আগে দর্শনধারী পরে তো গুণবিচারি!

আগে দর্শনধারী পরে তো গুণবিচারি!

মুহাম্মদ নাজমুল হক : গত ২১ মে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার টেলিফোন, সেলুলার, ফ্যাক্স ও ইন্টারনেট নীতিমালা ২০১৮ এর যে খসড়া অনুমোদন করেছে তাতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবদের জন্য ৭৫ হাজার টাকা দামের সুবিধা রাখা হয়েছে। আমরা সাধারণ জনগণ সরকারকে ট্যাক্স দেই দেশের উন্নতির জন্য। আমরা সাধারণ মানুষ একটু উন্নত নাগরিক সেবা পাবো এই আশায়। সেখানে যখন দেখি জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যাংক জালিয়াতিসহ নানা অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হচ্ছে। ঘুষ-দুর্নীতি করে অনেকে শতশত কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। অথচ ঐসব লুটেরা, দুর্নীতিবাজদের কোন সাজা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ অফিস আদালতে যেয়ে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না। তারপরও ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে মোবাইল ফোন কিনে দিতে হবে আমাদেরই ট্যাক্সের টাকায় ! তখন আশাহত না হয়ে পারি না।  জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যে বাড়তি বেতন ভাতা দেওয়া হচ্ছে তা দিয়েও বোধ হয় চলছে না। যে জন্য ফোনসহ আনুসংগিক খরচও জনগণকেই বহন করতে হবে। কেউ হয়তো বলবেন এ আর এমন কি, এ তো সামান্য টাকা!

এর আগে উপসচিব থেকে শুরু করে ওপরের সব কর্মকর্তাদের বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা গাড়ি কেনার জন্য ঋণের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। গাড়ি পোষার জন্য আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই তাঁদের আরও দেওয়া হবে মাসে ৫০ হাজার টাকা। শুধু এই-ই নয়, উপসচিবসহ ওপরের সব আমলাদের ৫ শতাংশ সরল সুদে ৭৫ লাখ টাকা করে বাড়ি নির্মাণের ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০ বছর মেয়াদের এই টাকা নিয়ে তাঁরা বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন। কিন্তু কেনো এই অতিসজ্জ ? কোথা থেকে আসে এতো টাকা? এ টাকা আমার টাকা। এই টাকা আমার দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা। এই টাকার সঠিক ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে জনগণের সেবা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে সেটাই দেখার বিষয়।  এভাবে শত সুযোগ-সুবিধা ও টাকা কড়ি দিলেও কোন লাভ হবে না। উপরটা ঘষেমেজে চকচকে করে, দামি পোশাক, দামি গাড়ি, দামি ফোন এসব দিয়ে দর্শনধারী হিসেবে উপস্থাপনের ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 দেশ প্রেম জাগ্রত করে, দেশকে ভালোবেসে নিজ দেশের, নিজ দেশের মানুষের বিচার-বুদ্ধি ও সৃজনশীল সম্ভাবনা বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা ও সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। গুণে-মানে নিজেদের উচ্চ থেকে উচ্চতর দরে আনতে হবে। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মেহনতি মানুষের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের সেবকদের ব্যাপারে সবক্ষেত্রে সরকারের এমন উদার মনোভাব না দেখিয়ে বরং সংযমি হতে এবং জনগণের সেবার প্রতি অধিক মনোযোগি হতে তাগিদ দেওয়া প্রয়োজন। দেশটাকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নেওয়ার মূলে যে মেহনতি মানুষ তাঁদের কথা আগে ভাবা প্রয়োজন। একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম, ভোগ-বিলাসে অতি সাধারণ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ যে স্যান্ডেল পরেন তার দাম মাত্র ৪ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য প্রায় ৩৩২ টাকা।

 ব্যবহার করেন অতি সাধারণমানের গাড়ি। তাঁর স্বপ্ন শুধু মালয়েশিয়ার উন্নয়ন। ইতোমধ্যে দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সরকারি খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রাণপুরুষ খ্যাত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি মন্ত্রীদের বেতনের ১০ ভাগ হ্রাস, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মচারিদের ছাঁটাই এবং বড় বড় প্রকল্পের বাজেট কাটছাঁট করাসহ বেশকিছু শক্তিশালী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ল্যান্ড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কমিশন, ন্যাশনাল প্রফেসরস কাউন্সিল ও স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টের মতো অপ্রয়োজনীয় কিছু সংস্থা বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, “এসব সংস্থা কেবল পরামর্শ দেয়। কিন্তু তাদের বুদ্ধি ও পরামর্শ আমাদের এখন আর দরকার নেই। বরং তাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধি আমাদের আছে।”  আমরা আশা করি আমাদের দেশের যাঁরা সেবক তাঁরাও এমনটাই ভাবেন।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা, মার্চেন্টস পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ।[email protected]  -০১৭১৮৭৮৭০০০