অবৈধ ‘সিটিং সার্ভিসে’ জিম্মি ঢাকাবাসী

অবৈধ ‘সিটিং সার্ভিসে’ জিম্মি ঢাকাবাসী

করতোয়া ডেস্ক : গণপরিবহনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বলে কিছুর আইনি বৈধতা না থাকলেও পরিবহন সঙ্কটের ঢাকা শহরে বেশিরভাগ বাস ‘সিটিং সার্ভিস’ হয়ে গেছে। কিছু বাস সারাদিন ‘লোকাল’ হিসেবে চললেও অফিস সময়ে ‘সিটিং’ হয়ে যাচ্ছে। ফলে জরুরি সময়ে যানবাহন না পেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। আবার ‘সিটিং সার্ভিসের’ নাম করে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও অনেক বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে, বাড়তি ভাড়া দিলেও তাদের যেতে হচ্ছে দাঁড়িয়ে। যাত্রী ওঠানামার জন্য এসব গাড়ি প্রতিটি স্টপেজেই দাঁড়াচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না যাত্রীরা। খবর বিডিনিউজ।বিআরটিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার শহর ও শহরতলীর আড়াইশ রুটে প্রায় আট হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। এর প্রায় প্রতিটি রুটেই দেখা গেছে যাত্রীদের ভোগান্তির চিত্র। সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, মতিঝিল ও সদরঘাট থেকে মহাখালী হয়ে বিমানবন্দর, আবদুল্লাহপুর, গাজীপুরের বিভিন্ন রুটে কয়েকটি পরিবহনের বাস চলে। এসব বাসের মধ্যে সায়েদাবাদ থেকে বলাকা, সদরঘাট থেকে আজমেরী, স্কাইলাইন, গুলিস্তান থেকে গুলিস্তান-গাজীপুর পরিবহন, প্রভাতী-বনশ্রী, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এয়ারপোর্ট পরিবহন লিমিটেড এবং মতিঝিল থেকে গাজীপুর পরিবহন এবং আল মক্কা পরিবহনের বাস চলাচল করে। এছাড়া প্রগতি সরণি হয়ে চলাচলকারী অনাবিল, সালসাবিল, সুপ্রভাত, রাইদা, ভিক্টর, প্রচেষ্টা, তুরাগসহ প্রায় পরিবহনের বাসই হয়ে গেছে ‘সিটিং সার্ভিস’। বলাকা পরিবহনের তিনশ বাসের মধ্যে কিছু লোকাল, কিছু সিটিং সার্ভিস হিসেবে চলাচল করত। কিন্তু গতবছরের শেষ দিকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর এখন সব গাড়িই ‘সিটিং’ হিসেবে চলছে। গুলিস্তান-গাজীপুর পরিবহনের বাস এমনিতে ‘লোকাল’ হিসেবে যাত্রী নিলেও অফিস ছুটির সময় এ পরিবহনের বাসগুলোও ‘সিটিং সার্ভিস’ হয়ে যাচ্ছে। বনানীর একটি গার্মেন্ট কারখানার কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই তাকে দীর্ঘসময় বাসের জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, বেশিরভাগ গাড়ির দরজা বন্ধ রাখে। গাড়িতে ওঠা যায় না।

 অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ করি বাসে তুলে দেওয়ার জন্য। আমাদের দুর্দশা দেখে অনেক সময় ট্রাফিক সার্জেন্টরা গাড়ি থামিয়ে আমাদের তুলে দেন। বেশি কষ্ট হয় নারীদের। তারা উঠতেই পারে না। নিকেতনে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ করেন মাহবুবুর রহমান। সকালে উত্তরা থেকে আসতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে তাকে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয়। তিনি বলেন, বাস তো আছে, কিন্তু সেগুলো মগবাজার, নাবিস্কোর দিক থেকেই ভরে আসে। ফলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোনো সময় সেটা দুই-আড়াই ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়। মিরপুর, গাবতলী, মোহাম্মদপুর এবং সাভার থেকে কালসী রোড সেনানিবাস ফ্লাইওভার হয়ে চলাচলকারী প্রজাপতি, তেঁতুলিয়া, মিরপুর লিংক, পরিস্থান, রবরব, বসুমতি, নূরে মক্কা, অছিম, আকিকসহ সব পরিবহনের বাসই ‘সিটিং সার্ভিস’ নামে চলছে। তবে কালসি পার হলেই দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে প্রায় প্রতিটি বাসে। নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড ও সাইনবোর্ড থেকে যাত্রাবাড়ী, মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে চলাচলকারী ঠিকানা, মৌমিতা, নীলাচল, লাব্বাইক, রজনীগন্ধা, মনজিল, অনাবিলসহ সব পরিবহনের বাস ‘সিটিং সার্ভিস’ হয়ে গেছে। সাইনবোর্ড এলাকায় লাব্বাইক পরিবহনের চালকের সহকারী মামুনের কথায় মনে হয়, এটাই এখন নিয়ম। ঢাকা শহরে এখন আর সিটিং আছে? সব বাসেই আঙ্গেমাঙ্গে যাত্রী ভরে। ভাড়াডা খালি নেয় সিটিংয়ের। একই কথা বললেন ঠিকানা পরিবহনের লাইনম্যান মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, সত্য কথা বলতে কি, সবই ‘ফিটিং’। খালি ভাড়াটা সিটিংয়ের নেয়। যাত্রী পাইলে সবখান থেইকাই তুইলা নেয়। এইদিকে সব কোম্পানি এমনেই গাড়ি চালায়। ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসে চড়ে বুধবার সাইনবোর্ড থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেল, প্রতিটি স্টপেজে থামছে বাসটি। পুরো বাস যাত্রীতে ঠাসা। তবে চালকের সহকারী বাড়তি ভাড়াই রাখছেন। সাইনবোর্ড এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মামুনুল হক রাজু বলেন, এরা সিটিং নাম নেয় শুধু বেশি ভাড়া নেওয়ার জন্য। সবাই ঠেসে ঠেসে যাত্রী নেয়।

 শুধু দুয়েকটা পরিবহন একটু রেহাই দেয়। আজিমপুর থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী মিরপুর লিংক, মিরপুর মেট্রো সার্ভিস, বিহঙ্গ, আশীর্বাদ, সেফটি, উইনার, বিকাশ, ভিআইপি, দেওয়ান, রমজান, বিকল্প পরিবহনসহ সব গাড়িই ‘সিটিং সার্ভিস’ হিসেবে চলে। এর আগে আজিমপুর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত চলাচলকারী ২৭ ন¤॥^র বাসগুলো ‘লোকাল’ হিসেবে চললেও এখন সেটা বন্ধ। সেই পরিবহনের কিছু বাস ‘ভিআইপি’ পরিবহনের ব্যানারে চলছে। তবে ভিআইপি ছাড়া সব গাড়িতেই দাঁড়ানো যাত্রী বহন করা হয়। মিরপুর মেট্রো সার্ভিসের একটি বাসে আজিমপুর থেকে শ্যামলী পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেছে, গাড়িতে সব সময়ই দশ থেকে বারোজন দাঁড়ানো যাত্রী নেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে ওই বাসের চালক কামাল হোসেন দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের জন্য ছাড় থাকায় দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে হয় তাদের। রোকেয়া সরণি হয়ে চলাচলকারী বিকল্প অটো, মিরপুর লিঙ্ক, বিহঙ্গ, ইউনাইডেট, সময় নিয়ন্ত্রণ, দিশারী, বেস্ট, স্বাধীন, হিমাচলসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলাচল করে। এ কারণে সকালে অফিসগামী যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়ার লোকজন বেশি বিপাকে পড়েন বলে জানান শ্যাওড়াপাড়ার বাসিন্দা আবিদা সুলতানা। তিনি বলেন, একে তো তারা সিট পায় না, আবার নারী হলে তাদের গাড়িতেই তুলতে চায় না। আর মহিলাদের বাসে না তুলতে নিষেধ করে দেয় কিছু পুরুষ যাত্রী। কারওয়ানবাজার, ফার্মগেইট এলাকা থেকেও ঘরমুখো যাত্রীদের একই রকম সঙ্কটে পড়তে হয় বলে জানালেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে সাদেকুর রহমান। তিনি বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহনের এই দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে ‘সিটিং সার্ভিস’।

 তিনি বলেন, এমনিতেই রাস্তায় গাড়ি কম। তারপরও যেগুলো ছিল, সেসব ‘সিটিং সার্ভিস’ করে ফেলায় যাত্রীদের চলার সুযোগ আরও কমেছে। গত এক-দেড় বছরে এদিকে চলাচলকারী বেশিরভাগ বাস ‘সিটিং’ নাম নিয়ে নিয়েছে। গাড়িতে উঠতে গেলে ধাক্কা মারে, খারাপ আচরণ তো করেই। বাড়তি ভাড়া নেওয়াসহ যাত্রী হয়রানির নানা অভিযোগের কারণে বাস মালিকরা ২০১৭ সালের এপ্রিলে ‘সিটিং সার্ভিসে’ বাস চালানো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর মে মাসে বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান শুরু করলে অনেক মালিক সড়কে বাস নামানো বন্ধ করে দেন। ওই অচলাবস্থার মধ্যে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে হাতহাতির ঘটনাও ঘটে বেশ কয়েক জায়গায়। পরে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেয় বিআরটিএ। ঢাকায় ‘সিটিং সার্ভিস’ বাস চলবে কিনা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তখন আট সদস্যের একটি কমিটি করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সেপ্টেম্বরে ওই কমিটির প্রতিবেদনে ‘সীমিত আকারে’ সিটিং সার্ভিসের বাস রাখার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ২৬টি সুপারিশ করা হয় সেখানে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিটিং সার্ভিসের মাধ্যমে দীর্ঘদিন চলাচল করে যাত্রীরা ‘অভ্যস্ত’ হওয়ায় এবং মালিকরা সিটিং সার্ভিস পরিচালনায় ‘স্বাচ্ছন্দ্য’ বোধ করায় সিটিং সার্ভিস এখন সময়ের চাহিদা। কোন কোম্পানির কতগুলো গাড়ি সিটিং, কতগুলো নন-সিটিং চলাচল করবে, তা ঠিক দেওয়ার দায়িত্ব আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি হাতে দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। এরপর ২০১৮ সালের মে মাসে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’। সেখানে বলা হয়, ঢাকার ২১টি রুটের এক হাজার ৫৩টি বাসের ওপর জরিপ চালিয়ে তারা দেখেছে, ৯৬ শতাংশ গাড়িই ‘সিটিং সার্ভিস’ হিসেবে চলাচল করছে। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বৃহস্পতিবার  বলেন, গত এক বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কারণ যাদের আইনের প্রয়োগ করার কথা তারা ঠিকমত তা করছে কি না তার প্রতিফলন আমরা দেখছি না। এজন্য পরিবহন মালিকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

 এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গুলিস্তান-বিমানবন্দর পরিবহনের চেয়ারম্যান বাবুল শেখ বলেন, নিজেদের সুবিধার জন্যই তারা নিজেদের বাসগুলো ‘সিটিং সার্ভিস’ করে ফেলেছেন। সিটিং সার্ভিসে না চালালে ঠিকমতো ভাড়া আদায় করা যায় না। দেখা গেছে, বনানীর ভাড়া দিয়ে অনেকে এয়ারপোর্ট চলে যায়। ঠিকানা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিপন মোল্লা দাবি করেন, ‘চালকদের অত্যাচার’ থেকে বাঁচতে তারা ‘সিটিং সার্ভিসে’ গাড়ি চালান। তার অভিযোগ, ‘সিটিং’ করার পরও অতিরিক্ত লাভের আশায় চালকরা দাঁড়ানো যাত্রী নেয়। তিনি বলেন, লোকাল দিলে ওরা প্রতিটা স্টপেজেই দাঁড়াবে, যেতে দেরি করবে। সার্ভিসটা ভালো করার জন্যই সিটিং সার্ভিস করা হইছিল। এতে মালিকদের কোনো লাভ নেই। কিন্তু আমরা তাদের কন্ট্রোলে রাখতে পারি না। তাদের নির্দেশনা দেওয়া আছে তারা সিটিং চালাবে। কিন্তু ওরা বেশি ভাড়ার লোভে ‘সিটিং’ রাখে না। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ  বলেন, ‘সিটিং সার্ভিস’ বিষয়টিই অনুমতিবিহীন। এটাকে আমরা একটা নিয়মের মধ্যে আনতে চেয়েছিলাম। আমরা একটি কমিটি করে কিছু সুপারিশও করেছি। সেটা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। কেন তা হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি কেউ। বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব-ই-রব্বানী বলেছেন, সিটিং সার্ভিসের নামে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবস্থা নেয়। অভিযোগ না পেলে তাদের করার কিছু থাকে না। আর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম  বলেন, তারা বিষয়টি ‘দেখছেন’। তিনি বলেন, সব সিটিং হয়ে লোকজন যাবেটা কোথায়। আমাদের আইনে যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আছে, এদের বিষয়ে তা নেওয়া হবে। এটা নেওয়া হচ্ছেও। অবৈধভাবে কেউ কিছু করতে পারবে না।