‘আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই হলি আর্টিজানে হামলা’

‘আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই হলি আর্টিজানে হামলা’

আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট’র (আইএস) দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই নব্য জেএমবির জঙ্গিরা হলি আর্টিজানে নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত হামলা চালায়। এছাড়া তাদের এই হামলার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েম করা। হলি আর্টিজান মামলায় আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে।

বুধবার (২৭ নভেম্বর) সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মামলার ৮ আসামির ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।  

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ও দানবীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হলি আর্টিজান হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহির্প্রকাশ ঘটেছে। নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষ যখন রাতের খাবার খেতে হলি আর্টিজান বেকারিতে যায় তখনই আকস্মিকভাবে তাদের উপর নেমে আসে জঙ্গিবাদের ভয়াল রূপ। জঙ্গি সন্ত্রাসীরা শিশুদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গিরা নিথর দেহগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান বেকারি।

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, কলঙ্কজনক এ হামলার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশে যাতে বিদেশি নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এর ফলে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়। সেজন্য সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। এক্ষেত্রে আসামিদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এর ৬(২)(অ) ধারার সর্বোচ্চ সাজা দেওয়াই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।

বুধবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে হলি আর্টিজান মামলার রায় ঘোষণা করতে বিচারক এজলাসে ওঠেন। রায় ঘোষণার শুরুতেই বিচারক কিছু পর্যবেক্ষণ ও বিচারকাজের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। এরপর বেলা সোয়া ১২টার দিকে আসামিদের দণ্ড পড়ে শোনান তিনি।

শুরুতেই বিচারক বলেন, আজকে যে মামলার রায়টি ঘোষণা করা হবে, সেটি সমধিক পরিচিত হলি আর্টিজান মামলা হিসেবে। এই মামলার দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রমে আইনজীবী, কর্মচারী ও যারা সবসময় ফলোআপ করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।

এরপর আদালত গুলশান হামলার ঘটনা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার স্তরগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করেন।

বিচারক বলেন, এই রায়ের বিষয়ে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানাবেন। বিচারক হিসেবে এখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত চেষ্টা করেছি। বিচার কারও পক্ষে বা বিপক্ষে গেলেই ন্যায়বিচার হয় না। মামলার পুরো বিচারিক কার্যক্রম যথাযথভাবে নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মামলার বিচার শুরুর সময় ৮ আসামির ৬ জন কারাগারে ছিলো। বিচার চলাকালে বাকি দুজন গ্রেফতার হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(অ), ৭, ৮, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় চার্জগঠন করা হয়। মোট ২১১ জন সাক্ষীর ১১৩ জন অত্র আদালতে সাক্ষ্য দেন। যার মধ্যে ঘটনার সময় দায়িত্বরত পুলিশ, হলি আর্টিজান বেকারির কর্মচারী এবং আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেটও রয়েছেন। এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী (নিহত) জঙ্গি তানভীর কাদরীর ছেলে তাহরির কাদরী।  

এরপর মামলার বিচারকালে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বিচারক ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।  

ঘটনার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিচারক বলেন, এই ঘটনার পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী (নব্য জেএমবির নেতা, যিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মারা যান)। এছাড়া তার সঙ্গে সারোয়ার হোসেন, নুরুল ইসলাম মারজানসহ আরও কয়েকজন ছিল। যা আসামি আসলাম হোসেন র‌্যাশের স্বীকারোক্তি থেকে প্রমাণ মেলে।

এরপর বিচারক আসামিদের দণ্ড পড়ে শোনান। দণ্ডে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(অ) ধারা অনুযায়ী ৮ আসামির মধ্যে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ছাড়া বাকিদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। তাদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন আদালত।

এছাড়া আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন, আসলাম হোসেন র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম খালেদও মামুনুর রশিদ রিপনকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন, আসলাম হোসেন র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপনকে অত্র আইনের ৮ ধারায় ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৯ ধারায় ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

মামুনুর রশিদ রিপনের বিরুদ্ধে অত্র আইনের ৭ ধারায়, মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সবকটি ধারায় এবং জাহাঙ্গীর হোসেন, আসলাম হোসেন র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, শরিফুল ইসলাম খালেদও মামুনুর রশিদ রিপনের বিরুদ্ধে ১০, ১১, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেন আদালত।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (এ) ধারায় অনুযায়ী আসামিদের বিচারকালীন হাজতবাস দণ্ডাদেশ থেকে কর্তন হবে। দণ্ডপ্রাপ্ত হাজতি আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইস্যু ও জব্দকৃত অস্ত্রগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত এবং ধ্বংসযোগ্য আলামত বিধিমত বিনষ্ট করার আদেশ দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ডাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ অনুমোদনের জন্য অত্র মামলার নথি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে প্রেরণের আদেশ দেন। অত্র রায়ের অনুলিপি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রেরণের আদেশও দেন আদালত।