ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা

আলহাজ¦ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক :২১শে ফেব্রুয়ারি আন্ত-র্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখের বুলি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৯৫২ সালের এ দিনে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল একদল যুবকরা। সেই সালাম, বরকত, রফিকদের শহীদি রক্তের মাধ্যমেই মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত পেয়েছিল। যারা মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গ করেছেন চিরদিন এ দেশবাসী তাদেরকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। ১৯৫২ সাল থেকে এদেশে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে এ দিবসটি পালিত হলেও ২০০১ সাল থেকে গোটা দুনিয়ায় ২১শে ফেব্রুয়ারি “বিশ^ মাতৃভাষা দিবস” হিসাবে পালিত হচ্ছে। আল্লাহতায়ালা মানুষকে পরস্পরের মনের কথা বিনিময়ের জন্য শিক্ষা দিয়েছেন মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা। প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষেই শুধু নিজের মনের ভাব ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে, আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি নিজেই তাকে ভাব প্রকাশের জন্যে ভাষা শিখিয়াছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, করুণাময় আল্লাহ, শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাকে শিখিয়াছেন বর্ণনা। (সূরা রহমান আয়াত ১-৪) বর্ণনার মাধ্যম হলো ভাষা। মানুৃষের শ্রেষ্ঠতের অন্যতম মূল বুনিয়াদ হচ্ছে তার মনের ভাব প্রকাশের শক্তি তথা ভাষা। এখানেই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যবধান।

 মায়ের সাথে শিশুর সর্ম্পক যেমন- মাতৃভাষার সাথে মানুষের সম্পর্ক তেমন। এটা মানুষের স্বভাবের চাহিদা। তাই ইসলাম তার এ স্বভাবগত ও জন্মগত চাহিদাকে অস্বীকার করেনি বরং এর প্রয়োজনীয়তার উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছে এবং এর বিকাশের সর্বোত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তাইতো মহান আল্লাহ যুগে যুগে যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের প্রত্যেককেই সেই জাতির মাতৃভাষায় ব্যুৎপত্তি দিয়েই পাঠিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, “আমি সব পয়গাম্বরকেই তাদের স্বজাতির মাতৃভাষায় প্রেরণ করেছি” যাতে তাদেরকে (আমার বাণী) পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন, যাকে ইচ্ছা সৎপথে প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। (সূরাঃ ইব্রাহীম, আয়ত ঃ ৪) এই আয়াতের মাধ্যমেই মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা উপলদ্ধি করা যায়। মাতৃভাষার কথা বিবেচনা করেই আল্লাহতায়ালা যে এলাকায় যে নবীকে পাঠিয়েছেন তাকে ওই এলাকার ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং যাদেরকে আসমানি কিতাব দিয়েছেন সে কিতাবও ওই ভাষায় নাযিল করেছেন। যাতে সবাই বুঝতে পারে। যদি এর বিপরীত হতো যে, উম্মত এক ভাষায় কথা বলে আর নবী আরেক ভাষায় কথা বলেন, তাহলে কেউ কারও কথা বুঝতো না।

 ফলে যে উদ্দেশ্যে কিতাব নাযিল করা  হয়েছে তা চরমভাবে ব্যর্থ হতো। যেমন ইরশাদ করেন, আর যদি আমি কুরআন অনারবদের ভাষায় নাযিল করতাম তবে তারা অবশ্যই বলতো এর  আয়াত সমূহ বিস্তারিতভাবে বিবৃত হয়নি কেন? এ কেমন কথা অনারবী কিতাব এবং আরবিভাষী রাসূল। (সূরাঃ হা-মীম সাজদা, আয়াত ঃ ৪৪) বর্তমান বিশে^ হাজার হাজার ভাষা প্রচলিত আছে। কিন্তু নিজ মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে আমাদের দেশের ‘ভাষাপ্রেমিকরা’ ব্যতিত কেহ প্রাণ দিয়েছে, পুরো পৃথিবীতে এমন নযীর আর কোথাও নেই। আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতে যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন  তাদের প্রত্যেককেই এক বা একাধিক মুুজিযা দান করেছেন। তেমনি আমাদের সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর বিশেষ মুজিযা হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘আল কুরআন’। আর কুরআনের মুজিযাসমূহের অন্যতম মুজিযা হলো ভাষা-সাহিত্য। ভাষা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। তিনি ইরশাদ করেন, তাঁর (আল্লাহর) আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য! নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সূরাঃ রুম, আয়াত ঃ ২২) এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে বিভিন্ন স্তরের বর্ণবৈষম্য, বিভিন্ন স্তরের মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণনা ভঙ্গি মহান কুদরতের এক বিস্ময়কর লীলা। কোন কোন ভাষা পরস্পর এত ভিন্ন যে, এদের  মধ্যে পারস্পারিক কোন সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয় না। স্বর ও উচ্চারণ ভঙ্গিও ভাষার ভিন্নতার শামিল। প্রত্যেকের কন্ঠস্বর অন্য জনের কন্ঠস¦র থেকে আলাদা। অথচ এই কন্ঠস্বরের যন্ত্রপাতি তথা জিহ্বা, ঠোট, তালু ও কন্ঠনালী সবার মধ্যেই অভিন্ন ও একরূপ। কোন জাতির উপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দেয়ার অর্থ হল আল্লাহর এ কুদরতকে অস্বীকার করা। আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যারা আত্মবিসর্জন দিয়েছেন সেই সব শহীদদের এ দেশের মানুষ স্মরণ করবে, দোয়া ও তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে।   

লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০