসবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে বেশ কয়েকটি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি সামগ্রিক উন্নয়নেও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে। ঐ ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হবে। সময়মত কৃষি ঋণ সহজলভ্য ও বর্গাচাষীদের জামানতবিহীন কৃষিঋণ প্রদান করা হবে। কৃষি পণ্যের সাপ্লাই চেইন/ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা হবে। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণে ২০২৩ সালের মধ্যে হাঁস-মুরগির সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ শস্য, মৎস্য ও গবাদি পশু পালনসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।  
আমাদের গ্রামগুলিতেও শহরের ন্যায় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে সরকার গ্রাম ও শহরের মধ্যেকার জীবনমানের দুরত্ব কমানোর কথা বলছেন। এটা সত্যিই প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী স্থানীয় সরকার। দরকার ত্যাগি, মেধাবী ও সৎ তরুণ নেতৃত্ব। দলবাজদের দৌরাত্ম কমাতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগ সন্ধানীদের কপাট বন্ধ করে দিতে হবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটা শুরু হোক। জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করুন, আপনি আপোষহীন। বঙ্গবন্ধু’র স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আপনি সময়ের প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে কখনই পিছুপা হবেন না। বাংলাদেশের আইনসভা তথা মহান জাতীয় সংসদ দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করবেন। রাজনীতিসহ সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিরাজমান বাধাসমূহ দূর করবেন। মেধাবী, সৎ ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ অবারিত করবেন। সম্ভব হলে একজন ব্যক্তি যাতে দু’বারের বেশি জাতীয় সংসদে প্রার্থী হতে না পারেন সেই আইন প্রণয়ন করবেন। আমেরিকা পারলে আমরা কেন পারব না? বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘... আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’। আমরা এগিয়ে যাবই। একাদশ জাতীয় সংসদ এর যাত্রা শুভ হোক। মুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নিতে সকলেই ঐক্যবদ্ধ থাকুন। জয় হোক জনতার।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯