আপদে-বিপদে জাতীয় ঐক্য চাই

আপদে-বিপদে জাতীয় ঐক্য চাই

আতাউর রহমান মিটন : রোহিঙ্গারা আপদ না বিপদ! প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে। কারণ ওরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না। তাহলে থাকবে কোথায়? বাংলাদেশে? কতদিন, অনির্দিষ্টকাল? টেকনাফ ও উখিয়ার হোষ্ট কমিউনিটি বা সেখানকার জনগণ কি এই ১২ মতান্তরে ১৬ লক্ষ রোহিঙ্গাদের ফিরে সংখ্যালঘু হয়ে বেঁচে থাকবে? স্বাধীন আরাকান রাজ্য গঠনের যে গোপন আন্দোলন বিরাজমান সেই আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখায় কি কোন অশুভ পরিবর্তন দেখা দিবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কি তাহলে হুমকির সম্মুখিন?ফেসবুক এর পাতায় পাতায় এখন অনেক প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সেখানে অনেকের ক্রোধ, ক্ষোভ ও উদ্বেগ ইত্যাদি নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২২ আগষ্ট প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যাবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত একজনও ফেরত না যাওয়ায় এবং পরপরই টেকনাফে একজন যুবলীগ কর্মির নিহত হবার ঘটনার মধ্যে দিয়ে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরণ¥ুখ হয়েছে রোহিঙ্গাদের সাম্প্রতিক সমাবেশ অনুষ্ঠানের পরে। গণমাধ্যমে ঐ জনসভায় উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের যে ছবিটি ছাপা হয়েছে তা দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় জনসভা সম্ভবতঃ আগে কখনও অনুষ্ঠিত হয় নি।

 এর পর থেকেই বাংলাদেশের দরদী মানুষেরাও এখন তাদের ফেসবুক ওয়ালে বিরক্তিকর সব মন্তব্য প্রকাশ করছেন। কারও কারও বক্তব্য বেশ আক্রমণাত্মক বা উত্তেজক! সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আমার কাছে মোটেও ভাল ঠেকছে না! আগষ্ট মাসের ৪-৭ তারিখ পর্যন্ত আমি উখিয়া ও টেকনাফে ছিলাম। সেখানে ৪ দিনে প্রায় ২ শতাধিক নারী ও পুরুষের সাথে মত বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছি। কথা হয়েছে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, টমটম (ইজি বাইক) চালক, হোটেল ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মি এবং সাধারণ মানুষদের সাথেও। তাদের সকলের সাথে কথা বলে আমি পরিস্থিতির উত্তাপ টের পেয়েছি। আমি শংকিত বোধ করেছি এবং আমার পরিচিতজনদের কাছে সেই আশঙ্কা প্রকাশও করেছি। আমি বলেছি, সেখানে বারুদের উপর সবাই বাস করছে। যে কোন মুহূর্তে সেখানে কোন অশুভ শক্তি বা চক্রান্তকারী গোষ্ঠী একটা দেশলাই এর কাঠি জ্বালিয়ে সেখানে একটা বিস্ফোরণ তৈরি করে ফেলতে পারে এবং সুযোগ সন্ধানীরা সেই সুযোগটা যে কাজে লাগাবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি আমাদের সকলেরই উচিত সাবধান হওয়া এবং সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগী হওয়া। নিছক উত্তেজনার বশে কোন মন্তব্য করা বা পদক্ষেপ গ্রহণ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। তখন সেটা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাবে।

মিয়ানমার থেকে চলে আসা প্রায় ১২ লক্ষের বেশি রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমাদের যে বিপদ ক্রমশঃ বাড়ছে সেটা নিয়ে গণমাধ্যমসহ সর্বস্তরেই আলোচনা অব্যাহত আছে। অনেকেই সতর্কভাবে মন্তব্য করছেন। কারণ যে কোন দায়িত্বহীন মন্তব্য থেকে একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়! তাই আমাদেরকে আরও সতর্কতার সাথে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এটা নিয়ে যুদ্ধ করা যাবে না, কূটনীতি জোরদার করতে হবে। রোহিঙ্গাদের আমরা মেহমান এর মর্যাদা দিয়ে এদেশে আশ্রয় দিয়েছিলাম। ওরা যখন আসে তখন সারাদেশে মানুষের মধ্যে একটা অদ্ভুত মানবিক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদা তুলেও রোহিঙ্গাদের জন্য খাবার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর জন্য সারাদেশেই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেটা ছিল এক অভূতপূর্ব মানবিক সাড়া! বাংলাদেশের মানুষ যে মানবতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল সেটা সে সময় খুব স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল। এই শ্রদ্ধা বা মানবিকতা দেখানোটার সাথে কেবল রোহিঙ্গাদের ধর্ম পরিচয়ের ব্যাপার ছিল না এর সাথে মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক অনুভূতিও কাজ করেছে।  
টেকনাফ ও উখিয়ার মানুষেরা ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও মানবিকতার তাড়নায় একদিন যাদের আশ্রয় দিয়েছিল, যাদের জন্য অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছিল আজ তারাও কেন এই রোহিঙ্গাদের উপরে বিক্ষুব্ধ! সেখানে ক্ষোভের আগুন ছাই চাপা হয়ে আছে কেন? কেন সবাই সেখানে একটা বড় ধরণের আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশংকা করছেন? কেন মনে করা হচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে? সকলের উচিত সমস্যা বহুমাত্রিক দিকগুলো ভেবে দেখা। কেবল ধর্ম পরিচয়, জাতি পরিচয় বা রাষ্ট্র পরিচয়ের বিষয়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সঙ্কট সমাধান করতে চাইলে তা সহজ হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই বলে থাকেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে। আমরাও দেখছি আমাদের ভৌগলিক সীমানা বদলে দেয়ারও একটা দাবি কোন রাষ্ট্রে উঠছে। এ ধরনের দাবি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা ও হুমকিস্বরূপ। যারা প্রকাশ্যে এই দাবি তুলছেন তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আমাদের সরকারেরও উচিত এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেয়া। সম্প্রতি ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন তালিকায় (এনআরসি) ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়া এবং ভারতের কোন কোন গণমাধ্যমে এদের মধ্যে ১৪-১৫ লাখ মানুষকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে মর্মে খবর প্রচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এরা বাংলাদেশের নাগরিক নয় এবং বাংলাদেশ কোনভাবেই তাদের গ্রহণ করবে না। অপরদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন একজন ব্যক্তিকেও রাষ্ট্রহীন না করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ভারত কি সে কথা শুনবে? জাতিসংঘ কি ভারতকে বাধ্য করতে পারবে? ভারত সরকার নিজের দেশে আদমশুমারী করবে, অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করবে সেটা খুবই স্বাভাবিক এবং নিয়মিত একটি কাজ।

 কিন্তু এক বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাঙালি বলে তাদেরকে পুশব্যাক করার এই চিন্তাটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের বল প্রয়োগের প্রয়াস হিসেবে অনেকেই মনে করেন। ভারতসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিধান রয়েছে। সেই হিসেবে ভারতের মাটিতে জন্ম নেয়া সকলেই ভারতীয় নাগরিক। তারা যদি ১৯৭১ সালের আগে বা ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে বা পরেও গিয়ে থাকেন তাহলেও তারা কোনভাবেই বাংলাদেশের নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন না। কারণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে অবৈধ বাংলাভাষী বা বাঙালী মুসলমানদের ‘বাঙালি’ বা ‘বাংলাদেশী’ বলে চালানোর এই প্রচেষ্টা রুখে দেয়া প্রয়োজন। এখানে কোন রাজনৈতিক দলীয় পরিচয় বিবেচনা নয়, বরং সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে ভূমিকা নেয়া দরকার। সবদিক থেকে চিন্তা করলে একটা সন্দেহ মনে জেগে ওঠে সেটা হলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা প্রবল বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক ষড়যন্ত্র খুব ভালভাবে কাজ করছে। এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হলে আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত একটি জাতীয় প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এটা ক্ষমতা দখলে প্লাটফরম হবে না, এটা হবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্লাটফরম। মাথা ব্যথা হলে যেমন আমরা মাথা কেটে ফেলি না, তেমনি জাতীয় কোন সংকটের সময় পরস্পর মতভেদ জিইয়ে রেখে আমরা আত্মঘাতি জাতি হিসেবে পরিচিত হতে পারি না।

বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের মদদ দিয়ে শোডাউন করিয়ে কিংবা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভূখন্ড নিজেদের দাবি করে মানববন্ধন করে যতই পানি ঘোলা করার চেষ্টা করুক মনে রাখতে হবে, এটা একটা ফাঁদ। এই ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। অনেক সময় আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদের কারণে বাইরের শক্তিগুলোর এ ধরনের পাতানো ফাঁদে সহজেই পা দিয়ে ফেলি সেখান থেকে আমাদের আত্মরক্ষা করা দরকার। সরকারকে এ ব্যাপারে উদার হতে হবে। দেশের সকল পক্ষকে একত্রিত করতে চাইলে নিজেদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। সালিশ মানি তালগাছ আমার, এটা নীতি দিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে না। একথা ঠিক যে রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধান কঠিন। কারণ, আমরা তাদের জোর করে, গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারব না। আমাদের বৈশ্বিক নীতি মেনে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অগ্রসর হতে হবে। রোহিঙ্গারা পরিষ্কার বলে দিয়েছে নাগরিকত্ব না দেয়া পর্যন্ত তারা ফিরে যাবে না, আর মিয়ানমার সরকার এখনও একবারও নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করে নি। এখন উভয় পক্ষই যদি এ ব্যাপারে অনড় অবস্থানে থাকে তাহলে বাংলাদেশের পক্ষে এই মুশকিল আছান করা প্রায় অসম্ভব! এটা পরিষ্কার যে, এটা একটা রাজনৈতিক খেলা আর রোহিঙ্গারা এই খেলার পুতুল। যারা আমাদের বিপদে ফেলতে চায় তারাই এই ‘রোহিঙ্গা বিষফোঁড়া’ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে এখন তার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হবে। বিদেশী শক্তিগুলোর মধ্যেও মতভেদ আছে, আমাদের উচিত হবে সেই মতভেদকে এই খেলায় ব্যবহার করা। ভারত ও চীনের স্বার্থ এক নয়। আবার আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর লক্ষ্য এক নয়! সুতরাং কাকে সাথে আর কাকে পাশে রাখতে হবে সেটা আমাদের ভাল করে বুঝতে হবে। চাল দিতে ভুল হলে খেসারত আমাদেরই দিতে হবে।

রোহিঙ্গারা যেন ভাসানচরে যেতে পারে এবং সেখানে যেন তাদের মানবিক মর্যাদা বজায় থাকে সেটা আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ভয় আছে। তাদের সবাই একরকম নয়। বহু রোহিঙ্গা নাগরিক রাজনীতি বোঝে না, তারা শুধু নিরাপত্তা চায়, চায় শান্তিতে বাস করতে। আমরা তাদের যেন সেই নিরাপত্তা দিতে পারি। রোহিঙ্গাদের নেতা, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘মাঝি’ বলে সম্বোধন করা হয়, সরকারের উচিত হবে এই মাঝিদের নিয়ে বসা এবং তাদের সম্মত করা। উস্কানীদাতাদের সাথে মাঝিদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে।
নিয়ম মেনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বহু বছর লাগবে। তাই একটা বিকল্প ভাবনা ভাবার কোন বিকল্প নেই। প্রতি সপ্তাহে তিন হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিলেও প্রায় ১২ লক্ষকে ফেরত নিতে কত বছর লাগবে তা হিসেব কষে দেখুন। উখিয়া এবং টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেয়া এবং সেখানে সমন্বিত উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কর্মসূচী নেয়ার কোন বিকল্প নেই। ক্ষোভ দমাতে চাইলে উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। বিদ্বেষ বাড়িয়ে কেউই লাভবান হবে না। আসুন শান্তির জন্য কাজ করি। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি।

লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯