কূটনীতিকদের অবস্থান জানাবে সরকার

আওয়ামী লীগে উচ্ছ্বাস তবে ভাবনায় নির্বাচন

আওয়ামী লীগে উচ্ছ্বাস  তবে ভাবনায় নির্বাচন

মাহফুজ সাদি : বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলায় সাজার রায় নিয়ে সরকার নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশী কূটনীতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন কর্মকর্তারা। সেই সাথে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে রায় পরবর্তী বিএনপির কর্মকৌশলের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। একই সাথে রায় নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও আওয়ামী লীগের ভাবনায় রয়েছে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পনা ও কৌশল তৈরি করছে দলটি। সরকারি দলের নীতি নির্ধারক কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে- এটা ধরেই নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু রায়ের আগে-পরে বিএনপি কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নিয়ে চিন্তিত ছিল তারা। তবে অভ্যন্তরীণভাবে তেমন কিছু না ঘটায় আপাততঃ স্বস্তি এসেছে। রায়ের খবরটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হওয়ার     পর আন্তর্জাতিক মহলে যাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়, সেজন্য কূটনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে পদক্ষেপ নিবে আওয়ামী লীগ সরকার।
আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক দৈনিক করতোয়াকে বলেন, রায়ের আগে বিএনপির রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল কিন্তু তেমনটা না ঘটলেও রায় শুনতে আদালতে যাওয়ার পথে হঠাৎ করে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সাথে জমায়েত এবং তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় বিষয়টি নতুন করে ভাবা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই আওয়ামী লীগ তার কৌশল নির্ধারণ করবে বলেও জানান তিনি। খালেদা জিয়ার এ রায় নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও আগামী একাদশ নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত দলটি। যদিও দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং মুখপাত্র হাছান মাহমুদ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, রায় যা হওয়ার তাই হয়েছে। এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। এদিকে গতকাল গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নয়, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হবে, সেটির লক্ষণ আমরা টের পাচ্ছি। এছাড়া খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় তির্যক মন্তব্যও করেন তিনি। কাদের বলেন, মানি লন্ডারিংয়ে এবং এতিমদের টাকা আত্মসাতের মামলায় দন্ডিত দুর্নীতিবাজদের নেতা বানাতেও গঠনতন্ত্রের ৭ম ধারা তুলে দিয়েছে বিএনপি। সূত্র মতে, গতকাল শুক্রবারই বাংলাদেশ সফরে এসেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। আজ শনিবার ঢাকা সফরে আসছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদল। তারা হয়তো সরকারের সঙ্গে আলোচনায় খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের প্রসঙ্গটি তুলতে পারেন। এছাড়া রায় এবং রায়-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ করছে বলে গতকাল জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র ফারহান হক। এর প্রেক্ষিতে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সরকারের অবস্থা পরিষ্কার করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে আসা সরকারি অর্থ এতিমখানার নামে আত্মসাতের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাকে কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয়নি। সূত্র জানিয়েছে, দুই দিনের সরকারি সফরে গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছার পর সন্ধ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সাথে বৈঠক করেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। সফরের দ্বিতীয় দিন আজ শনিবার তিনি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজারে যাবেন। এদিকে আজ শনিবার ঢাকায় আসছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ১১ সদস্যের চারটি আলাদা প্রতিনিধিদল। এর মধ্যে তিনটি প্রতিনিধিদল ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাবে। আর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক কমিটির চেয়ারপারসন জিন ল্যাম্বার্টের নেতৃত্বাধীন গুরুত্বপূর্ণ দলটি কক্সবাজার সফর শেষে ঢাকায় ফিরে সরকারের মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলবেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের সাক্ষাৎ করার কথা ছিল। ফলে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরে খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের প্রসঙ্গটি আসতে পারে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। একটি সূত্র জানায়, তারা খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের প্রসঙ্গ তুললে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা হবে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় নেতাদের পর এ প্রসঙ্গে বহির্বিশ্বের কাছে খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হবে। খালেদার দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণার পর এমন সিদ্ধান্তে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে খালেদা জিয়া সাজা নিয়ে কারাগারে যাওয়ার পর বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কর্মীদের কাছে দলীয় অবস্থান অবহিত করেছে বিএনপি। গতকাল গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিকালে এ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত  হয়। এতে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি, জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে ও ভারতীয় গণমাধ্যম জি মিডিয়াসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে এর পর সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রয়োজন বলে মনে করছে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা। অবশ্য বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের আগাম একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তারা।