আমি করতোয়া নদী বলছি

আমি করতোয়া নদী বলছি

মোঃ জিয়াউর রহমান : জন্ম সালটি মনে নাই,তবে আমার জন্ম কয়েক হাজার বছর আগে। আমার জন্মের অনেক ইতিহাস আছে। সেগুলি বিষয়ে আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন। তবে আমি নতুন প্রজন্মের নিকটে আবারও আমার পরিচয় তুলে ধরছি। আমি  ভূটান সীমান্তের উত্তরে হিমালয় পর্বতের পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার মধ্য দিয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিতগড় নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দিনাজপুর জেলা হয়ে ঘোড়াঘাটের নিকট গাইবান্ধা জেলায় প্রবেশ করে গোবিন্দগঞ্জ থানা পশ্চিম দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জের ভিতর দিয়ে পাবনা হয়ে গোয়ালন্দের নিকট পদ্মার সাথে মিশে আরও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছি। আমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ কিঃ মিঃ।
বর্ণনায়, তবাকাত-ই-নাসারী গ্রন্থে আমার বিশালত্বের বর্ণিত হয়েছে যে, বাংলার প্রথম তুর্কি মুসলিম বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজী (৫৯৮-৬০২  হিজরি/১২০২-১২০৬ খৃঃ) রাজধানী লক্ষণাবর্তী হতে যখন পার্বত্য তিব্বত অভিযানে বের হন, তখন পথিমধ্যে তারা ‘মর্ধান কোট’ (বর্ধন কোট) নগরের নিকট উপস্থিত হন। এ নগরের সম্মুখ দিয়ে একটি নদী প্রবাহিত। অসাধারণ বিশালতার দরুণ আমাকে ‘বেগমতী’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। বিরাটত্ব, আয়তন  ও গভীরতায় আমি ‘এধহম’ (গাঙ্গ) নদীর চেয়ে তিন গুণ বড়। ইতিহাসবিদ প্রভাস চন্দ্র সেন বর্ধন নগরকে ‘পুন্ড্রবর্ধন’ নগর মহাস্থান এবং ‘বেগমতীকে’ করতোয়া নদী হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আপনারা আরও জানেন নিহার রঞ্জন রায় তার “বাঙ্গালীর আদি পর্ব” গ্রন্থে বলেছেন উত্তর বঙ্গের সবচেয়ে প্রধান ও প্রাচীন নদী করতোয়া। আপনারা হয়তো বাংলা সাহিত্যেও নদীর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। নদীকে ঘিরে অনেক গান, কবিতা উপন্যাস রচিত হয়েছে। যেমন: পদ্মা নদীর মাঝি। আবার মাঝি নাও ছাড়িয়া দে মাঝি পাল উড়াইয়া দে। দেখা যেত মাঝি গলা ছেড়ে গান গাইছে। আপনারা এখন এই দৃশ্য আর তেমন দেখতে পান না। নদীগুলোতে আর খুব একটা নৌকা দেখা যায় না। ছোট বেলায় আপনারা সবাই পড়েছেন“ আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে”।

বাংলাদেশের অসংখ্য নদীর মধ্যে অন্যতম নদী করতোয়া। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই পুন্ড্রুনগর গড়ে ওঠে করতোয়ার কোল ঘেষেই। আপনারা জানেন কি? দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সওদাবাহী শত শত নৌকা ভীড়তো পুন্ড্রুনগরের তীরে। সুদূর খুলনা থেকে নারকেল, ইলিশ আসতো। এখান থেকে যেতো কাঁচা তরকারিসহ অনেক কৃষিপণ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার-প্রসার ঘটে এই নদীকে কেন্দ্র করেই। সড়ক পথের চেয়ে অন্তত তিন ভাগ টাকা বেঁচে যেতো নদীপথে পণ্য বহনের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়িক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরির ফলে আস্তে আস্তে পুন্ড্রুনগরের পরিধি বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে নগর সভ্যতা। এক সময় ব্যবসায়িক অবকাঠামো মজবুত হয়ে ওঠে। আমার অববাহিকায় গড়ে ওঠে দৃষ্টি নন্দন দালান। পাকা রাস্তা। সঙ্গে সবুজ প্রকৃতি। ১৭৮৭ সালে আগষ্ট মাসে তিস্তায় এক ভয়াবহ বন্যা হয়। এ বন্যার ফলে করতোয়ার আকৃতিতে পরিবর্তন ঘটে যায়। নদী পথ বালির স্তর দ্বারা আবৃত হয়। এই বালুরাশি প্রতি বছর করতোয়া নদীর দ্বারা বাহিত হয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার নিকটবর্তী করতোয়াকে একেবারে অবরুদ্ধ করেছে। ফলে করতোয়া নদীর সঙ্গে তিস্তা নদীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ১৮২০ সালে আবারো ভয়াবহ বন্যায় গবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাছে করতোয়া নদী ভেঙ্গে বাঙ্গালী নদীর সাথে সংযুক্ত হয়েছে।

১৯৮৮ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সদরের খুলশি চাঁদপুর এলাকার কাঁটাখালীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের মাধ্যমে করতোয়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। কাঁটাখালী থেকে করতোয়া পরিবর্তন হয়ে পূর্বদিকে গিয়ে বাঙালি নদীতে মিলিত হয়েছে। আর কাঁটাখালী থেকে বগুড়ার দিকে প্রবাহমান করতোয়া তখন থেকেই মরে যেতে শুরু করেছে। করতোয়ার মুখ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ও ভরাট হয়েছে। ৮০’র দশক পর্যন্ত পানি প্রবাহ ছিল প্রবল ও দর্শনীয়। এখন হয়তো সেই প্রবল পানি প্রবাহ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়তো ভরাট হয়ে গেছে হয়তো আমাকে দখল করা হয়েছে। ধীরে ধীরে দখল-দূষণ, নানা প্রাকৃতিক কারণে এবং বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও নদী সংস্কারের অভাবে আমার পূর্বের সকল বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছি।

একসময় আমার খুব নাম ডাক থাকলেও,এখন আর তেমন কেউ আমাকে নদী বলে স্বীকার করতে চায় না। আসলেই সত্যি আমার বুকে পানি ধারণ করার ক্ষমতা নাই। আমি মৃত প্রায়। আমাকে দেখতে প্রায় নর্দমা-নালার মত। তাই আমাকে খাল বলেও ডাকতে দ্বিধাবোধ করে অনেকেই। আমি নদী, আমারও যে প্রাণ আছে। আমি বাঁচলে আপনাদের অনেক উপকার হবে। তাই আমি করতোয়া নদী বলছি আমাকে বাঁচানোর জন্য আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন। করতোয়া নদীর বদ্ধ পানি আজ সম্পূর্ণ দূষিত। এই সব দূষিত বদ্ধ পানি আজ মশা-মাছির অবাধ প্রজনন ক্ষেত্র। করতোয়া নদীর দুই তীর ভরাট করে কৃষি ক্ষেত্র তৈরি করা ও বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত। বর্তমানে করতোয়া নদী পরিণত হয়েছে বিভিন্ন বর্জ্যরে বিস্তীর্ণ ভাগাড়ে। করতোয়ারও যে প্রাণ আছে। এমনকি যৌবন দীপ্ত করতোয়ার নাব্যতা হ্রাস পেতে পেতে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। মৃত করতোয়াকে বাঁচাতে হবে। আমি এই একই দাবি নিয়ে নিবেদন করছি আপনাদের সকলের কাছে। নদীটির বর্তমান অবস্থার কারণে করতোয়া নদী পাড়ের নারী ও শিশুরা দিবসের বেশির ভাগ সময় গৃহে থাকার কারণে দূষিত পরিবেশের সংস্পর্শে থেকে অথবা পানির সংস্পর্শে বেশি থাকে বিভিন্ন প্রকারের পানি বাহিত রোগ যেমন-টাইফয়েড, ডায়রিয়া আমাশয়, জন্ডিস, চর্ম রোগ প্রভৃতি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে।

কলকারখানার বিষাক্ত ধাতব পদার্থসহ সব ধরনের বর্জ্য এটিতে সংযোজিত হবার ফলে নদী তীরবর্তী জলজ ও স্থলজ প্রাণিকূল ও উদ্ভিদ এমনকি মানুষ ও তীরে উৎপাদিত ফসলও দূষণের শিকার হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতা না থাকায় দুই কুল প্লাবিত হয়ে বন্যা বা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, সম্পদ বিনষ্ট হয়- মানুষ, পশুপাখি গৃহহারা হয়, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, যার কারণে মানবিক বিপর্যয় ঘটে।
আমরা জানি বাংলাদেশ ও ভারতের যে অভিন্ন নদীগুলো আছে সেগুলোতে ভারতের বাঁধ দেওয়ার ফলে সেই নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে তাই নদীতে পানির অভাবে চোখে পড়ে ধু ধু বালিচর। পানির অভাবে কৃষকের সেচ কাজের জন্য পানি পাওয়া যায় না। ফাঁরাক্কা বাঁধের কারণে আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। টিপাই মুখ বাঁধ নিয়েও সরকারের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ বরাক নদীর উৎস স্থলে নির্মিত টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে উৎপন্ন বিদ্যুতের তিন ভাগের এক ভাগ দাবি করবার চেষ্টা করছে। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।

কিন্তু এ বাঁধের ফলে বাংলাদেশের কি ক্ষতি হবে তা আগে দেখা উচিত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে নদীতে যে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে তার ফলে নদীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তির কথা থাকলেও সেটিও ঝুলে আছে। ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার বিনিময়ে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। ভারতের সাথে অভিন্ন নদীগুলোর  মুখে একের পর এক বাঁধ দেওয়ার ফলে আমাদের নদী গুলো হয়ে পড়েছে মরুভূমি। আমি মনে করি আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সচ্ছতার ভিত্তিতে অভিন্ন নদীগুলোর পানি বন্টন চুক্তি করা বিশেষ প্রয়োজন। প্রাচীন ও ঐতিহ্যের এই করতোয়া নদী পুনরুদ্ধার করার জন্য সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতিব জরুরি। নদীগুলোকে পুন: খনন করতে হবে। ফলে নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে। নদীগুলো মৎস্য সম্পদের একটি বিশাল আধার হতে পারে। যা আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারে। শুধু দরকার নদীগুলোর পর্যাপ্ত খনন, অবৈধ দখল মুক্ত করা,দূষণ মুক্ত রাখা। নদীকে কেন্দ্র করে আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। ঐতিহ্যের প্রয়োজনে আমাদের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদী আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদকে রক্ষা করার জন্য সরকার ও জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক ঃ সংগঠক-পরিবেশ কর্মি
[email protected]
০১৭২৮-৪২৬০৮৬