উত্তরের জেলাগুলোতে ভর মৌসুমেও হাড়কাঁপানো শীতের প্রভাব নেই

উত্তরের জেলাগুলোতে ভর মৌসুমেও হাড়কাঁপানো শীতের প্রভাব নেই

পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি : শীতকাল। ঋতু বৈচিত্র্যে হেমন্তের পরই আসে শীতকাল। হেমন্তে শীতের আগমন হলেও পৌষ-মাঘে হাড়কাঁপানো শীত দিয়ে বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে বিদায় নেয় শীতকাল। শীত মানেই হিমালয় থেকে বয়ে আসা হিমশীতল হাওয়া আর দিগন্তজুড়ে ঢাকা ভারী কুয়াশা। শরীর উষ্ণ করার চেষ্টায় সকলের সাধ্যমত চেষ্টা। কুয়াশাঘেরা সকালে ঝাড়-পাতা দিয়ে উনুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টার সাথে এক ধরণের সিদ্ধ পিঠা আগুনে পুড়িয়ে খাওয়ার উৎসব। সেই সাথে হিমশীতল সকালে খেজুরের টাটকা রস পান। ছিন্নমূল আর খেটে খাওয়া মানুষদের একটি শীতবস্ত্রের জন্য দিক-বিদিক ছোটাছুটি; শীতের চিরায়ত এমন চিত্র ধীরে ধীরে ¤œান হতে বসেছে। ভর শীত মৌসুমেও  দেখা মিলছে না জমপেশ শীতের। পরিবেশবিদরা বলছেন, বায়ুমন্ডলে অধিক পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃস্বরণের কারণে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ তার ঋতু বৈচিত্র হারিয়ে ফেলছে। এখন দৃশ্যমান হচ্ছে মাত্র তিনটি কাল। গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত। এই তিনটি কালের মধ্যে শীতকালও ধীরে ধীরে হারিয়ে  যেতে বসেছে।
ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল। তবে পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে শীতের আগমন ঘটে হেমন্তের একেবারে শুরু থেকেই। হিমালয়ের একেবারে কাছে অবস্থান হওয়ায় সারা দেশের মধ্যে এই অঞ্চলে প্রতি বছরই শীতের তীব্রতা বেশী থাকে। পৌষ-মাঘের শীতে কাবু হয় এই অঞ্চলের মানুষগুলো। শীতজনীত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বৃদ্ধ ও ছিন্নমূল মানুষরা। শীতবস্ত্রের জন্য হাহাকার পড়ে যায় চারদিকে। সরকার ছাড়াও শীতার্ত মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে আসে বিভিন্ন সংগঠন ও বিত্তবান মানুষরা। প্রতিদিনই বিভিন্ন প্রান্তে বিলি করা হয় কম্বলসহ বিভিন্ন শীতবস্ত্র। কিন্তু তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমেই শীতের তীব্রতা কমে যাচ্ছে এই অঞ্চলে। এখন শীতকাল মনে হয় সন্ধ্যার পর থেকে। উত্তরের হিমেল বাতাসের সঙ্গে রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘন কুয়াশা শীতের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। হু হু করে নেমে যায় ব্যারোমিটারের পারদ। আবার সকালে পুরো তেজ নিয়ে সূর্য উদয় হয়। দ্রুতই বাড়তে থাকে তাপমাত্রা। দুপুরে খালি গায়েও রোদের মধ্যে দাড়িয়ে থাকা দায় হয়ে যায়। ডিসেম্বরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পঞ্চগড়সহ এই অঞ্চলে সর্বমিন্ম তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামেনি। আবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। হঠাৎ এমন আবহাওয়ার বিরুপ প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করার মত। এখনি গাছের পাতা মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। আবার দিন ও রাতের তাপমাত্রা অনেক কমবেশী হওয়ায় দেখা দিয়েছে নানান রোগ। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা সর্দি-কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালমুখী হচ্ছে।

 তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক ফজলে রহমান জানান, এই মৌসুমের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে গত ৫ জানুয়ারি। সেদিন সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর  মঙ্গলবার সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি আরও বলেন, পুরো শীত নামার সময় এখনও আছে। জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে শীত বাড়তে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।  

পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও  বোদা পাথরাজ কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, ব্যাপকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ থেকে ষড়ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রকৃতি এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। বর্ষায় বৃষ্টি নেই; শীতকালে শীত নেই। বর্তমানে এমন অবস্থাই বিরাজমান। সব কিছু যেন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এমন অবস্থার জন্য প্রকৃতি নয়, মানুষই দায়ী। এখনি বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃস্বরণ কমাতে না পারলে অদুর ভবিষ্যতে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে আগামী এক দশকের মধ্যে প্রকৃতি থেকে ষড়ঋতুর নামটিও এক সময় হারিয়ে যাবে।