অভিন্ন নদীগুলোর পানির প্রাপ্যতা

অভিন্ন নদীগুলোর পানির প্রাপ্যতা

মোহাম্মদ নজাবত আলী : পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, নানা ধরনের অন্যায় ও অযৌক্তিক আচরণ করে থাকে। এ আচরণগুলোর মধ্যে কখনো ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আবার কখনো কোনো বিষয়ে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায় বিশেষ করে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো। কিন্তু এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র তাদের ফায়দা হাসিল করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চায়। এটা শুধু আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত নয়, পৃথিবীর প্রায় সব ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর চরিত্র একই। ভারত পৃথিবীর অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও একই সঙ্গে আমাদের প্রতিবেশী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে। তাছাড়া আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল কথা হচ্ছে, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্র“তা নয়। উপরোন্ত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত সর্বোত্তমভাবে সাহায্য করে। এজন্য ভারতের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তার মানে এই নয় যে, ভারত যা ইচ্ছে করবে তা আমরা মেনে নিবো। কারণ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। স্বাধীনভাবে আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অমিমাংসিত বিষয় রয়েছে। এ বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পানি। প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড সফরে বিভিন্ন বিষয়ে গণভবনে সাংবাদিকদের সামনে বলেন, পানির জন্য মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হবেনা।

 সেজন্য তিনি তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করেছেন। সরকার ডেলটা প্ল্যান নিয়েছে। নদীগুলো ড্রেজিং করে নিচ্ছি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কারও কাছে পানির জন্য মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হবেনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য তিস্তা চুক্তি আদৌ হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অথচ গত মেয়াদে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, তিস্তায় সুবাতাস বইবে। প্রধানমন্ত্রী পানি সমস্যা সমাধানের জন্য যে পরিকল্পনা নিয়েছেন তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তার মানে এই নয় তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে কি আমরা বঞ্চিত হব? কারণ এটা আমাদের অধিকার।  বাংলাদেশে প্রায় ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর উৎস দেশের বাহিরে ভারত ও নেপালে। বাংলাদেশ সুপ্রাচীন কাল থেকে ভাটির দেশ হিসাবে ইতিহাসে পরিচিত। কাজেই এ নদীগুলো বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অভিন্ন নদী মানেই আন্তর্জাতিক। আর এ ধরনের নদীর পানি বা প্রবাহ আন্তর্জাতিক আইনে বন্ধ করা বা বাঁধ দেয়া যায় না যা ভারত একতরফা ভাবে করছে। জাতিসংঘ নীতিমালার(১৯৯৭)৭-এর(১) অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘প্রতিটি দেশ আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ থেকে পানি ব্যবহারের ফলে পাশে একই অববাহিকায় অন্যান্য দেশের যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবে।’ আবার আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থা সংক্রান্ত নীতিমালার হেলসিংকিতে(১৯৬৬) ৪ ও ৫নং অনুচ্ছেদে বলা আছে “প্রতিটি অববাহিকাভুক্ত দেশ অভিন্ন নদী ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনা করে অন্য দেশের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখবে।” কিন্তু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সে নিয়ম নীতিমালার কোনো ভ্রƒক্ষেপ করে না। যদি করতো তাহলে ভারত একতরফাভাবে বিভিন্ন নদীতে বিশেষ করে তিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রেখে বিভিন্ন ফসল আবাদ, জীব বৈচিত্র্যকে এক মারাত্বক সংকটের মধ্যে ফেলতো না।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষিতে বহুমুখী ফসল উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নদ-নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ টিপাইমুখ, তিস্তা বাঁধে ভারতের একতরফাভাবে পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে উক্ত এলাকাগুলো আবাদি জমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ফারাক্কা চুক্তি হিসাবে বাংলাদেশকে ৮০হাজার কিউসেক পানি সরবরাহের কথা থাকলেও সে হিসেব মতে পানি  পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রায় ১৪টি জেলায় জীবন জীবিকা বিপন্ন হয়েছে। কারণ এ বাঁধের কারণে পানি না পাওয়া বিশেষ করে বর্তমান শুষ্ক মৌসুমে বেশ কয়েকটি নদ-নদী শুকিয়ে গিয়েছে। ফলে এককালের প্রমত্ত পদ্মা এখন শুকিয়ে তার যৌবন হারিয়েছে। যে পদ্মার বুকে পাল তুলে মাঝিরা মনের আনন্দে গান গাইতো সে পদ্মা এখন জীর্ণ শীর্ণ মরা নদী। শুধু ফারাক্কা নয়, টিপাইমুখ ও তিস্তা বাঁধের কারণে পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তার পানি থেকে ভারত আমাদের বঞ্চিত করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উত্তরাঞ্চলের ৬টি জেলায়। এ জেলাগুলোর মানুষ তাদের কৃষি জমিতে সেচ দিতে পারছে না। ভারতের একতরফা পানি আগ্রাসনে ইতিমধ্যে তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট থেকে রংপুরের কাউনিয়া পর্যন্ত প্রায় ৬৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শুষ্ক মৌসমে শুধু ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়। তিস্তা থেকে যেখানে সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪’শ থেকে ৫’শ কিউসেক পানি। ভারতের এ ধরনের আচরণ বন্ধুসুলভ নয়। সীমান্ত হত্যা এখনো বন্ধ হয়নি। ফেলানির মৃত্যুর বীভৎস দৃশ্য এখনো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। উপরোন্ত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা ভারতের পানি আগ্রাসন ছাড়া কি বলা যাবে ? বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ নদীর উৎস ভারত ও নেপালে। তিস্তা নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিমের একটি হ্রদ থেকে। এর দৈর্ঘ  প্রায় ৩শত কিলোমিটারেও বেশি। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১’শ কিলোমিটারের কিছু বেশি অবস্থিত এ তিস্তা নদী।

এ নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম সহ ৬টি জেলার কৃষক সম্প্রদায়। যে জমিগুলোতে প্রয়োজনীয় সেচের অভাবে শুষ্ক মৌসমে ফসল মরতে বসে। তবে অন্যান্য  অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে পানির ন্যায্য দাবিটি অন্যতম। কারণ পানি না পাওয়ার কারণে একদিকে তিস্তা খরস্রোতা নদীতে পরিণত হয়েছে। ফলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ফসল উৎপাদন পানির অভাবে ব্যাহত হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে উক্ত এলাকার মানুষ যে হুমকির মুখে পড়ে সেটা দেশের গোটা অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। অথচ ভারত সরকার তিস্তা থেকে পানি সরিয়ে নিয়ে সে পানি ব্যবহার করছে কুচবিহার, উত্তর দিনাজপুর সহ কয়েকটি জেলায়। দেশের সর্ববৃহৎ এ সেচ প্রকল্পটি থেকে পানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ করেছে ভারত। ফলে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার প্রায় ১২উপজেলায় ৬০হাজার হেক্টর জমিতে পানির অভাবে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। যৌথ নদী কমিশন সূত্র থেকে জানা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্প পুরোপুরিভাবে চালু হলে শুষ্ক মৌসুমে ৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষের জন্য পানি দেয়ার কথা। বিগত কয়েক বছর থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সেচ প্রকল্পের আওতা পর্যায়ক্রমে কমে এসেছে। বাধ্য হয়ে কৃষক গভীর নলকূপ দিয়েও ফসল বাঁচাতে হিমসিম খাচ্ছে।

তিস্তা সহ অভিন্ন নদীগুলোতে ভারতের একতরফা বাঁধের কারণে আমাদের নদীগুলো মৃত প্রায়। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ফসল উৎপাদন যেমন ব্যাহত হয়। তেমনি বর্ষা মৌসুমে সব বাঁধের মুখ খুলে দেওয়ার ফলে সারা দেশে বন্যার পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফসলহানি হয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ভবিষ্যতে মরুভূমিতে পরিণত হবে। কাজেই তিস্তা চুক্তি বা পানি বন্টন নীতিমালার বিষয়টি অতিগুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কারণ এতে দেশের খাদ্য সংকট অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত। তিস্তা চুক্তি বিষয়টি পররাষ্ট্র বিষয়ক সমস্যা এ চুক্তি না হওয়াতে দেশের জনগণ ও রাজনৈতিকদলগুলো সরকারের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে ভারতের মোদি সরকারের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা দীর্ঘ দিনের এ সমস্যার সমাধান হবে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ছিটমহল সমস্যার যেমন সমাধান হয়েছে তেমনি এ সমস্যারও সমাধান হবে বলে বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এ নদীর পানি আটকে রাখা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক নদী হওয়ায় বাংলাদেশ পানি পাবে আন্তর্জাতিক আইনে।

 পানি শুন্যতার কারণে কোনো দেশের একটি অংশ মরুভূমিতে পরিণত হোক, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হোক, মানুষের জীবন জীবিকা জীববৈচিত্র্য পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়–ক তা কেউ মেনে নিবে না। তবে প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে পৃথিবীর সব শক্তিধর রাষ্ট্রের চরিত্র একই। তারা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর অন্যায় আচরণ করে। কাজেই আমাদেরও ভাবতে হবে। নিজ দেশের স্বার্থের কথা। টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। অথচ তিস্তা চুক্তি আমাদের জাতীয় স্বার্থে হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের কূটনেতিক তৎপরতা আরও বাড়ানো দরকার। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। নিজ দেশের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো দেশের কোনো উদ্যোগকে মেনে নেয়া যায় না। তবে সরকার যে ভাষাতে কথা বলুক না কেন দেশের কৃষি, অর্থনীতিকে বাঁচাতে ও মরুময়তার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে তিস্তা সংকটের সমাধানের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক ঃ শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১