আরো কমেছে ধানের দাম

আরো কমেছে ধানের দাম

আব্দুল হাই রঞ্জু : বোরো ধানের কাটা মাড়াই শেষ। এখন চলছে আগামী আমন মৌসুমের ধান চাষাবাদের প্রস্তুতি। এ বছর বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি কৃষক। ফলে আসন্ন আমন মৌসুমের কৃষি চাষাবাদের খরচ মেটানো কৃষকের পক্ষে কষ্ট সাধ্যই হবে। অথচ কৃষকদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও ভাল নেই তাঁরা। মূলত ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে বাড়তি সরবরাহের কারণে ধানের দাম একটু কমই থাকে। কৃষকের গোলায় ধান উঠার পর ধানের দাম কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণই ভিন্ন। ধান কাটা মাড়াইয়ের ভরা মৌসুমে কৃষক প্রতি মণ ধান ৫ ‘শত টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারলেও এখন গোলার ধান বিক্রি হচ্ছে ৫‘শ টাকার নিচে।

বাস্তবতা হচ্ছে, কৃষি পণ্যের ফলন বেশি হলেই উপযুক্ত মূল্য সংকটে পড়তে হয় চাষীদের। এ বছর বোরো মৌসুমেও বাড়তি ফলনের কারণে মূল্য সংকটে পড়তে হয়েছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে। কৃষি অধিদপ্তর বোরো মৌসুমে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়তি জমিতে চাষাবাদ হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে। খোদ কৃষি বিভাগ ও খাদ্য বিভাগের হিসাবে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনের খরচ ২৪ টাকা নির্ধারণ করে সরকারি ভাবে প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকায় কেনার ঘোষণা দিলেও প্রকৃত অর্থে বোরো ধান ১৭-১৮ টাকা কেজিতে চাষীদের বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ধান চাষীদের প্রতি কেজি ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৬/৭ টাকা। প্রতি কেজিতে যদি ধান চাষীরা ৬/৭ টাকা লোকসান গুনে, যা মণের আকারে দাঁড়ায় ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায়।  

সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় চলতি বোরো মৌসুমে ২৬ টাকা কেজি দরে মাত্র দেড় লাখ টন ধান ও চাল কল মালিকগণের নিকট থেকে প্রতি কিজে ৩৬ টাকা করে ১০ লাখ টন চাল কেনার ঘোষণা দেন। খাদ্য অধিদপ্তর বিপুল পরিমাণ চাল কিনলেও প্রকৃত অর্থে ধান চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়নি। মূলত সরকার ধান চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও আপদকালিন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণভাবে ধান চাল সংগ্রহ করে থাকে। এ বছরও এর কোন ব্যত্যয় হয়নি। দেড় লাখ টন ধান কেনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, তালিকা প্রণয়ন, আবার কোথাও কোথাও লটারির মাধ্যমে কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করতে মাত্রাতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে মন্থর গতির কারণে এর প্রভাব বাজারে পড়েনি। সরকার চায় ধান চাষীদের উপযুক্ত মূল্য যেন নিশ্চিত হয়। যা সফল করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় আরো অতিরিক্ত ২ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টন ধান কেনার ঘোষণা দিলেও কার্য্যত বাজারে তেমন কোন প্রভাব পড়ছে না।

এর মূল কারণ হলো মন্থর গতিতে ধান সংগ্রহের কৌশল অবলম্বন। মন্থর গতির এই কৌশলে ধান সংগ্রহ করলে প্রকৃত অর্থে উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। প্রয়োজন ধান কাটা মাড়াই মৌসুমের শুরুতে সরকারকে হাট-বাজার, গ্রামে-গঞ্জে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ধান কেনার উদ্যোগ নেওয়া। সরকারকে একদিকে ধান কিনতে হবে এবং সে ধান চাল কল মালিকের মাধ্যমে ছাঁটাই করার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য বর্তমান ছাঁটাই রেট পরিবর্তন করে যৌক্তিক দর নির্ধারণ করতে হবে। তাহলে কম-বেশি সকল চালকল মালিকগণই শতভাগ জামানত প্রদান করে ধান ছাঁটাইয়ে অংশগ্রহণ করবে। এতে বর্তমান স্থান সংকুলানের অভাবে যেমন সরকার ইচ্ছা থাকলেও অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের ধান বেশি পরিমাণ কিনতে পারেন না, তখন আর সে সংকট থাকবে না। ফলে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অবশ্য কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, আমি কথা দিচ্ছি, আগামী মৌসুম থেকে ধান চাষীরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন। আমরাও আশা করছি, কৃষিমন্ত্রীর এ ঘোষণার যেন বাস্তব প্রতিফলন হয়। ভয় হয় - কারণ আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা যেভাবে জনকল্যাণের কথা গাল ভরে উচ্চারণ করেন, বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন হয় না। যেহেতু কৃষিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক একজন সফল খাদ্যমন্ত্রী, সেহেতু আমরা মনে করি, প্রকৃত অর্থে ধান চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি গোটা দেশে গড়ে ওঠা একমাত্র চাল কল শিল্পকে রক্ষায়ও কৃষিমন্ত্রী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিবেন।

 আমরা চাই, ধান চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্য যেমন নিশ্চিত করতে সরকারকে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তেমনি কৃষিভিত্তিক চাল কল শিল্পকে রক্ষায় হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়নেরও উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে চালকলের সাথে জড়িত হাজার হাজার নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। ধান চাষী, চাল কল শিল্পের স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ ধান চাষীরা উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ধান চাষে আগ্রহ হারালে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধানের অভাবে চালকল শিল্পকেও টিকে রাখা কঠিন হবে। সংগতকারণে ধান চাষীদের স্বার্থ রক্ষা করে চাল কল শিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অবশ্য সরকার কৃষি উন্নয়নে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে প্রণোদনা ও প্রতিবছর কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। গত ২০১৮ সালে প্রান্তিক পর্যায়ের ৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৭০ জন কৃষকের জন্য ৭৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার প্রণোদনা প্রদান করে। এসব প্রণোদনার টাকা গম, ভুট্টা, সরিষা, চীনাবাদাম, বিটি বেগুন, বোরো, শীতকালিন মুগ ও গ্রীষ্মকালীন তেল চাষের জন্য চাষীদের দেওয়া হচ্ছে। এ বছর বোরো চাষের জন্য ৭১ হাজার ৭০০ জন কৃষককে নগদ অর্থ, বীজ, সারের ওপর প্রণোদনা দেওয়া হবে। মূলত সরকারি সহায়তার কারণে প্রতিনিয়তই খাদ্য শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শুধু ধানই নয়, এর পাশাপাশি সবজি চাষেও বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশে উৎপাদিত শাক-সবজি দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত সবজি এখন বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। বিশেষ করে আলু চাষে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন এসেছে। এখন যে পরিমাণ আলু উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই উৎপন্ন হচ্ছে, যা দিয়ে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করার মত যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কিছু আলু রফতানির সুযোগ থাকলেও কাংখিত পর্যায়ে রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক সময়ই আলুর চাষ করে আলু চাষীদেরও লোকসান গুনতে হয়। সম্ভাবনাময় এই সবজির চাষাবাদ বৃদ্ধি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কারণ আমাদের দেশে এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে বিশাল বিশাল চরগুলের সৃষ্টি হচ্ছে। এসব চরাঞ্চলে এখন আলুসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদিত সবজির উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাড়তি সবজি চাষ  করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশ থেকে যে হারে উৎপাদিত সবজি বিদেশে রফতানি হচ্ছে, চাষাবাদের এ ধারা অব্যাহত থাকলে সবজি রফতানির পরিমাণও বেড়ে যাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। অতিসম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী ধান চাষীদের ধানের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে চাল রফতানির ঘোষণা করেছেন। বাস্তবে যদি ভাল মানের চাল বিদেশে রফতানি করা যায়, তাহলে বর্তমানে ধান চাষীদের যে দুর্দশা তা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। তা না হলে কৃষকের স্বার্থের কথা বলতে বলতে হয়ত মুখে ফেনা তোলা সম্ভব হবে কিন্তু প্রকৃত অর্থে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যামূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আর কৃষকের উৎপাদিত ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে ধান চাষীরা ধান চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। তাহলে আর যাই হোক, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে, তা অনেকাংশেই বিঘিœত হতে পারে।   

লেখক : প্রাবন্ধিক
ahairanju@gmail.com
০১৯২২-৬৯৮৮২৮