আরেক দফা সঙ্কটের দিকে নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী: ফখরুল

আরেক দফা সঙ্কটের দিকে নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী: ফখরুল

জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আগামী নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত না থাকায় হতাশা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে দেশকে আরেক দফা সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিলেন তিনি।

বিএনপির বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের চার বছর পূর্তিতে শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বক্তব্যে সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগামী নির্বাচনেও জনগণের সমর্থন চেয়েছেন তিনি।  

শেখ হাসিনা বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ভোট হবে। সেই নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেছেন তিনি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিএনপির দাবির বিষয়ে কিছু না বললেও তাদের প্রতি ইঙ্গিত করেই আবারও নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে জনগণকে তা প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত আমরা দেখতে পেলাম না। তার বক্তব্যে সংকট নিরসনের কোনো লক্ষণ খুঁজে পাইনি। যার ফলে আমি বলছি যে, এ বিষয়টা একটা বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“আমরা মনে করি, তার বক্তব্য কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারেনি, বরং দেশকে আরেক দফা সংকট দিকে নিয়ে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে।” সরকারের শেষ বছর সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে কোনো ঘোষণা আসবে বলে প্রত্যাশা ছিল বলে জানান বিএনপি মহাসচিব।

তিনি বলেন, “কীভাবে সামনের নির্বাচনকে অর্থবহ করা যায় এবং বিরাজমান যে সংকট সেই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানো যায় তার ব্যবস্থা তিনি করবেন বলে জাতি আশা করেছিল।কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার বক্তব্য কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারেনি, এতে জাতি হতাশ হয়েছে।

“আমরা বিশ্বাস করি যে, এদেশের মানুষ কখনও অন্যায়কে সহ্য করবে না। তারা সত্যিকার অর্থে একটা অর্থবহ সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়।” ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সত্যের প্রতিফলন ঘটেনি দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, “জাতি জানে যে ওই নির্বাচনে যে ভোট হয়েছিল তাতে ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল।

“এটাতেই প্রমাণিত হয়ে তারা আন্তরিক নন।এদেশে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে জনগণ অপেক্ষা করছে যে, আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সকল দলের অংশগ্রহণে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচন এখানে সম্ভব হচ্ছে না। সেটা জনগণকে আশাহত করেছে।”

এই সরকারের আমলে উন্নয়নের বিবরণ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন তার সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে তিনি বলেন, “তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বক্তব্যে উন্নয়নের একটা ফিরিস্তি দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে বলেছেন যে, উন্নয়নের মহাসড়কে অগ্রযাত্রা।

“আমরা সেটাকে মনে করি যে, দুর্নীতির মহাসড়কে তাদের অগ্রযাত্রা। উন্নয়নের যে কথা তারা বলছেন, সেখানে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে।” ‘কোনো রকম নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না’ বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে হুমকি হিসেবে দেখছেন বিএনপি মহাসচিব।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, নৈরাজ্য বিরোধী দল সৃষ্টি করে না। নৈরাজ্য তারাই সৃষ্টি করে সেই অবস্থা করে যাতে নির্বাচন ব্যাহত হয়। আজকে যখন গোটা জাতি অপেক্ষা করছে যে, সকলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক- তখন তার এই বক্তব্য একে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”

বিএনপির নির্দলীয় সরকারের দাবি পাশ কাটাতে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে আসছেন আওয়ামী লীগ নেতারা, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও সেই কথাই এসেছে। এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সংবিধান মাফিক যে নির্বাচনের কথা বলছেন, সেই সংবিধান কাদের সংবিধান? কারা এই সংবিধান তৈরি করেছে? কাদের নিয়ে এই সংবিধান তৈরি হয়েছে? এখানে জনগণের কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।

“যে ব্যবস্থাটা জনগণ মেনে নিয়েছিল আগে একটি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিধান, সেই বিধানটা একতরফাভাবে বাতিল করে তারা একটা সঙ্কট তৈরি করেছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে আমরা মনে করি।”

২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বসহ অনেক রাজনীতিক গ্রেপ্তার হন। পরের বছর নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে।  

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বছরখানেক বিএনপির আন্দোলনে সহিংসতায় অনেকে প্রাণ হারান। শেখ হাসিনার অধীনে হওয়ায় ওই নির্বাচন বর্জন করে তা প্রতিহতের ডাক দেয় বিএনপি, সে সময়ও সহিংসতায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এখন একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন। ওই নির্বাচন নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন হবে আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।”

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি সাহাদাত হোসেন, নির্বাহী কমিটির সদস্য অপর্না রায় দাশ, চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।