আবার এলো যে বৈশাখ

আবার এলো যে বৈশাখ

সফিউল্লাহ আনসারী  : আবার এলো যে বৈশাখ...। এলো বাঙলা নববর্ষ। নতুন দিনের নব উল্লাসে বাঙালির জীবনে বৈশাখ ফিরে এসেছে বিভেদহীন সমাজ আর নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে। হাজার বছরের আবহমান বাংলার উৎসব বৈশাখ মানেই নতুনের আহবান। নব জাগরণের বার্তায় বৈশাখ বাঙালি জাতির উৎসব হিসেবে মহিমান্বিত করেছে তার আপন ঐতিহ্যে, বাংলাদেশের স্বকীয় সার্বজনীন উৎসব হিসেবে। প্রাণের উৎসব ‘বৈশাখ’ বাংলা এবং বাঙালিুর ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করছে । বিগত বছরগুলোর প্রতি তাকালে দেখা যায় ধর্ম-বর্ণ ও জাতির ভিন্নতা ছাড়িয়ে ইদানিংকালে বৈশাখ রূপ নিয়েছে বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে। ১লা বৈশাখ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন।
পয়লা বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ । যে উৎসবকে অস্বীকার করা যায় না। বৈশাখকে ঘিরে বাঙালির চেতনা জুড়ে রয়েছে ভিন্ন আবেগ, যাতে কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। উৎসাহ ও দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারন করার আবেগ-অনুভূতি এই বৈশাখী আনন্দকে দিয়ে যায় আলাদা মাত্রা। বৈশাখ মানে উচ্ছাস, বৈশাখ মানে উত্তাপ আর উৎসবের আমেজ। চারদিকে সাজ সাজ পরিবেশ বাঙালিয়ানার স্বরূপকে ফুটিয়ে তোলে এই বৈশাখে।  দেশের সকল প্রান্তের মানুষের মনকে আলোড়িত করে এই সার্বজনিন উৎসব। বাঙালির বিশ্বাস বৈশাখের আগমন ঘটে সূচি-শুভ্র-নির্মল-পবিত্রতায়। আর এই পবিত্রতার পরশে যেনো সারা বছর কাটে সেই প্রার্থনা প্রতিটি প্রাণে প্রাণে। কবি গুরুর লেখনী- এসো হে বৈশাখ এসো এসো নববর্ষ কে দিয়েছে আলাদা প্রাণ। এই বৈশাখের ছন্দ-উচ্ছাস এসো হে বৈশাখ’-গানটি যেনো মিশে গেছে বাঙালির চেতনায় আর বৈশাখী উৎসবের আবহে বাঙালি পেয়েছে নির্মল আনন্দ-উচ্ছাস।
বছর ঘুরে প্রতিটা বাঙালির আঙ্গিনায় আগমন ঘটে বৈশাখের । বাংলা নববর্ষ বা ১ লা বৈশাখ পালন দেশীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে শহর, গ্রাম-গঞ্জে নানা উৎসব-পার্বণের আয়োজনে থাকে পরিবেশ উৎসবে মুখরিত। বৈশাখের এ সর্বজনীন উৎসব দেশের সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নানাভাবে ঐতিহ্যের ভাবনায় সমৃদ্ধ করে। উৎসব আর আনন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা বাঙালি জাতি প্রতিটা উৎসবকেই উদযাপন করে একান্ত সামাজিকতা ও আন্তরিকতায়। বৈশাখের বেলায় এর ব্যাতিক্রমতো নয়ই বরং বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বাংলা নতুন বছর মানেই বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, নুতনের আহবানে জেগে উঠা। অন্যান্য জাতির বর্ষবরণের মতোই বৈশাখ বরনের স্টাইলে সময়ের সাথেই যোগ হচ্ছে নিত্য নতুন ভাবনা। পোষাক থেকে শুরু করে প্রত্যেক নিত্য ব্যবহার্য পণ্যেও বৈশাখের ছাপ উৎসবের আমেজকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধুই আনন্দ উৎসব পালনেই সীমাবদ্ধতা না রেখে সারাদেশে বৈশাখী মেলায় বাংলার সংস্কৃতি ও লোকশিল্পকে ছড়িয়ে দিতে অবদান রেখে চলেছে এই সার্বজনীন উৎসবটি। বৈশাখ তার আপন ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দেয় স্ব-মহিমায় প্রতিটা বাঙালীর অন্তরে। বৈশাখের আকিঁবুকিতে বাঙালী  ঐতিহ্য ফুটে উঠে শিল্পীর নিপূন আঁচড়ে।
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ, এতে কোনই সন্দেহ নেই। রঙিণ স্বপ্নের ঘুরি উড়িয়ে বৈশাখ যেনো বলে যায় বাঙালি জাগো, ভুলে পুরাতন-জীর্ণতা, নতুন দিনের আহবানে সাড়া দিয়ে হয়ে উঠো নিরেট বাঙালি। ‘‘বাংলা নবর্বষ আসে ১২টি মাসের তেরো পার্বন নিয়ে। বছরের পয়লা মাস বৈশাখকে ঘিরে যতোটা উত্তাপ অন্য মাসগুলোতে তেমনটা না হলেও ষড়ঋতুর বৈচিত্রে ভরপুর বাংলায় বারোটি মাসে উৎসবের কমতি থাকেনা ।’’
বছর শেষে ব্যাবসায়ীদের হিসেবের সমাপ্তি টেনে নতুন বছরে উদ্যমে আবার শুরুর প্রাক্কালে শুভ হালখাতা আর বৈশাখী মেলা চিরায়ত বাঙালি উৎসবের মুল বিষয় থাকলেও বর্তমান সময়ে তা সকলের মাঝে আলাদা আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়েছে। “মুছে যাক গ্লানি ঘুছে যাক জরা অগ্নি¯œানে সূচী হোক ধরা, রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করে দাও আসি আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক। এসো হে বৈশাখ এসো এসো “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো..... কবি গুরুর সৃষ্টি আমাদের বৈশাখী উৎসবকে করেছে সূর-মূর্ছনায় আবেগ তাড়িত। এই অসাধারন গানটি না  হলে বৈশাখ পালনে অপুর্ণতাই থেকে যায়। দেশ জুড়ে পুরো বৈশাখে মেলা আর আনন্দ মানেই এসো হে বৈশাখ গানটি। বৈশাখকে ঘিরে প্রতি বছর নতুন নতুন গান গেয়ে ¯্রােতার মন কেড়ে নিচ্ছেন আমাদের দেশের অনেক নবীন-প্রবীণ শিল্পীরা।
বৈশাখ আসে নতুনের আগমনে, পুরাতনকে বিদায় করে বাংলা এবং জীবন ও সময়কে রঙিন-মঙ্গলময় করে দিতে। যতো পাপ-তাপ-গ্লানি মুছে দিয়ে বৈশাখ হয়ে উঠে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, যেখানে বাঙালি সমাজ সারা বছরের জীর্নতা শেষে নতুন দিনের প্রত্যাশায় বরণ করে নেয় বছরের প্রথম দিন, পয়লা বৈশাখ আর নববর্ষকে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রেরণা। শত ব্যাস্ততায়ও মহাকালের চিরায়ত নিয়মে বৈশাখ বরণে, নববর্ষের উদ্দীপনায় মেতে উঠে বাংলার সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। বৈশাখ যে বাঙালির সার্বজনিন উৎসব তার প্রমাণ এই পয়লা বৈশাখ এবং বৈশাখ বরণের সকলের অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা। পয়লা বৈশাখই হতে পারে বাঙালির জাতীয় উৎসবের দিন,
যার উৎসব হিসেবে কোন আলাদা ভিন্নতা নেই, নেই ধর্মীয় নিয়মের বাধ্যবাধকতা।  সকলের জন্য এই উৎসব একই অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে উঠে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহনে।বিশ্বের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর বর্ষবরণসহ বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে তারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, আত্মপরিচয়কে খুঁজে পায় নিজেদের সংস্কৃতিতে, বর্ষবরনে বিশ্বের অন্য দেশ ও জাতির সামনে তাদের পরিচয় তুলে ধরে, নব জীবনের মধ্যে প্রবেশ করার আনন্দকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। আর আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের সংস্কৃতিকে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরতেও পিছপা হই না, কারণ বাঙালি সংস্কৃতি অন্য জাতির চেয়ে আরো বৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহ্যে ভরপুর।
এ দেশের বাঙালিরা তাদের স্বাতন্ত্রের পরিচয় দিয়ে আসছে সেই আবহমান কাল থেকে বিচিত্র আচার-অনুষ্ঠান আর বৈশাখের আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে। উৎসব প্রিয় বাঙালি জাতি এই বৈশাখই তার প্রমাণ। পহেলা বৈশাখের এই শুভক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিটা ভোর, প্রতিটা প্রহর, প্রতিটা ক্ষণ আজকের এই দিনটির মতো শুভ হোক। সারা বছর যেনো বিভেদহীন সহাবস্থান থাকে সকল কর্মে- আনুষ্ঠানিকতায় আমরা একে অপরের কল্যাণে নিয়োজিত থাকি। আনন্দ আর উদ্দীপনায় জাগরণ হোক দেশ আর মানুষের কল্যাণে। বৈশাখের হাত ধরে নিরন্তর সময়ের ¯্রােত হোক শুধুই কল্যাণ আর মঙ্গল কামনায়। সত্য আর সুন্দরের জয়গানে আমাদের আগামী দিনগুলো পুর্ণতা পাক সুখ-সমৃদ্ধিতে। বৈশাখের এই ক্ষণে বাঙলা নববর্ষে আমরা নিজস্ব ঐতিহ্যকে মেলে ধরি বিশ্ব দরবারে। শুভ বাঙলা নববর্ষ !
লেখক ঃ গণমাধ্যমকর্মি               
[email protected]