অসাধ্য সাধন করাই শেখ হাসিনার কাজ

অসাধ্য সাধন করাই শেখ হাসিনার কাজ

মাশরাফী হিরো : স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার চাকরি সূত্রে ছোট বোন শেখ রেহানা এবং সন্তান-সন্ততি নিয়ে শেখ হাসিনা তখন জার্মানিতে থাকতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে হঠাৎ জার্মানিতে টেলিফোন। পরিচিত এক ব্যক্তির টেলিফোন পেয়ে ওয়াজেদ মিয়া কিছুটা বিমর্ষ হয়ে গেলেন। তারপর শুরু হলো অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা। প্রায় ১২ দিন পর দেখা করলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে। তাদের সামনেই ইন্দিরা গান্ধী কোথায় যেন ফোন দিলেন। তারপর ফোন রেখে ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথাটি শেখ হাসিনাকে বললেন। নিমিষেই শেখ হাসিনা কেঁদে ফেললেন। তখন ইন্দিরা গান্ধী তাকে সান্ত¡না দিলেন। বললেন, ধৈর্য ধরতে হবে। এখন সামনে অনেক পথ। তারপর তারা দীর্ঘ ৬ বছর ভারতেই ছিলেন। সেখান থেকেই বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সকল সদস্যের বিচারের দাবি, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং দেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের সাথে যোগাযোগ ছিল এই গত কয়েক বছরের কাজ। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। অবশেষে সেই বছরের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। যেই বাংলাদেশ তার বাবার সৃষ্টি সেই বাংলাদেশে তিনি এলেন কিন্তু ততদিনে তা স্বাধীনতা বিরোধীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

 যেন আবার সেই পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করলেন। যেই বাঙালির স্বাধীনতার জন্য তার বাবা ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলতে চেয়েছিলেন সেই বাঙালিই তার বাবাকে হত্যা করেছে। আবার আইনও করেছে এ হত্যার বিচার করা যাবে না। তিনি যখন দেশে আসলেন তখন জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অল্প কিছুদিন পরেই জেনারেল জিয়াউর রহমান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এরপর শুরু হলো জেনারেল এরশাদের আমল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল এবং রাজনৈতিক হত্যাকা  ছিল নিত্যদিনকার বিষয়। তাদের আমলে মুক্তিযোদ্ধারা ছিল নিগৃহীত। আর রাজাকাররা ছিল ক্ষমতার অংশীদার। এটা চলেছে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। তারপর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সময়ে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। দেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফেরে।

 কিন্তু ২০০১ সালে আবারও সাম্প্রদায়িক শক্তির জোট বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসে। দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশ অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলা ভাই-শায়খ আব্দুর রহমানের উত্থান হয়। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা হয়। অল্পের জন্য বেঁচে যান শেখ হাসিনা। মারা যায় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মি। ৬৩টি জেলার ৫৭০ জায়গায় একই সাথে বোমা হামলা করা হয়। দেশে যে সরকার আছে তা বোঝাই যাচ্ছিল না। গণতন্ত্র তখন সুদূরপরাহত। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতারা তখন হত্যার শিকার। এমনি এক পরিস্থিতিতে ওয়ান ইলেভেনের উৎপত্তি। আবারও টার্গেট শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১১ মাস কারাবন্দি। জনগণের ভালোবাসায় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের চাপে শেখ হাসিনা মুক্ত হলেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো আওয়ামী লীগ। কিন্তু ষড়যন্ত্র পিছু ছাড়লো না।

 ৩ মাস পরেই ঘটলো বিডিআর বিদ্রোহ। শেখ হাসিনা তা সামলে নিলেন। শুরু হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে সুশাসনের পথে অগ্রযাত্রা। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম। যেদিন থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু সেই দিন থেকেই বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও শুরু। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত অংশ নিলো না। আওয়ামী লীগ আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলো। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও থামলো না। ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা চললো। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা গেল না। ত্বরান্বিত হলো খালেদা জিয়ার বিচার প্রক্রিয়া। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে তিনি দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলখানায় গেলেন। অবশেষে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসলো।

 আওয়ামী লীগ এখন যে ক্ষমতায় আছে তা আগে কখনই ছিল না। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী হয়তো বিরোধী দলের কথা ভুলেই গেছেন। তাই হয়তো গা ভাসিয়ে পথ চলা। কিন্তু এসব কথা নিশ্চয় ভুলে যাননি শেখ হাসিনা। তাই তো শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সামাজিক অসঙ্গতি দূর করতে হবে। আমি জানি তা অনেক কঠিন। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাবো। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সমাজটা যেন ঘূণে ধরেছে। আমি এই ঘূণে ধরা সমাজকে আঘাত করতে চাই। বঙ্গবন্ধু কন্যা সম্ভবত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পিতার অসমাপ্ত কাজটিই করতে চাচ্ছেন। দেশ এবং রাষ্ট্রকে আগামী দিনের নাগরিকদের জন্য সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে চাচ্ছেন। জানি তা কঠিন। কিন্তু কঠিন কাজ করাই তো আওয়ামী লীগের কাজ। ইতিহাস সৃষ্টি করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর কাজ। অসাধ্য সাধন করাই শেখ হাসিনার কাজ। যা তিনি অতীতে করে দেখিয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মদিনে দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা।
লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক,
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫