আত্মবিনাশী প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসব

আত্মবিনাশী প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসব

মোঃ আব্দুল ওহাব  :কথায় আছে “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড”। এই একটি কথা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে শিক্ষার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। একটি দেশের উন্নতির শিখরে পৌছতে হলে, সেই দেশের সুশিক্ষার দিকে প্রথমে তাকাতে হয়। সে দেশটির জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হয়। শুধু গণনা করে শিক্ষার হার বৃদ্ধি করলেই দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না বরং দেশের জনগণকে সুশিক্ষা ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই দেশকে সহজেই উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ত্র“টি রেখে শিক্ষার মান অগ্রগতি করা সম্ভব নয়। আমরা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শ্রেণীতে যখন পড়াশুনা করতাম তখন প্রশ্নপত্র ফাঁস আসলে কি তা কখনই আমাদের জানা ছিল না। বিগত কয়েক বছর যাবৎ এদেশের সকল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সারাদেশে আলোচনা সমালোচনা ছিল এবং বর্তমানেও হচ্ছে। দেশের বিশাল একটি শিক্ষিত জনগণ বারবার বলছে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, দ্রুত এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন, কিন্তুু সে বিষয়ে ভাবার কোন সময় নাই। বরং এর বিপরীতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ উত্তর দিলেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি বা হচ্ছে না, তারা অভিভাবকবৃন্দকে আরও বললেন আপনারা গুজবে কান দিবেন না।

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সারাদেশে যখন আলোড়ন চলছে তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এমন বক্তব্য এ দেশের শিক্ষিত সমাজকে নিরাশ করেছে। দেশের শিক্ষিত সমাজ প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আরও সজাগ হওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছেন যাতে করে আর প্রশ্ন ফাঁস না হয়। প্রশ্নফাঁসকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তুু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিকে নিছক সাজেশন হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন যা প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী সংঘবদ্ধ চক্রান্তকারীদের একপ্রকার উৎসাহ দেওয়ার সমতুল্য। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে অনেকেই এ নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখিও করেছেন, তারা এর প্রতিবাদ করেছেন, তারপরেও বিশেষ অজ্ঞাত কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া থেমে থাকেনি বরং নিয়ম কানুন যত বেশি হচ্ছে দিন দিন প্রশ্নপত্র ফাঁস ততই বেড়েই চলছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ফেসবুকে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে এই ফাঁসকৃত প্রশ্ন, যার ফলে শিক্ষার্থীরা রাত জেগে পড়াশুনা না করে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগগুলোতে প্রশ্নপত্র সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 এমন অনেক শিক্ষার্থীও আছে যারা শুধু প্রশ্নপত্র পাওয়ার আশায় অপেক্ষায় থাকে। বর্তমান সময়ে পাবলিক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন এখন দেশের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র গত বছরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে খুব সহজেই পাওয়া গেছে, সেটা আমরা টেলিভিশন ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে দেখেছি, এমনকি ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগেও হলের বাহিরে মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে দেখা গেছে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র যাতে কোনভাবেই ফাঁস না হয় এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা গিয়েছিল। পরীক্ষা শুরুর ৩০মিনিট আগে হলে প্রবেশ, ফেসবুক বন্ধ রাখার পরিকল্পনা ইত্যাদি। পরিকল্পনা মাফিক কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরের দিন বিভিন্ন মিডিয়া ও পত্রিকাতে দেখা গেল যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার সাথে হুবহু মিল পাওয়া গেছে। প্রশ্ন ফাঁসের উক্ত বিষয়টি নিয়ে যেদিন মন্ত্রণালয়ে মিটিং হয়েছে এবং প্রশ্নফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে ৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার প্রদান করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। পুরস্কার ঘোষণা করার পরের দিনই দেখা গেল ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, নানা কৌশল অবলম্বন করেও কোনভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বন্ধ করা যাচ্ছে না, যেটা শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল দিককেই তুলে ধরে।

 ছোটকাল থেকেই এখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে শুরু করেছে পড়াশুনা না করেও শুধু পরীক্ষার আগের রাতে একটু দৌড়া-দৌড়ি করলেই বিকল্প পদ্ধতিতে ভালো ফলাফল করা যায়। শুধু প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী বা জেএসসি নয়, এখন প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এমন কথা সব সময় বিভিন্ন মাধ্যেমে শোনা যাচ্ছে। যে দেশে প্রাইমারী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে দেখা যায়, সেদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু অগ্রসর হয়েছে বা শিক্ষার মান কেমন তা সহজেই বোঝা যায়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের নামে প্রতি বছর তা পরিবর্ধন, পরিমার্জন, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, এতে করে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। এদেশের শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যতবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে ততবার শিক্ষার মূল বিষয় বা এদেশের বাস্তবতার ওপরে কোন ধরনের শিক্ষা এদেশে উপযোগী তা নিয়ে ভাবা হয়েছে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। মাধ্যমিক শ্রেণীতে কয়েক বছর আগে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সিলেবাসে নতুন ৩টি বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছিল, বিষয়গুলো- কর্ম ও জীবনমূখী শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা এবং চারু-কারুকলা। বলা হলো উক্ত বিষয়গুলো পড়লে তারা কর্মজীবনের প্রতি ছোট থেকেই আগ্রহী হয়ে উঠবে। কিন্তুু ২০১৭ সালের জেএসসি পরীক্ষায় এই ৩টি বিষয়কে শিক্ষা বোর্ড থেকে বাতিল করা হলো এবং তা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরিণ বিষয় হিসাবে রাখা হয়। তাহলে এই ৩টি বিষয় কোন প্রয়োজনে সংযুক্ত করা হলো বা কোন প্রয়োজনে তা বাতিল করা হলো। তাই কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর চিন্তাভাবনা সুদূরপ্রসারী হওয়া উচিত।

 একটা কথা প্রচলিত আছে প্রকৃতিই মানুষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। কিন্তুু বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগই পায় না। পিইসি, জেএসসির মতো অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিশুরা তাদের শৈশব-কৈশোর হারিয়ে ফেলছে, এতে করে তাদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সারাক্ষণ চার দেয়ালে বন্দি থেকে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হচ্ছে আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন। তাই যতটুকু সম্ভব আমাদের উচিত শিশুদের ওপর থেকে লেখাপড়ার চাপ কমানো। এ জন্য তাদের কথা বিবেচনায় রেখে তাদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তুক তৈরি করতে হবে। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও সত্য যে, যে সকল ব্যক্তি সিলেবাস প্রণয়ন করেন তারা শিক্ষার্থীদের বয়স ও তাদের পড়াশুনা ধরে রাখার যে সামর্থ্য তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সিলেবাস প্রণয়ন করেন না। বিষয়টির সাথে অনেকেই একমত হবেন যে, বর্তমান সিলেবাসে এসএসসির পদার্থ, রসায়ন, উচ্চতর গণিত এবং এইচএসসির পদার্থ, রসায়ন, জীব, উচ্চতর গণিত বিষয়ের সিলেবাসগুলো তাদের সাথে সামঞ্জস্য নয়, ভাবনাটা এমন মনে  হচ্ছে, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েই একেকজন শিক্ষার্থীকে তারা আইনস্টাইন বানাতে চান। কিন্তুু ফলাফলে তার উল্টোটা ঘটছে। বর্তমানে সকল শ্রেণীর বইগুলোতে পৃষ্ঠা সংখ্যা কম করে প্রতিটি অধ্যায়ে অনুশীলনীমূলক কাজ বৃদ্ধি করে সিলেবাসকে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। আবার অনেক বিষয় বইয়ে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে, যে বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্য হওয়া উচিত।


একজন শিক্ষার্থী যখন কোন একটি বিষয় তার মেধা দিয়ে সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, তখন সে পড়াশুনার মাঝে আনন্দের পরিবর্তে বিশাল বোঝা খুঁজে পায় এবং সে আস্তে আস্তে ওই বিষয় থেকে দূরে সরে যেতে চায়। এই আনন্দহীন শিক্ষাব্যবস্থা, অস্স্থু প্রতিযোগিতা যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে না। বর্তমানে আমাদের সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে জিপিএ ফাইভমুখী। অভিভাবকবৃন্দ মনে প্রাণে চান যে তার ছেলে-মেয়ে যেন জিপিএ ফাইভ পান, তার মেধা কতটুকু আছে সে বিষয়টি তাদের ভাবার সময় নেই। জিপিএ ৫.০০ এর উৎসবে আর ঢাক-ঢোলের বাজনাতে চাপা পড়েছে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। দেশের শিক্ষার হার বেড়েছে, বাড়ছে অনেক ডিগ্রিধারী। বেড়েছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। কিন্তুু এত বৃদ্ধির পরেও সমাজ আজ অমানবিক হয়ে উঠছে কেন? সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধতা, স্বার্থপরতার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ কর্মকান্ড ক্রমশ দেশে বাড়ছে কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর একসাথে পাওয়া অনেক কঠিন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনের ভবিষৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে এখনই পরিকল্পনা নির্দিষ্ট করা দরকার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দরকার কিনা তা বলার অধিকার আমরা রাখি না। যেহেতু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্র“টি-বিচ্যুতি ও শুভঙ্করের ফাঁকি ধরা পড়েছে সেই বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। যদি জনগণের পর্যবেক্ষণই সঠিক হয়ে থাকে তাহলে জনপ্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত সমস্যা সমাধান করা দরকার।

দেশে যারা শিক্ষাব্যবস্থার সাথে জড়িত তাদের সদিচ্ছা থাকলে অল্প সময়েই একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া অধিক প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির হার এখন এমনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় এসে পৌছেছে, যা একটি জাতির জন্য অশুভ সংকেত। এ থেকে উত্তরণ না ঘটলে আমাদের আগামী দিনের স্বপ্ন অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। তাই সবার সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমে উচিত আগামী দিনের স্বপ্নকে রক্ষা করা।
লেখক ঃ সাবেক শিক্ষক, বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাই স্কুল
 ০১৭২৯-৮২৮৬৮৫