আষাঢ় মাসে পানি নেই চলনবিলে !

আষাঢ় মাসে পানি নেই চলনবিলে !

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল : চলনবিলাঞ্চলে আষাঢ় মাসেও বিলের তলানিতেও এখনো পানি নেই! মূলতঃ সাম্প্রতিক সময়ে  পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, এক সময়ে চলমান জল প্রবাহের চলনবিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এরই মধ্যে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অথচ মাত্র দুই-তিন দশক পূর্বেও চলনবিলের মাঠ, ঘাট, নদী নালা, খাল বিল আষাঢ় মাসে পানিতে টইটুম্বর হয়ে থাকতো।এমনটি জানিয়েছেন লালুয়ামাঝিয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি খন্দকার আব্দুল জব্বার (৭৫)। আর পানির ওপর নির্ভর করেই নৈসর্গিক চলনবিলে অপরূপ সাজে সেজে উঠতো। এ অঞ্চলে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে, ‘‘গাও দ্যাখতো কলম, আর বিল দ্যাখতো চলন ” -এই প্রবাদের কারণেই এক সময়ের ধান ও মাছের প্রাচুর্য্যে ভরা চলনবিলে শত শত দ্বীপ সদৃশ্য গ্রামগুলো দেশের অনেক পর্যটকদের আকর্ষণ করতো। অনেকেই তাই দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলকে দেখতে আসতেন বর্ষাকালে। আর নৌ ভ্রমণের মাধ্যমে চলনবিলকে দেখতেন। এছাড়া সে সময়ের নির্মল আবহাওয়ায় চলনবিলের মানুষজন জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।

অথচ বর্তমানে চলনবিলের প্রাত্যহিক তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। চলনবিলের একাধিক প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক সময়ের চলনবিল পানির ওপর নির্ভর করে চলনবিলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া ও নওগাঁর আত্রাই এলাকার কৃষক প্রায় লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে মাটিয়া গড়ল, শরশরিয়া, লাউজাল, লালদিঘা সহ বিভিন্ন জাতের বোনা আমন ধানের আবাদ করতেন। যাতে কৃষকের খরচও কম হতো ও বাম্পার ফলনও পেতেন এমনটি জানিয়েছেন- তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম।

অথচ বর্তমান সময়ে চলনবিলে পানি না থাকায় বোনা আমন ধানের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ১০-১৫ বছরে হারিয়ে গেছে নানা জাতের পুষ্টিকর আমন ধানের সেই সব জাত। বর্তমানে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে চলনবিল পানি শূন্য থাকায় কৃষক সেচ যন্ত্র চালিয়ে বর্ষাকালীন রোপা ধানের আবাদ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কৃষকের বোনা আমন ধানের আবাদের জমি কমে আসছে। এছাড়া  চলনবিলের পানির ওপর নির্ভর করে প্রায় ৬-৮ মাস শত শত জেলে মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকতেন এবং মাছ শিকারের ওপরই তাদের পরিবারের জীবন জীবিকা চালাতো এটাই ছিল তাদের অন্যতম পেশা। মৎস্য অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, চলনবিলের দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু মিঠা পানির মাছ দেশের চাহিদা পূরণ করতে সে সময়ে বড় একটা ভূমিকা রাখতো। চলনবিলের কৈ, শিং, মাগুরা, পাবদা, ট্যাংরা, টাকি, খলিসা, বোয়াল, শৈল, চিতল সহ ৩০-৩৫ প্রজাতির মাছ দেশের মানুষের মাছের চাহিদা করার পাশাপাশি মাছের স্বাদ নিয়ে গল্প করতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তব অবস্থা ১০-১৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তিও হয়ে চলনবিলে।

 আবার চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা নদী গুমানী, আত্রাই, গুড়, করতোয়া, বড়াল, ভদ্রাবতী, চিকনাই, বানগঙ্গা, বারনই, তেলকুপি, চেচুয়ার সহ ১৬টি নদী নিমাইচড়া খাল, ভাসানীর খাল, হক সাহেবের খাল, উলিপুরের খাল, কিশোর খালী খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলার খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাল, গোহালা খাল, গাঁঢ়াবাড়ী খাল, বিদ্যাধার খাল, দারুখালী খাল, বিলসূর্য, কুমারডাঙ্গা, কিনু সরকারের ধর, পানাউল্লার খাল, জানিগাছার জলা ও কাটেঙ্গার খালের আর বর্তমানে চলনবিলের মাঠ ঘাট নেই কাংখিত পানি। চলনবিলে অসংখ্য নদ-নদী ও খাল-বিল পানি থাকার কারণেই জলপথে পরিবহনে বজরা নৌকা, পানসী, ডিঙ্গি নৌকা সহ জলযানে মালামাল ও যাত্রী আনা নেওয়া করা হতো। যা ছিল যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে নিরাপদ। মূলতঃ চলনবিলের পানির ওপর নির্ভর করে এ সকল পেশার হাজারও মানুষের জীবন-জীবিকা চলতো স্বাচ্ছন্দে। কিšুÍ সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে জলবায়ুর প্রভাবে চলনবিলের আবহাওয়ায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। শুরু হয়েছে তাপদাহ, অসময়ে অতি বৃষ্টি সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত এক দশক ধরে চলনবিলে আষাঢ় মাসেও পানি না আসায় এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনে ছন্দ -পতন ঘটেছে। অথচ ২০-৩০ বছর পূর্বেও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে চলনবিল পানিতে থৈ থৈ করতো। আবার চলনবিলের শতাধিক খাল-বিল পানি শূন্য থাকায় বিলের মধ্যে নৌকা চলার পরিবর্তে বর্তমানে পায়ে হেঁটেই পথচারীরা চলাচল করছেন। চলছে না নৌকা মিলছে না মাছ।

কুন্দইল গ্রামের মোকারম হোসেন (৬৫) জানান,  মৎস্যজীবিরা পানি না থাকায় হাত গুটিয়ে বসে আছে।  রাজশাহী বিশ্ব¦ বিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, চলনবিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় পানিতে থাকা কুচিয়া, কচ্ছপ, শামুক, ঝিনুক, শৈবাল সহ নানা জলজ উদ্ভিদের প্রাপ্যতা কমে আসায় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আর এরই মধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনে চলনবিলের মানুষের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্য পেশায় চলে যেতে হচ্ছে তাদের জীবন জীবিকার তাগিদেই। চলনবিলে নির্দিষ্ট সময়ে পানি আসার কারণ প্রসঙ্গে তাড়াশের চলনবিল বাঁচাও আন্দোলন সংগঠনের অন্যতম কর্মী আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, এক সময়ের পানিপূর্ণ চলনবিলের জীব বৈচিত্র্যপূর্র্ণ ছিল এবং নানা পেশার তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। অথচ গত দুই দশকে চলনবিলে আষাঢ় মাসেও পানি শূন্য থাকাটা জলবায়ু পরিবর্তনের অশনি সংকেত। তাই চলনবিলকে বাঁচাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক ঃ প্রভাষক-কলামিষ্ট
[email protected]
০১৭১২-২৩৭৯৩৩