খালেদা জিয়ার মুক্তি নতুন কর্মসূচির প্রত্যাশা তৃণমূলের

 খালেদা জিয়ার মুক্তি নতুন কর্মসূচির প্রত্যাশা তৃণমূলের

রাজকুমার নন্দী : আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। বেগম জিয়া কারামুক্ত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায় দলটি। চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে ইতোমধ্যে চার দফায় বিক্ষোভ সমাবেশে, মানববন্ধন, অবস্থান, গণঅনশন, গণস্বাক্ষর অভিযান, স্মারকলিপি পেশ, কালো পতাকা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে জনগণের মাঝে ছুটে চলেছেন দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ। তারা লিফলেট বিতরণ করছেন, সংগ্রহ করছেন গণস্বাক্ষর। আন্দোলনের পঞ্চম দফার কর্মসূচি অনুযায়ী  মঙ্গলবার দেশব্যাপী পুনরায় মানববন্ধন করেছে বিএনপি। এছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে আবারও অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে। তবে চলমান এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নতুনত্ব দেখতে চাইছেন দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তারা চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি মৌন পদযাত্রা, হাটসভা, পথসভার মতো শান্তিপূর্ণ অন্যান্য কর্মসূচি দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তৃণমূল নেতাদের অনেকে আবার চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে জনগণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে আন্দোলনের গতি বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। বিএনপির চলমান কর্মসূচি নিয়ে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তাদের এমন মতামত উঠে এসেছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। এসব কর্মসূচি পালনকালে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি বাধা ও গ্রেফতারের অভিযোগ করেছে দলটি। ঢাকায় কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়ে তা পন্ড করে দেয়। পুলিশের জলকামান থেকে ছোঁড়া রঙ্গিন পানিতে আক্রান্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেক নারীনেত্রী। সেদিন গ্রেফতার করা হয় দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ প্রায় শতাধিক নেতা-কর্মীকে। দলটির পূর্বের কর্মসূচির মধ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও লিফলেট বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। দুই কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহের টার্গেট নিয়ে কাজ করছে দলটি। কর্মসূচি সমাপ্ত হলে স্ব স্ব জেলার গণস্বাক্ষরের তালিকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে দেয়া হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ঢাকাসহ সারাদেশে দলের বক্তব্য সম্বলিত লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে দেড় লক্ষাধিক লিফলেট ছাপিয়ে তৃণমূলের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে তা বিতরণ করা হয়েছে।

সেইসাথে কেন্দ্রীয়ভাবে ছাপানো লিফলেটের আদলে লিফলেট ছাপিয়ে বিতরণ করতে জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী জেলা নেতৃবৃন্দ লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এর মধ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। দেশনেত্রীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, তারা খুলনা মহানগরে ইতোমধ্যে ২৭ হাজার লিফলেট বিতরণ করেছেন। আগামী শুক্রবার বাদ জুমা মহানগরীতে তারা দেড় লক্ষ লিফলেট বিতরণের টার্গেট নির্ধারণ করেছেন। রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোজাফফর হোসেন জানান, তারা মহানগরীতে ইতোমধ্যে দলের বক্তব্য সম্বলিত দশ হাজার লিফলেট বিতরণ করেছেন। যা অব্যাহত রয়েছে। বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম দৈনিক করতোয়াকে বলেন, পুরো জেলায় দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন মিলিয়ে তারা ১০ থেকে ১২ লক্ষ লিফলেট বিতরণ করেছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সমাবেশ করবে বিএনপি। আগামী ১২ মার্চ ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং ১০ মার্চ খুলনায় জনসভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে দলীয় চেয়ারপারসনের মামলার বিষয়টি জানিয়ে দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় কমিশনের সহায়তা চেয়েছে বিএনপি। সংস্থা তিনটিকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি গত বুধবার সংস্থা তিনটির প্রধানের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির প্রতি আস্থা জানিয়ে চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নতুনত্ব দেখতে চাইছেন দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তারা চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি মৌন পদযাত্রা, হাটসভা, পথসভার মতো শান্তিপূর্ণ অন্য কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষে। জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলার সভাপতি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, আমাদের চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সবার সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী হামলা করছে, নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করছে। আমরা ম্যারাথনভাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে ধাপে ধাপে সামনে এগুতে চাই। দেশের অধিকাংশ জনগণ সেটাই চায়। বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য বিএনপির চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে জনগণকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে আন্দোলনের গতি বাড়ানো দরকার। সেজন্য নেতা-কর্মীদের মাঠে অবস্থান নিতে হবে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির প্রতি আস্থা রেখে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, এই মুহূর্তে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি মনে করি- দলের হাইকমান্ড রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে শান্তিপূর্ণ জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। একটা সময় পর্যন্ত এই ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। তবে চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নতুনত্ব চান তিনি। সাবু বলেন, জেলা সদরে পদযাত্রা, বিনা মাইকে হাটসভা, পথসভাসহ শান্তিপূর্ণ নতুন কর্মসূচি দিলে জনগণের সম্পৃক্ততাও বাড়বে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক খোকন (জহির) বলেন, বিএনপির চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে আমরা জনগণের সমর্থন পেয়েছি।

বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও লিফলেট বিতরণে অরাজনৈতিক মানুষকেও সম্পৃক্ত হতে দেখেছি। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য চলমান আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে, চাঙ্গা করতে হবে। বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতি ম্যা মা চিং বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও বাধা দেয়া হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আমরা দমন-পীড়নে ভীত নই। পিরোজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি গাজী নুরুজ্জামান বাবুল বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আমরা গণতান্ত্রিকভাবেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছি। সাধারণ মানুষ এ ধরনের কর্মসূচিকে স্বাগত জানাচ্ছে। আমরা চাইবো আগামিতে দলের হাইকমান্ড শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নতুনত্ব আনবেন। মৌন পদযাত্রা, হাটসভা, পথসভার মতো শান্তিপূর্ণ নতুন কর্মসূচিতে জনগণের সম্পৃক্ততাও বাড়বে। নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, আমরা কেন্দ্রের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করে আসছি। জনগণও আমাদের কর্মসূচিতে সাড়া দিচ্ছেন। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা বিএনপির নেতা মেহেদী হাসান সুমন বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সাধারণ জনগণ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। কর্মসূচিতে নতুনত্ব এনে পদযাত্রা, পথসভার মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়া হলে জনসম্পৃক্ততাও বাড়বে।