ইসলামই প্রতিষ্ঠা করেছে শ্রমের অধিকার

ইসলামই প্রতিষ্ঠা করেছে শ্রমের অধিকার

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন :ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার মধ্যে রয়েছে মানব জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান। মনে রাখতে হবে মানবতার ধর্ম ইসলাম শুধু আচার সর্বস্ব কিছু ইবাদতের নাম নয় বরং জীবনের সার্বিক কর্মকান্ডের ব্যবস্থাপনায় ইসলামের নির্দেশনা ও দর্শন খুবই সুন্দর সুস্পষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন ফা ইয়া কুদিয়াতিসসালাতু ফানতাশিরু ফির আরদ্বি ওয়াবতাগু মিন ফাদলিল্লাহি ওয়াজকুরুল্লাহা কাসিবান আআল্লাকুম তুফলিহুন। (সূরা জুমুআ, আয়াত ৩০) “নামায সম্পাদন শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর। আর আল্লাহকে অধিক হারে স্মরণ কর। নিশ্চয়ই তোমরা সফল হবে।” (আল কোরআন) সবুজ পত্র - পল্লবে সুশোভিত বৃক্ষরাজির মূলে যেভাবে খাদ্যরস সক্রিয়, তেমনি সভ্যতার উত্থান ও শিল্পের বিকাশে শ্রমিকের মেধা ও শ্রম কার্যকর। জীবন জীবিকার নেহায়েত প্রয়োজনে শ্রমিকরা যুগ যুগ ধরে শ্রম বিনিময় করে আসছে। অথচ নানা আন্দোলনের পরও আজো শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায়নি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কার্যকর লেখায় শ্রমিকদের বিবর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে। দেখিনু সেদিন রেলে/ কুলি বলে এক বাবু সাব তারে/ ঠেলে দিল নিচে ফেলে। চোখ ফেটে এল জল/ এমনি করে জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? মহান আল্লাহর দেয়া অফুরন্ত অনুগ্রহরাজি আকাশ-বাতাস, মাটি ও পানিতে বিরাজমান। ছক বাঁধা আনুষ্ঠানিক ইবাদত সম্পন্ন করার পর নিজেদের জীবন - জীবিকা নির্বাহ করার মধ্য দিয়ে ব্যাপক উন্নয়নের লক্ষ্যে এসব অনুগ্রহরাজির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

 এজন্য ¯œায়ুশ্রম ও কায়িক পরিশ্রমের বিকল্প নেই। একদা নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রিয় দৌহিত্র আলী তনয় হযরত হাসান ও হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহুমাকে অভূক্ত দেখে তাঁদের খাবার যোগাড় করতে নিজেই কাজের সন্ধানে ছুটলেন। জনৈক  ইহুদীর কুপ থেকে খেজুরের বিনিময়ে পানি তোলার কাজ নিলেন। তা থেকে প্রাপ্ত খেজুর নিজে খেলেন এবং প্রিয় সন্তানদের খাওয়ালেন। নবীজী (সা) মজুরির বিনিময়ে নিজ হাতে কাজ করে শ্রমিকদের জন্য সুন্নাত তথা আদর্শ স্থাপন করলেন। সুতরাং কায়িক পরিশ্রমে কারো কুণ্ঠাবোধ থাকা উচিত নয়। শ্রমিকের শক্ত হাতে নবীজী (সা) হাত বুলিয়ে মমতার পরশে আবদ্ধ করে বলেছেন - শ্রমিকের হাত আল্লাহর কাছে প্রিয়। সাথে সাথে অলসতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। কঠোর মেহনত ও পরিশ্রমের প্রতি ইসলাম উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং শ্রম বিনিয়োগকারী শ্রমিক ভাইদের অধিকার রক্ষার জোরালো নির্দেশ দিয়েছে নিয়োগদাতাদের প্রতি। মহান আল্লাহ বলেন- ইন্নাল্লাহ লা - ইউদ্বিউ আজরাল মুহসিনীন। মহান আল্লাহ সৎকর্ম পরায়ণদের মজুরী বিনষ্ট করেন না।” মানুষ তার কাজের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে পাবে।

 এই প্রতিদানে কোনরূপ ব্যত্যয় ঘটবে না। প্রতিদান তথা মজুরী প্রদানে শ্রমিকদের সাথে কোনরূপ গড়িমসি কিংবা তালবাহানা করা যাবে না। অনন্যোপায়ী শ্রমিকদের উপর কালাকানুন তৈরি করে তাদের দুর্বলতার সুযোগে কোনরূপ  জুলুম করা যাবে না। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি তাদের গায়ের ঘাম শুকানোর আগে প্রদানের নির্দেশ দিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন - “ আ’তুল আজিরা আজারাহু কাবলা আন ইয়াযুফফা আরকুহু”। সুতরাং যারা শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি প্রদানে গড়িমসি করে তারা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রীতিবিরুদ্ধ কাজ করে, সাথে সাথে তাদের মানবতা বিবর্জিত রূপটিও ফুটে ওঠে। শ্রমিক - মালিক কার্য ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শ্রম ব্যয় করলেও শ্রেণী বৈষম্যকে ইসলাম স্বীকার করে না। সাধারণত মালিক বা কর্তৃপক্ষ তার অধীনস্থ শ্রমিকদের শ্রমিক জ্ঞান করা অস্বাভাবিক নয়, তবুও মানবতার নবী এই বিভাজন নির্মুল করার জন্য শ্রমিককে  মালিকের ভাই হিসেবে উল্লেখ করে বলেন- “যার নিকট তার অধীনস্থ ভাইশ্রমে নিযুক্ত থাকে, সে যেন তাকে তা খেতে দেয় যা সে খায়। তা পরতে দেয় যা সে পরিধান করে। এবং তাকে সাধ্যাতীত শ্রমে বাধ্য করবেনা। এমন কাজ তার উপর চাপিয়ে দিলে মালিক তাকে যথাযথ সহযোগিতা করবে।” (আল হাদীস)

তেমনি ভাবে শ্রমিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে যথাযথ দায়িত্ব পালন করা, কর্ম ঘন্টায় ফাঁকি না দেওয়া, মালিকের ধন-সম্পদ, পণ্য- দ্রব্য আসবাবপত্র, সরঞ্জাম, সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ও মালিকের ব্যবসায়িক সুনাম পূর্ণ জিম্মাদারীর সাথে হেফাজত করা। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মালিকের কোনরূপ ক্ষতি সাধন না করা। মালিকের উপস্থিতিতে যেভাবে ধন-সম্পদের সুরক্ষা করা কর্তব্য, তাঁর অনুপস্থিতিতে সে সব সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষা করা শ্রমিকের উপর আরো বেশী কর্তব্য। দেশ জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিতে শ্রমিক মালিক একে অপরের পরিপূরক। সুতরাং শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই, এর মাঝে বিভেদ নাই। শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করবে মালিক। আর মালিকের স্বার্থ রক্ষা করবে শ্রমিক। তবেই দেশ জাতি সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে। এটাই হচ্ছে ইসলামের বিধান। পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে হয় নবীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা মেহনত কর সবে।
লেখক  ঃ কলেজ প্রভাষক, ইসলামী গবেষক।   
কলামিষ্ট ও জামে মসজিদের খতিব।
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮