উত্তরবঙ্গে রেলের উন্নয়ন প্রত্যাশা জনগণের

উত্তরবঙ্গে রেলের উন্নয়ন প্রত্যাশা জনগণের

রবিউল ইসলাম (রবীন) : গত এক সপ্তাহ ধরে একটি সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি। পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু হতে যাচ্ছে আগামী ২৫ মে থেকে। নিঃসন্দেহে খবরটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য সুখবর। কিন্তু উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শহর, ঐতিহ্যবাহি জংশন ষ্টেশন সান্তাহার ষ্টেশনে ট্রেনটির যাত্রাবিরতি বা স্টপেজ থাকবে না বলে জানা গেছে। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি সব ধরনের ট্রেনের যাত্রাবিরতি আছে এই ষ্টেশনে। স্বাভাবিক কারণে তিন জেলার মোহনা সান্তাহারের আপামর মানুষ এই সংবাদে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। ফলে সকল রাজনৈতিক দলের সদস্য সহ নওগাঁর মানুষরাও সান্তাহারে যাত্রাবিরতি দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনের সূত্রপাত করেছেন। ট্রেনটির যাত্রাবিরতির জন্য বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষদের নিয়ে কমিটি হয়েছে, সেই কমিটি কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে।
সান্তাহার জংশন স্টেশনের দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ষ্টেশনের আয় প্রায় ১১ কোটি টাকা। বৃটিশ আমলে নির্মিত এই জংশন স্টেশনটির বর্তমান চলাচলকারী সব ধরনের ট্রেন যাতায়াতে করে। আপনারা শুনে অবাক হবেন নওগাঁ শহরের প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষ কিছুদিন আগেও ট্রেন কি জিনিস তা জানতো না। তো সেই নওগাঁ শহরের গা লাগিয়ে এই সান্তাহার শহর। নওগাঁ, জয়পুরহাটের অনেক  মানুষ আমাদের দিয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে নেয়  বিভিন্ন সময়ে। আবার মিটার গেজে লাইনও শুরু এই শহর থেকে। এখন আমরা মাত্র ৪৫ টাকা দিয়ে ৪৫ মিনিট সময়ে বগুড়া শহরে যেতে পারছি। শস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত নওগাঁ, সান্তাহারের  উৎপাদিত চাল সান্তাহার থেকে দেশের রাজধানী নিয়ে যাওয়া সম্ভব। যদি ট্রেনের সোনালি অধ্যায় আবার ফিরে আনা যায়। বলতে চাচ্ছি ট্রেনের সিডিউল যদি ঠিক করা যায়। ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক করা যায়। আর সবচেয়ে বড় ঠিক করা বা মেরামত করা দরকার নিজেদের। কারণ বাইরের রাষ্ট্রের কোন চোর নয়, আমরাই রেলের সর্বনাশ করেছি। রেল কে আমরা নিজ হাতে মেরে ফেলেছি।
মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই আমরা কেবল শুনেই আসছি, প্রতিবছর রেল লোকসানে থাকে। জনবল কাঠামো সংকট, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও বগির অভাব, ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। আপনি যদি  পরিবারের সদস্যসহ কোন মৌসুমে একটি সাধারণ ট্রেনে এই বঙ্গের সান্তাহার থেকে রাজশাহী রেল ভ্রমন করেন, সেই দিনই মনে হয় নাকে ক্ষত দেবেন ট্রেনে আর না উঠার জন্য। বেশ কিছু আন্তঃনগর ট্রেন হয়েছে উত্তরবঙ্গে। কিন্তু সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সব স্টেশনে থামবে-এমন মেইল ট্রেনগুলির অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিটি ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় বন্ধ করে, প্রতিটি ট্রেনের বগি বৃদ্ধি করে ট্রেনকে যে করেই হোক জনপ্রিয় করতে হবে। সম্ভব হলে নারী ও প্রতিবন্ধিদের জন্য আলাদা কক্ষ রাখা যেতে পারে।
নিজে জংশন শহরে থাকি বিধায় প্রতিদিন দেখি রেলের দুর্দশা। অধিকাংশ ষ্টেশনে  আধুনিকতার ছোয়া লাগেনি। যাত্রীদের পানির ব্যবহার থেকে খাবার ব্যবহার ব্যবস্থার খুবই নাজুক অবস্থা। রাজধানী যেতে চাইলে এখন আপনাকে অন্তত ১৫ দিন আগে টিকিট কেটে রাখতে হবে। সেই টিকিট পাবার পদ্ধতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আছে, সেখানে দুর্নীতি হয়। একটু অসাবধান হলেই রেল স্টেশনে আপনার প্রিয় মোবাইলটি চুরি হয়ে যেতে পারে। পকেটমারের অভয়ারণ্যে এখন এসব ষ্টেশনে। ষ্টেশনগুলিতে বৈধ দোকান যেমন কয়েকটি আছে, তার তিনগুন বেশি অবৈধ দোকান আছে। এসব দোকান থেকে চাঁদাবাজি হয় তাদের জন্য যারা স্টেশনের প্রধান কর্মকর্তা। আমি কয়েকবছর ধরে আন্তঃনগর ট্রেনে সান্তাহার থেকে নাটোর যাতায়াত করি, ফেরার পথে টিকিট কাটি, কিন্তু টিকিটে সিট নম্বর পাইনা।  অনেক ষ্টেশনেই একরকম অব্যবস্থাপনা আছে এই রেলপথে। পার্বতিপুর, জয়পুরহাট, সান্তাহার, বগুড়া, বোনারপাড়া, লালমনিরহাট সহ নানা শহরে হাজার হাজার একর রেলের জমি পড়ে আছে অথবা দখল হয়ে গেছে। সরকার এসব জমি কাজে লাগাতে পারে, ইপিজেড করতে পারে, কল-কারখানা করতে পারে। বাসা-বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিতে পারে। এক শ্রেণীর ভূমিদস্যুর কবলে পড়ে গেছে রেলের অনেক জমি, পুকুর, বাসা, বাড়ি। মাঝে মাঝে রেলের ’বড় অফিসার’ কোন কোন জংশন ষ্টেশনে পরিদর্শনে আসেন, তখন দুদিনের নোটিশে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উঠে যায়, ’অফিসার’ চলে যায়, তারপর আগের মতো সব। সে সব ’অফিসার’ সবই জানে, তবু চলে যুগের পর যুগ ভাঙা-গড়ার খেলা।
মাননীয় রেলমন্ত্রী, কয়েক লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে সবিনয়ে অনুরোধ করছি, পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের কয়েক মিনিটের জন্য হলেও সান্তাহারে যাত্রাবিরতি দিন। আপনি অমর হয়ে থাকবেন।
লেখক ঃ সহকারি অধ্যাপক-কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫