আবর্জনা বিপর্যয় নয়, সম্পদ

আবর্জনা বিপর্যয় নয়, সম্পদ

সৈয়দ আহম্মদ কিরণ : ডাস্টবিন একটি কনটেইনার, যা আবর্জনা না ভরা পর্যন্ত আবর্জনা ধারণ করে। এই ডাস্টবিন বর্জ্য অপসারণ করে সামাজিক সমস্যা সমাধান করে। বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বিভিন্ন রং এর ডাস্টবিনে ফেলা হয়। ডাস্টবিনকে আবর্জনা ক্যান এবং ট্র্যাশক্যানও বলা হয়। পুনর্ব্যবহারের উপযুক্ততার উপর নির্ভর করে ডাস্টবিন বিভিন্ন রং দ্বারা প্রদর্শিত হয়। এটাকে আবার আবর্জনার ঝুড়ি এবং বিন নামেও ব্যবহার হয়। কেউ আবার ডাস্টবিনকে ট্র্যাশক্যান বলে থাকে। ১৮৭৫ সালে ইংলান্ডে প্রথম বর্জ্য অপসারণের জন্য অফিসিয়ালি ডাস্টবিনের ব্যবহার শুরু করে।উন্নত বিশ্ব বর্তমানে বিভিন্ন রঙের ডাস্টবিন/ ট্র্যাশক্যান ব্যবহার করছে, যা মূলত ছয় ধরনের নীল, সবুজ, হলুদ, লাল, কমলা এবং ধূসর। এই রঙগুলি সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে তা মনে করবার কোন কারণ নেই। কারণ প্রতিটি রঙের একটি আলাদা আলাদা মানে আছে।
নীল ঃ নীল রং কাগজের বর্জ্য ফেলার নির্দেশনা দেয়। সবুজ ঃ সবুজ রং কাঁচের বোতল, কাঁচের গ্লাস এবং বিভিন্ন ধরনের কাঁচ ফেলার নির্দেশনা দেয়। হলুদ ঃ হলুদ রং মেটালিক পদার্থ বিশেষতঃ হাসপাতালের বর্জ্য যেমন কাঁচি, গ্লাভস, সুঁচ ইত্যাদি ফেলার নির্দেশনা দেয়। লাল ঃ লাল রং নষ্ট ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য ফেলার নির্দেশনা দেয়। যেমন ভাঙ্গা টিভি, নষ্ট ল্যাপটপ, ফ্লোরসেন্ট টিউব লাইট, বাল্ব ইত্যাদি হতে পারে। কমলা ঃ কমলা রং প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য ফেলার নির্দেশনা দেয়। ধূসর ঃ ধূসর রঙের ডাস্টবিনে অর্গানিক আবর্জনা ফেলার নির্দেশনা দেয়। যেমন বিভিন্ন ধরনের সবজি, মাছ, মাংস, উচ্ছিষ্ট খাবার ইত্যাদি।

গৃহস্থালীর বর্জ্য মাটিতে পড়ার সাথে সাথে বিশেষত স্যাঁতসেতে আবহাওয়াতে পড়ে থাকে তখন এটি পঁচে যায় এবং প্রচুর জীবাণু ছড়াতে থাকে ফলে জীবাণু বেড়ে যায়। মানুষ, কুকুর, মাছি, তেলাপোকা, ইঁদুর ময়লাগুলো স্পর্শ করলে রোগ জীবাণু সংক্রমণকারী জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং সেটা মানুষের শরীর ও খাবারের ভিতরে প্রবেশ করে। মানুষের মল ও প্রস্রাব, উদ্ভিদ ও প্রাণীর খাদ্য মাটিতে পুঁতে ফেলে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করে সেটা উদ্ভিদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যেটাকে আমরা জৈব সার বলি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সু-পরিকল্পিত মানুষ ও সমাজের জন্য ভাল হতে পারে। স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরী হয়, পরিষ্কার সুন্দর মনোরোম জায়গা তৈরী হয়, খেলতে ও ব্যায়ামের জন্য প্রচুর জায়গা তৈরী হয়। স্বাস্থ্যকর মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি হয়। কারণ বাংলাদেশে জন্মের পর থেকেই চিকিৎসার জন্য টাকা জমানো শুরু করে।  একটি স্বাস্থ্যকর এবং পরিষ্কার পরিবেশ মানে দীর্ঘজীবন। দূষিত বর্জ্য থেকে যে রোগগুলি ছড়ায় সেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। মাইক্রোসকোপ দিয়ে দেখতে হয়। জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে সর্দি, ডায়রিয়া, লিভার রোগ, ত্বকে সংক্রমণ এবং রক্ত স্বল্পতা ইত্যাদি রোগ দেখা দেয়। কিছু রোগ আছে যেটা মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে আবার কিছু রোগ আছে যেটা খুবই বিরক্তিকর। শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবর্জনা থেকে। আবর্জনাতে দুটি প্রধান ধরনের জীবাণু রয়েছে যা মানুষ ও প্রাণীতে রোগ সৃষ্টি করে। এগুলো হলো ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস। ব্যাকটেরিয়া সাধারণত ভাইরাসের চেয়ে বড় হয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মা, কলেরা, ডিপথেরিয়া, ব্যাকটেরিয়া মেনিনজাইটিস, টিটেনাস, লাইম ডিজিজ, গনোরিয়া, সিফিলিস ইত্যাদি এবং ভাইরাসজনিত রোগের মধ্যে রয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, গলদ, রুবেলা, হেপাটাইটিস এ, হলুদ জ্বর, ডেঙ্গু জ্বর,জলাতঙ্ক ইত্যাদি।

বগুড়াসহ সারাদেশে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প বাংলাদেশকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের প্রায় সকল পণ্যই ইন্ডাস্ট্রিয়াল আবর্জনা থেকে তৈরী হয়। যেমন লোহা, তামা, পিতল, অন্যান্য ধাতব পণ্য যেমন গাড়ির দেহ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সাইকেল, তামার তার, যন্ত্রপাতি, আকরিক, ইস্পাত, এ্যালুমিনিয়াম ধাতু, ক্যান, পুরোনো জানালার ফ্রেম, এ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ও পেপার, পুরোনো কার্টুন, রঙ্গিন কাঁচ, কাঁচের পণ্য, ভাঙ্গা চশমা, কাঁচের বোতল ইত্যাদি। এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি আমার এক বিদেশি বন্ধু বাংলাদেশে এসেছিল। বগুড়াতে অবস্থানকালে আমাকে জিজ্ঞাসা করল তোদের শহর এত নোংরা কেন? যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা পড়ে আছে ব্যবস্থাপনা নেই কেন? আমার কাছে উত্তর নেই। বললাম লজ্জা দিও না। এব্যাপারে আমাদের একটু লজ্জা কম। যেহেতু ১৪৫ বছর এ বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি।

গৃহস্থালীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনীহা কেন? বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে গাড়ীতে করে রাস্তার পাশে ডোবা, খাল-বিল, নদীতে ফেলা হয়। এটা অব্যবস্থাপনা। আসুন আমরা সবাই মিলে দেশটাকে রক্ষা করি। আমরা যদি নিজেদের ভাল চাই, সমাজের ভাল চাই, দেশের ভাল চাই এবং সমাজে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ চাই তবে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিব? প্রথমে বাড়ি থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু করি। তারপর আহ্বান জানায় স্কুলগুলোকে যেন তারা শিশুদের আবর্জনা ব্যবস্থাপনা শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। কারণ বাড়ির পরই আমরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। সমাজের মধ্যে ধূলা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশি গাছ লাগাতে হবে, বেশি করে ঘাস লাগাতে হবে যেন বর্জ্য থেকে ধূলা উড়তে না পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক-শিল্প উদ্যোক্তা
০১৭৩০-০৪১৭০০