ইশতেহার: কেউ কথা রাখে কেউ রাখে না

ইশতেহার: কেউ কথা  রাখে কেউ রাখে না

রবিউল ইসলাম (রবীন) : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের  মাত্র ১১ ্ও ১২ দিন আগে বড় দুই দল নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগ ইশতেহার প্রকাশ করেছে ১৮ তারিখে। তার আগের দিন ইশতেহার প্রকাশ করেছে ঐক্যফ্রন্ট। ১৬ কোটি মানুষ  কবে বা কখন জানবে এই ইশতেহার? অবশ্য ইশতেহার পড়ে এ দেশের ভোটাররা ভোট কমই দেয়। এ দেশে মার্কা দেখে বেশি ভাগ মানুষ ভোট দেয়। কিছু লেখক, কলামিষ্ট ইশতেহারের ভালো, মন্দ দিকগুলো তুলে ধরেছেন। কিন্তু যারা ভোটের মালিক সেই ভোটারদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারলে ভালো হতো।  বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের মতামত জানা জরুরি। গত তিন দিন ধরে ৭৭ জন বিভিন্ন পেশার মানুষের  ইশতেহার নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি। অবাক এবং মন খারাপ করার কথা যে, এই সংখ্যার অর্ধেকেরও মানুষ ইশতেহার ভাল বোঝেনা বলে জানিয়েছে। মাত্র ৯ জন শিক্ষিত তরুণ, ৩ জন শিক্ষক  জানিয়েছে তাঁদের প্রতিক্রিয়া। ১১ জন ভয়ে বা সংকোচ নিয়ে জানিয়েছেন তাঁরা এই বিষয়ে কথা বলবে না।

যে ১২ জন ইশতেহার নিয়ে উত্তর দিয়েছেন তাঁরা সুশাসন, বেকারদের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ, শিক্ষার মান বৃদ্ধি, চাকরিতে প্রবেশের সীমা ৩৫ নির্ধারণ, বাল্যবিবাহ, যৌতুক দুরকরণ, নিরাপদ সড়ক নিয়ে বাস্তব ভিত্তিক পরিকল্পনা, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম পাবার ব্যবস্থা, মাদক নির্মূল ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রগতি চায়। দুজন ভোটার উত্তেজিতভাবে জানিয়েছে, ’আরে ভাই রাখেন আপনার ইশতেহার, ভোটটা দিতে পারবো তো?’ একজন নারী ভোটার বলেছেন, ’আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে প্রচন্ড দুশ্চিন্তায় আছি। প্রাইভেট, কোচিং ও সংসারের অন্যান্য খরচে জীবন হিমসিম। পারলে এগুলি নিয়ে রাজনীতিবিদদের ভাবতে বলুন। ব্যাপক পড়ার চাপে ওদের মুখের দিকে তাকানো যায়না।’ কয়েকজন বেসরকারি শিক্ষক বলেছেন, আমরা আশায় ছিলাম বড় দলগুলো তাঁদের ইশতেহারে জাতীয়করণের বিষয়টি উল্লেখ করবে। একজন কৃষক জানালেন, হ্যামাকের ফসলের নায্য দাম পালে হামরা খুশি।

অস্বিকার করা যাবে না যে ইশতেহারে ভাল কিছু নেই, বরং চমক আছে। এখন চমকের মৌসুম চলছে। রাজনীতিতে কে কত চমক দেখাতে পারবে তার প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু যতোই ভাল ইশতেহার ঘোষণা দেওয়া হোক না কেন, মানুষ তার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। বুদ্ধি, বিবেচনা হওয়ার পর থেকে দেখছি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনেকে নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রথমেই ’জেহাদ’ ঘোষনা করে বসে। এই দুটি সমস্যা যে কি ভয়াবহ অবস্থায় চলে গেছে, তা আশা করি সবাই অবগত আছেন। রাজনীতিবিদরা কতটুকু ভাবেন বিষয় দুটি নিয়ে? দুর্নীতি দূর করার জন্যই বা আমরা কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? ঘুষ লাগেনা বা ঘুষবিহীন এ দেশে কোন অফিস আছে? দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডও আমাদের আছে। দলীয়করণ বন্ধ তো হয়নি, বরং সর্বস্তরে এখন এটি মহোৎসব চলছে। এগুলোর বিরুদ্ধে নানা প্রতিশ্রুতি দলগুলো দিয়েছিল গত নির্বাচনী ইশতেহারে। কেউ কথা রাখে না। ৪৭ বছর কেটে গেল।

এমন একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচনী ইশতেহারের কোনো মূল্য আছে তাহলে ? সম্ভবত খুব একটা নেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ’মানুষ পণ করে পণ ভেঙে ফেলে হাফ ছেড়ে বাঁচবার জন্য, অতএব পণ না করাই ভালো।’ আমাদের দেশে জবাবদিহির সংস্কৃতি খুব একটা নেই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এখানে অনেক ক্ষেত্রে থাকে অপরিমেয়, অনির্দিষ্ট এবং অস্পষ্ট। অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো পারুক আর নাই পারুক, ইশতেহারে অনেক ভালো কথা, চমক কথা তারা লিখে রাখবে। ক্ষমতার আসার পর কেউ আর এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না। উন্নত রাজনৈতিক বিশ্বে ইশতেহারের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেখানে ইশতেহার মানে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বা নির্বাচনে জেতার কৌশল না। ইশতেহার মানে পবিত্র প্রতিশ্রুতি,এমনকি প্রতিজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রে। আমেরিকায় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে দলগুলো নির্বাচনকালিন প্রতিশ্রুতির সিংহভাগ বাস্তবায়ন করে থাকে। ওরা আমাদের মতো দিনরাত শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে মাইক বাজিয়ে প্রচার করে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে পোস্টার তৈরি করে না। নির্বাচন নিয়ে মারামারি করে না। জনগণ বা ভোটাররা সেখানে যথেষ্ট সচেতন।

নির্বাচন নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ব্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্যাকের একটি জরিপে জানা গেল, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারকে দেশের ৮ৃ৩ শতাংশ মানুষ গুরুতপূর্ণ বিবেচনা করে এবং মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ ইশতেহারের আলোকে ভোট দেন। ব্র্যাকের জরিপে আরো জানা যাচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোটাররা পাঁচটি ইস্যুকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার শীর্ষে আছে কর্মসংস্থান-প্রায় ২৮ শতাংশ। এরপর যথাক্রমে পরিবহন, শিক্ষা, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ। বোধকরি এ কথাগুলো ১৬ কোটি মানুষেরও । মাননীয় রাজনীতিবীদগণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ঘরে বসে নয়, মানুষের অনেক কাছে গিয়ে দাঁড়ান, তাঁরাই বলে দেবেন ইশতেহারে কী লিখতে হবে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-সহকারী অধ্যাপক
০১৭২-৫০৪৫১০৫