আত্মহত্যার প্রবণতা এবং সচেতনতা

আত্মহত্যার প্রবণতা এবং সচেতনতা

মোঃ মুরশীদ আলম: ইদানিং বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামে আত্মহত্যার হার শহরের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি বলে একটি সংস্থার জরিপে জানা গেছে। আত্মহত্যাকারীদের বড় অংশই অশিক্ষিত এবং দরিদ্র পরিবারের। তাদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছর। আর নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। সহনশীলতার অভাব, অপরিণত বয়সের আবেগ উচ্ছাস, অন্তর্দহন, কোন কিছুকে সহজেই মেনে নিতে না পারার মানসিক শক্তির অভাব, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরকীয়া প্রেম অবশেষে প্রতারণার শিকার, লোক লজ্জার ভয়, অভিমান, এসএসসি বা এইচএসসি পাশ না করা, পথে-ঘাটে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং-এর নিরন্তর অত্যাচার, ন্যায় বিচার না পেয়ে হতাশা, পারিবারিক বা সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা। যেসব কারণে গ্রামে আত্মহত্যার হার বেশি সেগুলো হচ্ছে বাল্যবিবাহ, আর্থিক সচ্ছলতার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার, সচেতনতার অভাব, অসমবয়সের মধ্যে বিবাহ, সামর্থের চেয়ে উচ্চাকাঙ্খা, মোবাইল ফোন এবং এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীদের নিকট হতে গ্রহণকৃত লোন শোধে অপারগতা।
গ্রামে যে সব আত্মহত্যা হয় সে সম্পর্কে বা তাদের বিষয়ে থানায় খুব একটা ডায়রি বা লিখিত অভিযোগ করা হয় না। গ্রামের মন্ডল মাতব্বর বা ইউপি সদস্যগণ এটা যেভাবেই হোক সামাল দেন। আর নিতান্তই যদি ডায়রি করা হয় বা করতে হয় তাহলে সোজা সাপটা কারণ উল্লেখ করা হয় বিষ খেয়ে বা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এটাতো কারণ নয়। বিষপান বা গলায় দড়ি দেওয়া এটা একটা মাধ্যম। কিন্তু কি কারণে বিষ খেয়েছে বা গলায় দড়ি দিয়েছে বা আত্মহত্যা করেছে এর আসল কারণ বা রহস্য কেউ খতিয়ে দেখিনা বা দেখবার মতো মন বা মানসিকতা কারো থাকে না। ঝড়, বৃষ্টি রোদ সহ নানা রকম প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে যেমন একটি বৃক্ষ বেড়ে ওঠে। পরিপুষ্ট হয়। ফুল দেয়, ফল দেয়, জ্বালানি দেয়, অক্সিজেন নিঃসরণ করে এক কথায় বৃক্ষ জীবনকে বিকশিত করে। তেমনি মানুষের জীবন বৃক্ষকেও নানা প্রকার ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই বড় হতে হয়। বিকশিত হতে হয় এটাই তো জীবন। জীবনের দাম নিজেকেই বুঝতে হবে। জীবনকে উপভোগ্য প্রয়োজনীয় কার্যকরি এবং পরিপূর্ণ করার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। অন্যের ওপর নির্ভর করে কিংবা মান অভিমান রাগ করে নিজেকে বঞ্চিত করা অর্থহীন। এক জীবনে সব আশা প্রয়োজন। কিংবা যোগ্যতার যথাযথ মর্যাদা একজন মানুষ নাও পেতে পারেন; সেটুকুও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে। ইচ্ছা-সদিচ্ছার চাহিদা আর টানা পোড়নের ভিড়ে ও নিজেকে উজ্জীবিত উপভোগ্য রাখাটাই কাম্য। আত্মহত্যা বা নিজেকে হত্যা মানে অপচয় একটা সুন্দর আর মহামূল্যবান জীবনের অপচয়। এই চিরসত্য কথাটা মেনে নেয়ার মানসিকতা বা বোধ শক্তির বড্ড অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে আজকের দিনের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। হতাশা-নিরাশা, বেদনা বা অন্তর্দাহর এক অশুভশক্তি তাদের বোধশক্তির দরজাটাকে এমনভাবে আগলে রাখে যে তারা তাদের জীবনকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার মত দ্বিতীয় চিন্তা বা শক্তি সাহস পায়না। আর পায়না বলেই বেছে নেয় জীবন বিনাশি পথ। এতে তাদের মহামূল্যবান জীবন নষ্ট হয়ে যায় আর ভেঙ্গে যায় পিতামাতা বা অভিভাবকদের স্বপ্নের মিনার। কিছু কিছু লক্ষণ যেমন- সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, মাদকাসক্তি, মানসিক রোগে ভোগা, ঘুমের বা খাবারের পরিবর্তন, নিজেকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব বা ঘৃণা করা ও একাকী আশাহীন সহায়হীন অনুভব করা ইত্যাদি কোন মানুষের মধ্যে হঠাৎ করে যদি দেখা যায় বা বোঝা যায় তাহলে সেই ব্যক্তি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে বলে অনুমান করতে হবে। শহরের লোকেরা গ্রামের মানুষের চেয়ে শিক্ষিত আর সচেতন বলে তারা যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে ঐসব লক্ষণ দেখতে পায় তাহলে তারা ঐসব লক্ষণধারীকে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু গ্রামের মানুষ অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত অসচেতন এবং অধিকারেই দরিদ্র বলে তারা ঐসব বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেয় না বা বুঝবার চেষ্টা করে না বা গুরুত্ব দিলেও চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে তাবিজ, কবজ, ওঝা কবিরাজের বা ফকির-দরবেশের শরণাপন্ন হয় এতে রোগ নয় রোগির বিনাশ হয়। বলতে গেলে আত্মহত্যার প্রতিরোধ বা প্রতিকারের বিষয়টা গ্রামের মানুষের কাছে একেবারে অজ্ঞাত। গ্রামের হোক বা শহরের হোক সব ধরনের মানুষের আত্মহত্যার প্রতিরোধের ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।  আত্মহত্যা সম্পর্কে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলা-উপজেলার স্কুল কলেজগুলোর ছাত্র-ছাত্রিদের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকে আত্মহত্যার প্রবণতার বিরুদ্ধে জোরদারভাবে প্রচার চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অকুপেশনাল থেরাপিস্টসহ বিভিন্ন স্তরের মানসিক স্বাস্থ্য কর্মি তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য কর্মির তীব্র সংকট সেক্ষেত্রে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মোতাবেক প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক বা থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে
কর্মরত চিকিৎসক এবং অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে থেকে বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে তারাও প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারে। সমস্যার তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে তারা প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীর কাছে পাঠাতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কবে করবে বা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে সে আশায় হাত পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। তাই এগিয়ে আসতে হবে আপনাকে আমাকেই মনে রাখতে হবে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ করাটা আমাদের সবারই দায়িত্ব। শুধু রাষ্ট্র বা নির্দিষ্ট কোন পেশার মানুষের একার দায়িত্ব নয়। এইভাবে যদি আমরা এগিয়ে যেতে পারি তবে গ্রাম-শহরে উভয়খানের মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। হ্রাস পাবে আত্মহত্যার হার।
লেখক : উন্নয়ন কর্মি
০১৭১৮-৫৩৩৭৬৬