আমরা যদি পাল্টাই-পাল্টে যাবে দেশ

আমরা যদি পাল্টাই-পাল্টে যাবে দেশ

ওসমান গনি:রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের মানুষ বা বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মিরা সরকারের পাশাপাশি নিরলসভাবে কাজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কোনভাবেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তার কারণ হলো আমরা যতক্ষণ না নিজেরা নিজেদের স্বভাব, আচার আচরণ ও জ্ঞান বুদ্ধির পরিবর্তন করতে পারব না ততক্ষণ সমস্যার সমাধান হবে না। সরকার কি? সরকার দ্বারা কি সমস্যার সমাধান হবে?  বিশ্বের যেকোন দেশের প্রতিটি  মানুষ হলো ঐ দেশের সরকারের বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম মৌলিক একক। দেশের অন্যায় বা অনিয়মের সূত্রপাত হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশের মৌলিক একক গুলো থেকে। সরকারের ক্ষুদ্রতম মৌলিক এককগুলোর পরিবর্তন হতে হবে। পাল্টাতে হবে মন-মানসিকতা। রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম ও মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। তাহলে পুরোদেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। স্বভাব মানুষের মূল মৌলিকতা এবং এটা মনুষ্যত্বের পরিচয়ের বাহক। স্বভাব বদলে গেলেই মানুষও বদলে যায়। মানুষ দ্বারা যেহেতু সমাজ গঠিত হয় আর সমাজ দ্বারা যেহেতু রাষ্ট্র, তাই মানুষ পাল্টালেই পাল্টাবে সমাজ, আর সমাজ পাল্টালে পাল্টাবে রাষ্ট্র। স্বভাব বলতে আমরা বুঝি জন্মগত বা অভ্যাস দ্বারা লব্ধ গুণ বা বৈশিষ্ট্য। তাই অভ্যাস ভালো হলে ভালো হয় স্বভাব আবার অভ্যাস খারাপ হলে স্বভাবও খারাপ হয়ে যায়। স্বভাবকে সৌন্দর্যমি ত করতে চাইলে ভালো অভ্যাসকে বুকে জড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
নিজেকে পাল্টানো বলতে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা; তবে তা বলা যতটা সহজ তার চেয়ে বেশি কঠিন তাকে বাস্তবায়ন করা। একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য দুটি কথা আঁকড়ে ধরলে জীবনকে আদর্শের পাদপ্রদীপে আনা সম্ভব। তাহলো জীবনের বদ অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করার পাশাপাশি ভালো অভ্যাসগুলো গ্রহণ করা। অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করা, তথা সকল অবস্থায় নিজেকে অন্যের অবস্থান থেকে চিন্তা করা। মানুষের কাজ অভ্যাস হিসাবে পরিণত হয় কয়েকটি উপায়ে। যেমন মানুষের জন্মগত কিছু অভ্যাস বংশের জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে হয়ে থাকে। আর কিছু অভ্যাস পারিবারিক বা পারিপার্শ্বিক মানুষের অভ্যাসকে দেখে নিজের মাঝে গড়ে উঠে এবং কিছু অভ্যাস মানুষ নিজে তৈরি করে। অভ্যাসের মধ্যে ভালো মন্দ দুটির অবস্থান রয়েছে, তাই ভালো অভ্যাস গ্রহণ এবং মন্দ অভ্যাস পরিত্যাগ করলেই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের সব কাজ নিজেদের কাছে নৈতিক ও যুক্তিসংগত মনে হয়।

তাই আমরা মনে করি, আমার কাজটাই সঠিক এবং আমার চিন্তাধারাই সঠিক আর বাকি সবার কাজ ও চিন্তাধারা ভুল এবং যুক্তিসংগত নয়। আমাদের স্বভাব হলো আমরা পৃথিবীর সব মানুষকে নিজের মতো হতে বাধ্য করি অথচ নিজের স্বভাবের দিকে একবার ঘুরে তাকাই না যে, আমার স্বভাবটা অন্যজনের অনুসরণযোগ্য কি না? অথবা নিজের সবকিছুই ঠিক এবং অপরের সবকিছু ভুল এটাও বা কতটুকু যুক্তিসম্মত। নিজেকে অন্যের মাঝে খোঁজ এটাই মানুষের মারাত্মক ভুল চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারাকে মানুষ লালিত করার কারণে সমাজে আজ আদর্শ মানুষ বিরল হয়েছে। তাই নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব অভ্যাস খারাপ বলে বিবেচিত, সেসব অভ্যাসকে নিজের মধ্য থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব অভ্যাস ভালো তাকে নিজের মধ্যে জড়িয়ে নিলেই মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব গড়ে তোলা সম্ভব।

নিজেকে অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করা এই চিন্তাধারা যদি আমাদের নিজের অন্তরে ধারণ করতে পারি এবং এটাকে যদি  জীবন পরিবর্তনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে আমাদের জীবনকে একজন আদর্শ মানুষে রূপান্তর করতে আর কোনো বাধা থাকবে না এবং আমাদের আত্মজীবনের ও পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের সুখ ফিরে আসবে। সবচেয়ে বেশি যে উপকার হবে তা হলো ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সমাজিক জীবনে দ্বন্দ্ব বলতে কোনো শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে না, সমাজে সব শ্রেণির মানুষের মানবাধিকার রক্ষা হবে, সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হবে আর পরিবর্তন হলে একটি দেশ পাল্টাবে। অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করতে পারলেই অনৈতিক কাজগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এক কথায় বলতে গেলে ‘নিজেকে অন্যের স্থান থেকে চিন্তা করা’ এই চিন্তা-চেতনাকে যদি মানুষ সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করে, তাহলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, আর সমাজ শান্তি দ্বারা সুগঠিত হলে একটি দেশেও ক্রমান্বয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।এই বিষয়গুলো নিজেদের মধ্যে চর্চা করলেই আমরা আদর্শ মানুষ হতে পারব। তাই আসুন আমরা সবাই দেশের মানইজ্জত রক্ষার্থে স্ব স্ব স্থান থেকে পরিবর্তন হয়ে যাই। পরিবর্তন করে ফেলি আমাদের মন-মানসিকতা।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯