ঘর গোছাতে মাঠে কেন্দ্রীয় নেতারা

আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ দলীয় কোন্দল

আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ দলীয় কোন্দল

মাহফুজ সাদি : টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও। আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ দলীয় কোন্দল। তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কোন্দল মিটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই সাথে সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে তৃণমূলের কাছে কেন্দ্রের নির্দেশনা পৌঁছে দিতে মাঠে নেমেছে ১৫টি সাংগঠনিক টিম।

আওয়ামী লীগ নেতারা দৈনিক করতোয়ার সাথে আলাপচারিতায় জানান, সামনেই নির্বাচন। ২০১৮ সালকে বলা হয় নির্বাচনের বছর। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। ফলে বিষয়টি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন্দল দূর করে শৃঙ্খলা আনতে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এতে বিব্রত হচ্ছে দল ও সরকার। তাই দলের হাই কমান্ডের নির্দেশনা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের টিম করে জেলায় জেলায় পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনেও একই ধরণের নির্দেশনা পৌঁছে দিচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার মানিকগঞ্জে দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন উপলক্ষে প্রতিনিধি সভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। ঘরে ঘরে কলহ, দলের মধ্যে আরেক দল, কোন্দল আর সহ্য করা হবে না। নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি নেই। দলীয় নেতাদের ক্ষমতার দাপট না দেখাতে অনুরোধ করেন তিনি। সূত্রমতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়েও ঝামেলা ঝুলছে দীর্ঘদিন। দলের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক নিয়োগকে কেন্দ্র করে হ য ব র ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে আলোর মুখ দেখার আগেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কমিটি ‘ভাইরাল’ হয়েছে গত কয়েকদিন ধরেই। কমিটির বিপক্ষে অবস্থানকারীরা চালাচ্ছেন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। বঞ্চিতদের ক্ষোভের মুখে     পড়ার আশঙ্কায় কোনো নেতাই দায় নিচ্ছেন না এ কমিটির। ক্ষুব্ধদের ভয়ে গত কয়েকদিন ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতির ধানমন্ডি কার্যালয়ও এড়িয়ে চলছেন অনেক নেতা। এদিকে দলের ভেতরে বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ঘোষণা হচ্ছে না ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানা ও ওয়ার্ড কমিটি।

 উত্তরে দুই বার কমিটি ঘোষণা করলেও পরে অভিযোগ আসলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তা বাতিল করেছেন। দক্ষিণের প্রস্তাবিত কমিটি ঘোষণার পর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে রেখেছেন বেশ কয়েকটি থানা-ওয়ার্ডের নেতারা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনের বিবাদও অনেক দিনের। দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর ওবায়দুল কাদের তাদেরকে নিয়ে বৈঠক করে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। এরপর থেকে প্রকাশ্যে আর কোনো বিরোধ দেখা না গেলেও ঝামেলা এখনো মেটেনি। কমিটিতে নিজেদের লোককে স্থান দেয়া নিয়ে এখনো ভেতরে ভেতরে বিরোধ রয়েছে এই দুই নেতার মধ্যে। এই বিবাদের কারণেই দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও এমপি শামীম ওসমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালের শেষে সিটি নির্বাচনের আগে তাদের এই দ্বন্দ্ব মেটাতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা একাধিকবার উদ্যোগও নেন। সে সময় দৃশ্যত দুই পক্ষে সদ্ভাব আসলও সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ আবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে আবারও মেয়র আইভী ও শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জয়পুরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য সামছুল আলম দুদুর মধ্যে বিরোধেও সে জেলায় চলছে পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার। সর্বশেষ গত শনিবার সেখানকার নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির অফিসে দুই দফা বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদেরসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। এদিকে নাটোরে গত ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’ এবং ১২ জানুয়ারিতে সরকারের চার বছর পূর্তিতে নাটোরে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি পালিত হয়েছে দুই ভাগে। এক পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুস, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, অপর পক্ষে জেলা সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল। গত শনিবার এই জেলার নেতাদের নিয়ে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন দুই পক্ষই।

সম্প্রতি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মকলেছুর রহমান নামে একজন নিহত হয়েছে। উপজলোর গোবিন্দপুর দাখিল মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি হওয়াকে কেন্দ্র করে ইউসুফপুর ইউনিয়নে এই সংঘর্ষ হয়। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে বহিষ্কার পাল্টা বষ্কিারের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, পাবনা, নাটোর, মুন্সীগঞ্জ, কুমিলা, শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া, বান্দরবান, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, খাগড়াছড়ি, ফেনী, সিলেট ও সিরাজগঞ্জ জেলাকে বিরোধপূর্ণ এলাকা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সূত্রজানায়, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, সেচ্ছাসেবক লীগসহ মেয়াদ উত্তীর্ণ কয়েকটি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনকে বার বার তাগাদা দেয়ার পরেও হয়নি তাদের জাতীয় সম্মেলন। এসময় সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উষ্মা প্রকাশ করে সম্মেলনের তাগিদ দিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের জরুরি বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় যে কোন মূল্যে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ন পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রলীগকে নির্দেশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সন্ধ্যা ৬টায় থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিভিন্ন শাখা নেতাদের কথা বলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে বৈঠক করেন তারা।

সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউলাহ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু ভুল বোঝাবুঝি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা অপ্রত্যাশিত। এটা আমরা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। নির্বাচন অনেক কাছে চলে এসেছে। এ মুহূর্তে দলের মধ্যে সবার ঐক্যবদ্ধ থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যেগুলো হচ্ছে তাকে কোন্দল নয়, এটা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে একাধিক প্রার্থী রয়েছে। তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঝে মধ্যে ছোটখাটো ঘটনা ঘটে। তবে আমাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পরেই তা আর থাকবে না, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থেকে নৌকাকে বিজয়ী করবে। রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, পৃথিবীর যেখানেই তিনজন বাঙালি সেখানেই একাধিক গ্রুপের অস্তিত্ব থাকে। এটা আমাদের স্বাভাবগত চরিত্র। কোন্দলবিহীন নিয়ন্ত্রিত আওয়ামী লীগ আশা করা আর আওয়ামী লীগকে মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির দিকে দেয়া একই কথা। আমাদের টার্গেট হলো কোন্দলকে সীমিত করে আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে সুসংগঠিত করা।