উন্নয়নের জন্য কৃষকদের মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক

উন্নয়নের জন্য কৃষকদের মূল্যায়ন অত্যাবশ্যক

রায়হান আহমেদ তপাদার : আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান হলেও এখানকার পানি সেচ ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। দেশের আবাদযোগ্য জমির যে সামান্য অংশে পানিসেচের ব্যবস্থা রয়েছে তার অধিকাংশই প্রাচীন পদ্ধতির আওতাধীন। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোড সেচের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় দেশে কিছু কিছু আধুনিক পানি সেচ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে।কৃষি ফসল উৎপাদনে আমরা প্রকৃতি নির্ভর। তবে বিভিন্ন সময়ে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী সেচ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই পানি সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। রাসায়নভিত্তিক কৃষিব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে, টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত কৃষিব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কৃষকদের জৈব কৃষিব্যবস্থায় ফিরে আসতে হবে। তবে এ দেশের কৃষি খাতকে টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সরকার সত্যি সত্যিই উদ্যোগী হলে এ দেশের সব কৃষি কর্মকর্তাকে ৬৮ হাজার গ্রামের কৃষকদের দোরগোড়ায় পাঠাতে হবে। সরকারকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে।
পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ খাদ্যশস্য হিসেবে চালের ওপর নির্ভরশীল। চাল বাংলাদেশেরও প্রধান খাদ্যশস্য। চালে রয়েছে শ্বেতসার, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। কিন্তু অজ্ঞতাবশত চালের দানাকে অতিরিক্ত মসৃণ করার কারণে এর পুষ্টিমান কমে যাচ্ছে। বস্তুত অধিক মুনাফার আশায় চালকে মসৃণ করে চালকল মালিকরা চালের পুষ্টিমান যেমন নষ্ট করছেন, তেমনি সম্প্রতি ধানের বিভিন্ন রোগ-বালাই ধান উৎপাদনে কৃষকদের মাঝে সৃষ্টি করেছে হতাশা। দরিদ্র কৃষক টাকার অভাবে মান্ধাতার আমলের কঙ্কালসার গরু আর নড়বড়ে কাঠের লাঙ্গলের সাহায্যে জমি চাষ করে। চাষীরা বীজতলায় বীজ বপন থেকে শুরু করে ফুল আসা পর্যন্ত শ্রম ও মূলধন খাটিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কাঙ্খিত ফসল ঘরে তোলার জন্য। ধানগাছে ফুল আসার সঙ্গে সঙ্গে কত স্বপ্ন, কত আশা জন্ম নেয় কৃষকের মনে। এ বছর সারা দেশে উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধানের আবাদ তুলনামূলক বেশি হলেও ধান গাছের মূলশীষ ও শাখাশীষগুলো যখন ফুলে পরিপূর্ণ, ফুলগুলো দানায় পূর্ণ হয়ে শীষগুলো নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, ঠিক এমন সময় হঠাৎ করে ধানক্ষেতে দেখা দেয় একধরনের রোগ, যা শ্রীপুরের কৃষকদের ভয়াবহ আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় দু’-একটি ধানের শীষ সাদা হয়ে গেলেও অতিদ্রুত তা সব আবাদি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। দূর থেকে তাকালে মনে হবে ধান পেকে রয়েছে; কিন্তু একটি দানাও নেই কোনো শীষের মধ্যে। এমন দৃশ্য দেখা গেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সিংগারদিঘী গ্রামের এক বর্গাচাষীকে হঠাৎ আক্রান্ত বোরো ধান ক্ষেতের পাশে বিদীর্ণ নয়নে দানাবিহীন শীষগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা যায়। অর্থনৈতিকভাবে অধিক লাভজনক কিছু হলে চাষ করে নতুবা জমি এমনিতেই পড়ে থাকে। আমাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলায়। বর্তমানে আমাদের গ্রামে ধানি জমির দামও কমে গেছে আগের তুলনায়। বিক্রিও কমে গেছে। আমি ধরে নিয়েছিলাম আমাদের এলাকাতেই বোধহয় এ সমস্যা।
চট্টগ্রামের মানুষ এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য জেলার মানুষের চেয়ে অধিক সচ্ছল। এছাড়া চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় স্থানীয় দিনমজুর পাওয়াও কঠিন। রাউজানে দিনমজুর, রিকশাচালক হিসেবে উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রামের লোক কাজ করে। বর্তমানে এদের পারিশ্রমিক অনেক বেশি। এত বেশি পারিশ্রমিক দিয়ে জমিতে কাজ করিয়ে একজন কৃষক যে ধান উৎপাদন করেন বিক্রি করে তিনি লাভ করাতো দূরের কথা অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারেন না। এ পরিস্থিতি দেখে গত কয়েক বছর ধরে ভেবেছি, এ অবস্থা যদি দেশের অন্যান্য স্থানেও চলে তাহলে দেশের জন্য ভয়াবহ এক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। ধানের দাম কম অন্যদিকে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেশি। এমনকি ধানের দাম না পেয়ে প্রেসক্লাবের সামনে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করার খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। লক্ষ্মীপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একই অবস্থা। দুই মণ ধানে এক কেজি ইলিশ কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ বছর লক্ষ্মীপুর জেলায়ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বছর চাল রপ্তানির জন্য সরকারের কাছে আবেদনও করেছেন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ধান ছাড়াও মাছ, সবজি, ফল, ফার্মের মুরগি ও গরম-ছাগল উৎপাদনেও আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে দেশ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে এদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ থেকে আট কোটি। তার পাশাপাশি দেশে তখন আবাদি জমির পরিমাণ ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। তারপরও দেশের খাদ্য উৎপাদন মোট চাহিদা পূরণ করতে পারতো না।
খাদ্য আমদানিকারক দেশের শীর্ষে ছিল বাংলাদেশের নাম। তখন দেশের অনেক জেলায় মঙ্গা। বেশ কয়েকমাস দেশজুড়ে থাকতো প্রবল খাদ্যাভাব। ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৭ কোটির অধিক। নদীভাঙন, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ অনত্মত ৩৫ শতাংশ কমেছে। তারপরও দেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমন কি বিদেশে রপ্তানির কথাও ভাবছে। বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার শুরুত্ব থেকেই কৃষি ও কৃষকবান্ধব সরকার। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে শেখ হাসিনার সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। কৃষকদের জন্য সার-কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থা করেছে। দশ টাকায় কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার, সে হিসাবে সরকারের ভর্তুকির টাকা পৌঁছে যায়। তাছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া কৃষিজাত অন্যান্য পণ্য নিয়ে বিপাকে না পড়লেও কৃষকরা ধানের ব্যাপক উৎপাদন নিয়ে বিপাকে পড়েছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমে গেছে ধানের। এই বিষয়টি সরকারকেও বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধান খাদ্য চালের দাম বাড়তে দেয় না সরকার। অন্যদিকে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে চালের প্রকৃত দাম পাচ্ছে না কৃষকরা। এ পরিসি’তি সামাল দিতে সরকার প্রতিবছর নির্ধারিত দামে ধান চাল ক্রয় করে কৃষকদের কাছ থেকে। এ লক্ষ্যে প্রতি উপজেলায় গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু কৃষকদের অভিজ্ঞতা সেক্ষেত্রে ভিন্ন। অধিকাংশ সরকারি ক্রয়কেন্দ্র এবং এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকদের বিস্তর অভিযোগ আছে। কৃষকরা অভিযোগ করেন ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা সরাসরি ক্রয়কেন্দ্রে ধান-চাল বিক্রি করতে পারেন না। একটা চক্র সবসময় ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সক্রিয় থাকে। ধানের দাম ও অভাব এবং ধান উৎপাদনে কৃষকের অনীহা ইত্যাদি বিষয় হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে এই কৃষকরাই ১৭-১৮ কোটি মানুষের মুখে ভাতের সংস্থান করে দিচ্ছে। অনন্ত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের মনোবলও শক্ত হয়েছে। তা না হলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মর্জির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হতো। সে অভিজ্ঞতা কখনো সুখের ও সম্মানের নয়। সরকার তৈরি পোশাক শিল্প মালিক, শিল্পকারখানার মালিক এবং ঋণ খেলাপিদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আসছে। এবার দেশের কৃষকদের বাঁচাতে, খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে, খাদ্যে পরনির্ভরশীলতা কমাতো কোনো পণ্যের উদ্ভাবন করুক। আমাদের দেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ। ফলে সবকিছুর আগে কৃষি ব্যবস্থাপনা অগ্রাধিকার পাক। আগে অন্নের চিন্তা পরে অন্যকিছু। যে অন্নের সংস্থান করে দিচ্ছে তার ভালোমন্দ ভাবতে হবে আগে। যে কৃষকরা একদিনের জন্যও কোনো হরতাল-ধর্মঘট করেনি, এক ঘণ্টার জন্যও কখনো কর্মবিরতি করেনি, রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও খাদ্য উৎপাদন বন্ধ করেনি, এখন সময় এসেছে তাদের কথা ভাববার। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার।
কয়েক মাসের অপরিসীম শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আগে আগুন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন কোনো কৃষকের না হয়। মনে রাখতে হবে-কৃষক বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। এছাড়া বর্গাচাষী জানান, শ্রম বিক্রি করে অতিকষ্টে সংসার চালিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করে ৭০ শতাংশ জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। বীজতলা থেকে শুরু করে ধানে শীষ আসা পর্যন্ত সন্তানের স্নেহে সব ধরনের যতœ করেন আবাদি জমিতে। ক্ষেতে শীষ দেখা দিলে স্বপ্ন দেখেন-ধান বিক্রি করে দায়-দেনা শোধ করবেন, সন্তানের স্কুলের খরচ মেটাবেন, হালের বলদ কিনবেন। কিন্তু অজ্ঞাত (শীষ সাদা) এক রোগে বর্গাচাষীর সেই স্বপ্ন হারিয়ে গেছে, তাই তার মুখে নেমে এসেছে হতাশার ছাপ। গাজীপুরের অনেক বোরো চাষীরই এরকম করুণ অবস্থা। এমনকি স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করেও কার্যত সঠিক কোনো পরামর্শ বা প্রতিকার পায়নি কৃষকরা। কর্মকর্তাদের ধারণা, বীজে সঙ্করায়ন সমস্যা এবং মেঘাচ্ছন্ন, আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় এ ধরনের রোগ হতে পারে। কৃষক এ অবস্থায় শত চেষ্টা করেও ফসল রক্ষা করতে পারেনি, উপরন্তু যা হওয়ার তা-ই হয়েছে- কৃষকের আমও গেছে, ছালাও গেছে। চলতি বোরো আবাদে মোটা অঙ্কের লোকসানের কারণে শ্রীপুরের কৃষকরা দিশেহারা। বোরো আবাদে উৎসাহ হারাতে বসেছে চাষীরা। এ অবস্থায় শ্রীপুরের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে এবং বোরো আবাদে উৎসাহ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট আক্রান্ত ফসলি জমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সমস্যা শনাক্তকরণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিলে আগামী বোরো মৌসুমে উপকৃত হবে কৃষকরা।
আমাদের দেশের কিংবা একেবারেই অক্ষরজ্ঞানহীন হতদরিদ্র কৃষকদের পক্ষে জেলা কিংবা উপজেলা সদরে গিয়ে কৃষি অফিস থেকে আধুনিক কৃষি তথ্য সংগ্রহ করা একেবারেই সম্ভব নয়। সুতরাং কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারিদেরই কৃষকদের দোরগোড়ায় যেতে হবে দেশের কৃষি খাতকে টেকসই ও ঝুঁকিমুক্ত রাখার বৃহৎ স্বার্থেই। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। আর সে লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার এ স্তরে (ইউপি) যুগের চাহিদানুসারে নতুনত্ব আনয়ন করা অত্যাবশ্যক। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ড প্রতিনিধিকে যদি স্থানীয় কৃষকদের কৃষি সমস্যা সমাধানের বাড়তি দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার থেকেই করা হয় তাহলে দেশের কৃষি খাত অনেকটাই যে উপকৃত হবে সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
লেখক ঃ  কলামিস্ট
 [email protected]