ইসলামে তওবা ও ইস্তেগফারের গুরুত্ব

ইসলামে তওবা ও ইস্তেগফারের গুরুত্ব

মাহমুদ আহমদ : ইসলাম আমাদেরকে উচ্ছৃঙ্খল জীবন পরিহার করে বিনয়ী এবং ন¤্র হয়ে চলার শিক্ষা দেয়। সবার সাথে, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন মানুষ হিসেবে তার প্রতি প্রীতিময় সম্পর্ক রাখার শিক্ষাই পবিত্র কোরআন থেকে পাওয়া যায়। চলার পথে আমরা কতই না মন্দকাজ করে ফেলি কিন্তু সেগুলোর জন্য আমরা আল্লাহপাকের কাছে ক্ষমা চাই না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখতেই অধিক পছন্দ করেন। তিনি চান তার বান্দারা যেন নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে পবিত্র করার চেষ্টা করে আর তার কাছে ক্ষমা চায়। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পরিণতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনার নাম হলো ইস্তেগফার। আল্লাহপাকের ক্ষমা লাভের জন্য চাই ইস্তেগফার। আমরা যদি আমাদের পাপ সমূহ ক্ষমার জন্য ইস্তেগফারে রত থাকি তাহলে আল্লাহপাক হয়তো আমাদের দোষত্রুটি ক্ষমা করে দিবেন। এ বিষয়ে একটি হাদিসে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ‘ইস্তেগফার’-এর সাথে আঁকড়ে থাকে অর্থাৎ ইস্তেগফারে সর্বদা নিয়োজিত থাকে আল্লাহতায়ালা তাকে সর্ব প্রকার বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধারের পথ সৃষ্টি করে দেন আর প্রত্যেক দূরাবস্থা থেকে উত্তরণের রাস্তা বের করে দেন আর তাকে ঐ সমস্ত রাস্তায় দান করেন যা সে ধারণাও করতে পারে না’ (সুনান আবি দাউদ)। তাই আমাদেরও উচিত হবে সর্বদা ইস্তেগফারে রত থাকা। আমরা যখন যেই অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমরা ইচ্ছা করলেই মহান আল্লাহপাককে স্মরণ করতে পারি। আমাদের কারো জানা নেই যে কখন, কোন অবস্থায় মৃত্যু ঘটবে।
আল্লাহতায়ালা সুরা নুহ-এ মানুষকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আর আমি বললাম, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য দেবেন বাগ-বাগিচা তথা জান্নাত এবং তোমাদের জন্য  তৈরি করবেন নদী-নালা’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)। হজরত আনাস (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন : ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই অপরাধী। উত্তম অপরাধী তারাই যারা তওবা করে, ক্ষমা চায়’ (আবু দাউদ)। আমরা যদি আমাদের দোষ-ত্রুটিকে ক্ষমা করাতে চাই তাহলে ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আমি ভুল করেছি, তারপর আমার মাঝে উপলব্ধি হলো আর আমি এর জন্য আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করে ক্ষমা চাইলাম আর তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিলেন। তাই বলে বার বার ভুল করবো আর আল্লাহ কাছে ক্ষমা চাইতে থাকবো তা ঠিক নায়। মুমিন একই ভুল বার বার করেন না। আমাদেরকে এমনভাবে ইস্তেগফার করতে হবে যেন আমার দ্বারা দ্বিতীয়বার এমন ভুল আর কখনও সংঘটিত না হয়।

এছাড়া সর্বদা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে আমাদেরকে এই প্রার্থনাই করতে হবে, যেভাবে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম-তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খাসেরিন’ অর্থাৎ ‘হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা নিজেদের প্রাণের ওপর যুলুম করেছি আর তুমি আমাদের ক্ষমা না করলে এবং আমাদের ওপর কৃপা না করলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩)। আমরা যেন সর্বদা মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও তওবা করতে থাকি এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আবার আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘ওয়া আনেসতাগফিরু রাব্বাকুম সুম্মা তুবু ইলাইহে’ অর্থাৎ ‘তোমরা তোমাদের প্রভু-প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাইবে, তার কাছে সবিনয়ে তওবা করবে’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৩)। আল্লাহপাক আমাদেরকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা ভুলের উর্ধ্বে নই। প্রতিনিয়ত তার কোনো না কোনো গোনাহ আমাদের দ্বারা হয়েই থাকে। আমাদের পাহাড়সম গোনাহ হয়ে গেলেও ক্ষমা চাইলে আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিতে পারেন।

হজরত আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন: আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা অপরাধ করে থাক রাত-দিন। আমি সব অপরাধ মাফ করে দেই। সুতরাং তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব’ (মুসলিম ও মিশকাত)। অপর আরেকটি হাদিস যা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবী (সা.) বলেছেন- ‘সেই সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার জীবন। তোমরা যদি গোনাহ না কর; তবে আল্লাহ তোমাদেরকে নিয়ে যাবেন এবং এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসবেন, যারা গোনাহ করবে এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করবে। অত:পর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন’ (মুসলিম)। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা প্রদান করে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ধাবমান হও, যার প্রশস্ততা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর ন্যায়। যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকি তথা আল্লাহ ভিরুদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা রাগ সংবরণকারী আর মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ নেককারদেরকে ভালবাসেন’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৩৩-১৩৪)। মহান আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। ফলে ক্ষমা পাওয়ার জন্য খাঁটি মনে জীবনের যত গুনাহ রয়েছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া প্রয়োজন। গুনাহের জন্য যদি আমি মনে মনে অনুতপ্ত না হই, শুধু মুখে মুখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তাহলে খাঁটি তওবা হবে না। তওবা করতে হবে আন্তরিকভাবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের সবিনয় প্রার্থনা, হে আল্লাহ! আমাদের সব দোষত্রুটি ক্ষমা করে তোমার ক্ষমা ও নিরাপত্তার চাদরে আমাদেরকে আবৃত করে রাখ, আমিন।
  লেখক : ইসলামী গবেষক-প্রাবন্ধিক
[email protected]