‘ঈদ চাঁদাবাজি’ বন্ধে কঠোর হতে হবে

‘ঈদ চাঁদাবাজি’ বন্ধে কঠোর হতে হবে

মীর আব্দুল আলীম : ঈদ চাঁদাবাজি নিয়ে সহযোগী একটি দৈনিকের প্রধান শিরোনাম “টার্গেট ৩শ’কোটি টাকা”। ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এবার ৩শ’ কোটি টাকা চাঁদাবাজির টার্গেট নিয়ে রাজধানীজুড়ে সক্রিয় কমপক্ষে ৭০টি গ্রুপ। সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজচক্রের হয়ে মাঠে তৎপর ৫ শতাধিক লাইনম্যান। এরা ক্ষমতাসীনদের মদদে পুলিশকে ম্যানেজ করে ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে হকার বসিয়ে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। এতে করে ব্যস্ত এলাকাগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয়ে মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে দখল হয়ে গেছে রাজধানীর ঢাকার ফুটপাত ও রাস্তা। পুলিশ ও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কঠোর হুঁশিয়ারির পরও ফুটপাথ হকারমুক্ত হয়নি। বরং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ফুটপাতের চাঁদাবাজরা।

ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছরই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। পত্রিকার খবরেই বলে দেয় এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। অবশ্য সড়ক-মহাসড়কে আগের বছরগুলোর মতো এবার বেপরোয়া চাঁদাবাজি না থাকলেও যানবাহন, বিশেষ করে মালবাহি ট্রাক, প্রাইভেট কার থামিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি বেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদ বকশিশের নামে সড়ক- মহাসড়কগুলোয় চাঁদা তুলছে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য। সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতারা ‘যানজট নিরসন প্রকল্পের’ নামে রসিদ দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছেন। এজন্য সড়কের প্রবেশ পথে মোতায়েন করা হয়েছে লাঠিয়াল বাহিনী। বাস, ট্রাক, কোচ, সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক, রিকশা-ভ্যান ইত্যাদি যানবাহন থামিয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে তাকে হয়রানি ও মারধর করা হচ্ছে।

পত্রিকান্তে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ফুটপাত দখলকারী গ্রুপ আছে কমপক্ষে ৭০টি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় রাজনৈতিক নেতাও প্রভাবশালী ব্যক্তি এই গ্রুপের সদস্য। এরাই ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে হকারদের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকে। ভাড়ার আড়ালে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতার নামে আদায় করা হয় মোটা অংকের টাকা। ফুটপাতের হকাররা জানান, রমজান শুরু থেকেই সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজরা চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। কয়েকটি এলাকায় সন্ত্রাসীদের নামেও চাঁদা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাঁদাবাজরা এলাকা ভেদে ২শ’ থেকে ৩শ’ দোকানের একটি অংশকে নাম দিয়েছে ‘ফুট’। চক্রাকারে ফুটের হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদার টাকা নিচ্ছে চাঁদাবাজ গ্রুপের নিয়োজিত লাইনম্যানরা। তাদের কাছ থেকে টাকা বুঝে নিচ্ছেন প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার মনোনীত সর্দার। লাইনম্যানের উত্তোলিত টাকার সিংহভাগই যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকর্মি ও মাস্তান বাহিনীর পকেটে। ফুটপাতের দোকানগুলোতে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার সঙ্গে জড়িত বিদ্যুৎ বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পকেটেও যাচ্ছে ‘লাইনম্যান’ ও সর্দারের উত্তোলিত টাকার একটি অংশ। রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার কয়েকজন হকার জানান, লাইনম্যানদের দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা পরিশোধ করে দোকান চালাতে হয়। চাঁদার রেট কম হলেই উচ্ছেদসহ বিভিন্ন হুমকি দেয়া হয়। ভেঙে দেয়া হয় দোকানপাট। এর সবই হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে।

চাঁদাবাজরা কিন্তু গর্তে লুকিয়ে থেকে চাঁদাবাজি করছে না! প্রকাশ্যেই চলছে তাদের তৎপরতা। তাহলে কেন তাদের নির্মূল করা যাচ্ছে না? সরকার ধরে ধরে রাজাকার, মাদক ব্যবসায়ী ও জঙ্গি নির্মূল করতে পারলে চাঁদাবাজদের বেলায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? জঙ্গি নির্মূল অসাধ্য মনে হলেও সরকার এ কাজে সফল হয়েছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা তো আত্মগোপনে নেই! তাদের কর্মকা  চলে অনেকটা প্রকাশ্যে। প্রকাশ্যে থাকার পরও তাদের দমনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।  বকশিশের নামে বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও পুলিশ বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধেও। চাঁদা দাবির ঘটনায় কিছু ক্ষেত্রে থানায় ডায়েরি ও মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা চাঁদাবাজির বিষয়ে পুলিশকে জানায়নি। ব্যবসায়ীরা বলেছেন ‘নীরব’ চাঁদাবাজিতে তাদের এখন ‘ত্রাহী মধুসূধন অবস্থা’। এলাকার বড় বড় সন্ত্রাসীর নাম করে চাঁদা চাওয়া হয়েছে। অনেক দাগি সন্ত্রাসী এলাকায় না থাকলেও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা ঈদকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এলাকার কিছু মাস্তান রাজনৈতিক নেতার পরিচয়েও চাঁদাবাজি করা হয়েছে ঈদের সময়।

 পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের বক্তব্য হলো, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কোথাও চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য যদি সত্য হয় তবে কেন ঈদকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি? অবাক ব্যাপার যে, কেবল ঈদের মৌসুমে নয় সারা বছরই চলে চাঁদাবাজি। ঈদকালীন চাঁদাবাজিতে চাঁদাবাজরা বরাবর সক্রিয় থাকলেও এবার যেন তারা অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, ফকিরাপুল, গুলিস্তান, এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নামকরা শীর্ষ সন্ত্রাসী, মৌসুমি চাঁদাবাজ, এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীরাই শুধু চাঁদা নিচ্ছে না। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদা আদায় করছে হিজড়ারা। শারীরিক অক্ষমতার অজুহাতে এরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে বাসাবাড়ি, যানবাহন ও ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র চাঁদাবাজির উৎসবে মেতে উঠেছে।

বছরের অন্যান্য সময় চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলেও ঈদ উপলক্ষে চাঁদাবাজরা এখন সত্যিই বেপরোয়া। ঈদ সামনে রেখে পরিবহন সেক্টরে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। চাঁদা না দিলেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় পরিবহন মালিক ও চালকদের। এ সেক্টরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, চাঁদাবাজির ঘটনায় অনেক সময় এক শ্রেণির অসাধু পুলিশ জড়িত থাকায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছে না মানুষ।
বস্তুত শুধু শুকনো কথায় চিঁড়া ভিজবে না। চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটন করে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়েছে, চাঁদা দাবি করে কেউ ফোন করলেই যেন পুলিশে খবর দেয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদেরও উচিত পুলিশকে সহযোগিতা করা। কিন্তু ব্যবসায়ীরা থানা-পুলিশের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না। ঈদ চাঁদাবাজিসহ সাংবাৎসরিক চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধে আইনশৃংখলা বাহিনীর আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। কোন এলাকায় কোন চক্র চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে, তা পুলিশের অজানা থাকার কথা নয়। এদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি সুস্থ সমাজ সর্বদাই আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। চাঁদাবাজি সুস্থ সমাজ কাঠামোয় বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হলে চাঁদাবাজি কমে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। জোরপূর্বক কারও কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিঃসন্দেহে অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দল ও সংস্থার নামেও চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা আদায় হয় হাট-বাজারে, ফেরিঘাটে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীর নামে। ঈদের সময় বাস ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের স্বেচ্ছাচারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি চাঁদাবাজরাও এজন্য দায়ী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এদেশে চাঁদা না দিয়ে কোনো ব্যবসা করা সম্ভব নয়।সমাজে শান্তি-শৃংখলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীসহ অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের পর প্রায়ই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজেই ছাড়া পায়। তাছাড়া জেল থেকে বের হয়ে চাঁদাবাজরা আরও সংহারী মূর্তি ধারণ করে। আইনশৃংখলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। চাঁদাবাজদের দমনে আইনশৃংখলা বাহিনীর আন্তরিকতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও ভাবতে হবে।

জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীসহ সব অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোনো বিকল্প নেই। এসব চাঁদাবাজদের কখনো কখনো গ্রেপ্তার করা হলেও আইনের ফাঁক ফোকরে তারা সহজেই ছাড়া পায়। জেল থেকে বের হয়ে আরো বিকট চেহারা নিয়ে আবির্ভাব হয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। এদের দমনে যেমন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার, তেমনি বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়েও ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে জনসাধারণের সহযোগিতা জরুরি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮