আজ জাসদের ৪৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী

আজ জাসদের ৪৭তম প্রতিষ্ঠা  বার্ষিকী

গোলাম মোস্তফা ঠান্ডু : আজ ৩১শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর ৪৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে বিজয়ীর বেশে ফেরা, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানের অহংকারে গর্বিত লক্ষ লক্ষ বিপ্লবী তরুণ যুব সমাজের অগ্রগামী বৃহত্তর অংশ, সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দীপ্ত প্রত্যয়ে ক্ষমতার সকল মোহ ত্যাগ করে জনতার কাতারে এসে গঠন করেন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল জাতীয় “সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ”। যার মূল স্লোগান ছিল “আমরা লড়ছি শ্রেণি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য”। জাতির এক ক্লান্তিকালে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে কৃষক, শ্রমিক, সর্বহারা মেহনতি মধ্যবিত্ত ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজিবী এবং যুবশক্তির মধ্যে থেকে গড়ে ওঠা নতুন নেতৃত্বের অধিকারী প্রতিনিধিদের উপর রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা অর্পণ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে শ্রেণিহীন, শোষনহীন, কৃষক শ্রমিকের শাসন প্রতিষ্ঠা করা তথা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মূল লক্ষ্য। এই ঘোষণা দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আত্মপ্রকাশ। যার ভিত্তি ছিল বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের গর্ভে জন্ম নেওয়া জমজ শিশু, তার একটি বাংলাদেশ অন্যটি জাসদ।
জন্মের পরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত জাসদের দীপ্তিময় তারুণ্য রাজনীতির ময়দানে তীব্র ঝাঁকুনী তৈরি করে। প্রতিবাদ প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে সমাজের তরুণদের বড় অংশের মন জয় করেছিল জাসদ। কিন্তু পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ, ষড়যন্ত্র, নেতৃত্বের কোন্দলে দলটি অনেক বার ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়। ফলে ১৯৮০ সালে প্রথম ভাঙ্গন ঘটে জাসদে। জাসদ ছেড়ে খালেকুজ্জামান, আ ফ ম মাহবুবুল হক, মাহমুদুর রহমান মান্নারা গঠন করেন বাসদ। এক সময় বাসদ ভেঙ্গে দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে জাসদ দ্বিতীয় দফায় ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। এবার জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ স ম আব্দুর রব আলাদা জাসদ গঠন করেন। ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে জাসদ তৃতীয় দফায় ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়। এবার শাজাহান সিরাজ, সিরাজ গ্রুপ নামে আলাদা জাসদ গঠন করেন। এই গ্রুপটি বর্তমানে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও গণফোরামে যোগদানের মধ্যে দিয়ে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ ২০১৬ ইং সালে জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে আর এক দফা ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয় দলটি। একপক্ষে হাসানুল হক ইনু ও শিরিন আক্তার অন্যদিকে শরিফ নূরল আম্বিয়া, নাজমুল হক প্রধান, মাঈনউদ্দিন খান বাদল, ডাঃ মোস্তাক হোসেনদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাসদ নামে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে বহুধা বিভক্ত জাসদ তার যৌবনের তেজোদ্দীপ্ত অহংকার হারিয়ে কোনোমতে টিকে আছে এখনও। দেশ স্বাধীনের পর জাসদ জন্মলগ্ন থেকে রাজপথে থেকেছে, লড়াই সংগ্রাম করেছে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে যেয়ে তৎকালীন শাসকদল জাসদকে নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে জাসদ শাসকদের রক্তচক্ষুকে চ্যালেন্স করে সংগ্রাম করেছে। সেই সংগ্রামে জাসদ কর্মীরা জীবনদিতে দ্বিধা করেনি। বীরউত্তম কর্নেল তাহের, সিদ্দিক মাস্টার, মোশারফ হোসেন, কাজী আরেফ আহম্মেদ, লোকমান হোসেন, ইয়াকুব আলী, মারফত আলী, প্রকৌশলী নিখিল, তপন, হাদি, মন্টু, শাজাহান সিরাজ, আসাদ, বাচ্চু, মাসুদ, হারুন, জাফর, জয়নাল, মুন্না, পিটু, লাকী, তপন, মনির, জুয়েল, ডা. মিলনসহ লাখো টগবগে সমাজ বদলের স্বপ্নবাজ তরুণ যুবকদের রক্তে ভেজা জাসদ ঘুনে ধরা এ সমাজভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ফলে তৎকালীন শাসকদলের নিকট চরমভাবে হত্যা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।
দলটির আদর্শগত দিক নির্দেশনা ছিল, ‘বাংলাদেশকে পুঁজিবাদি রাষ্ট্র ও বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলা হয়। বিপ্লবের রূপ গণঅভ্যূাত্থানমুলক বলে উল্লেখ করা হয়। পরিমার্জিত থিসিসে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর ও মূল্যায়ন ঠিক রেখে অসম্পূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ও জাতীয় করণীয় সমাপ্ত করতে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন ও বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাদ অনুন্নত পুঁজিবাদ বলে পুন: মূল্যায়ন করা হয়। জাসদের গগণ বিদারী স্লোগান সমস্ত অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে জাগ্রত প্রতিবাদ। রাজনীতিতে জাসদকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনও মিমাংসা হয়নি। সাক্ষী ও প্রমাণের কারণে সমস্ত অসত্য প্রশ্নগুলো কোনদিন হয়তো মীমাংসাও হবে না, কারণ জাসদের হয়তো কিছু ভুল থাকতেও পারে কিন্তু কোন অন্যায় ও ষড়যন্ত্র জাসদ করেনি। আর সেই কারণেই জাসদ টিকে থাকবে। হয়তো বদলে যেতে পারে অনেক কিছুই, তাই নতুন করে সমতা, গণতন্ত্র, ন্যায় বিচারের ঝান্ডা হাতে আমরা অসম্প্রদায়িক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করতে চাই। জনগণের শত্রু, দালাল, লুটপাটকারী দলবাজদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন করে বাংলাদেশ জাসদ এগিয়ে যাচ্ছে। এই জাসদ হবে জনতার জাসদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাসদ, অসম্প্রদায়িক বাংলদেশ গড়ে তোলার জাসদ। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিশ্চয়তার দৃঢ় অঙ্গীকার হবে বাংলাদেশ জাসদের মূল লক্ষ। সংগ্রাম দীর্ঘজীবি হোক, জয় হোক মেহনতি মানুষের। ধন্যবাদ সবাইকে।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক, সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ জাসদ, বগুড়া জেলা শাখা ও কেন্দ্রীয় সদস্য। ০১৬৮৭-১৬১৪৪৯