অবসরপ্রাপ্তরা কি অবহেলিত...

অবসরপ্রাপ্তরা কি অবহেলিত...

 প্রফেসর মোঃ খালিকুজ্জামান চৌধুরী : চাকরির মেয়াদ শেষ হলে চাকরিজীবীদের অবসরে যেতে হয়। চাকরির সময়সীমা শেষ হলেও কেউ কেউ কর্মক্ষম ও কাজে আগ্রহী থাকেন, তারপরেও অবসরে যেতে হয় কারণ বিধি পরিপন্থী কাজ করা যায় না। যার শুরু আছে তার শেষও থাকবে - এটাই বাস্তবতা। তাই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মেয়াদ শেষে চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং বিধি অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক। আমাদের এই গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবছর বিধিমোতাবেক শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এটা অনস্বীকার্য, আজ যারা অবসরজীবনে আছেন, তারা তাদের কার্যকালে স্ব-স্ব অবস্থানে কর্মরত থেকে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রেখে গেছেন। তারা বয়োজ্যেষ্ঠ। বয়স বৃদ্ধির কারণে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অবসর গ্রহণ করতে হয়েছে তাদের। তারা সকলের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার যোগ্য। অবসর জীবনে মানুষের সাহচর্য-সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সৌজন্যমূলক আচরণের প্রত্যাশা তাদের থাকবে। তাদের প্রতি ক্ষমতাসীন সরকারের সুদৃষ্টির প্রত্যাশা থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু কতটুকু মিলছে অবসরভোগীদের প্রাপ্তি আর অবসর জীবনে তারা কেমন আছেন- এসব নিয়ে কেউ কি একটু ভাবেন? উত্তরটি আমার জানা নেই। তবে আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের এই লেখায় কিছু প্রাসঙ্গিক কথা বলতে চাই।

মূল্যবোধ তথা অবসরপ্রাপ্তদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ও মানসিকতার বিষয়টি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যবধান এবং এই ব্যবধান বাড়ছে বৈ কমছে না। শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আগের মতো আর নেই। এটাতো হৃদয়ের ব্যাপার। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আধার মানুষের হৃদয় ভুবনটি ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে এর অভাব বা ঘাটতি যা মোটেই সুখকর নয়। ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ও সৌজন্যমূলক আচরণও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। সৌজন্যমূলক আচরণের পরিবর্তে কখনো কখনো করা হচ্ছে অসৌজন্যমূলক আচরণ যা মনোবেদনার কারণ ঘটাচ্ছে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে। কথাটি হলো- ‘চবড়ঢ়ষব ড়িৎংযরঢ় ঃযব ৎরংরহম ংঁহ.’ কথাটি সত্য। পাশাপাশি এটিও সত্য, জরংরহম ঝঁহ সব সময় ৎরংরহম না থেকে এক সময় ঝবঃঃরহম ঝঁহ হয়ে যায়। আজ যারা কর্মরত আছেন, তারাও একদিন চাকরি শেষে অবসরে যাবেন। কিন্তু কেউ কেউ যেন ভুলেই যান এই সত্যটি। তাদের আচরণ ও কর্মকান্ড দেখে মনে হয় তারা আমৃত্যু চাকরিতে বহাল থাকবেন-অবসরে যাবেন না কখনো।

চাকরিতে বয়স বৃদ্ধি তথা জ্যেষ্ঠতার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে, দক্ষতা বাড়ে, অর্জিত হয় নতুন নতুন অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতার ভান্ডার হয় সমৃদ্ধ। জ্ঞানতো সীমাহীন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করলেও বলা যাবে না জ্ঞানার্জন শেষ হয়েছে- কোনো কিছুই অজানা নেই। তবে যিনি সাফল্যের সঙ্গে চাকরিজীবন শেষ করে অবসরে চলে গেছেন, তার জ্ঞানের পরিধি বেড়েছে বলা যাবে। চাকরি জীবনে তাকে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে এবং তিনি ধাপে ধাপে অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত হয়েছে জ্ঞান। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ব্যাপারটিতো আলাদা কারণ এটি শুধু অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই কাজটিতো সহজ নয়। জনসম্পদে পরিণত করার কাজটি দীর্ঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল ও কঠিন। বিভিন্ন পদে চাকরি শেষে আজ যারা অবসরে আছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের সম্পদ। তারা প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং সর্বোপরি অভিজ্ঞ। অভিজ্ঞ সেবার বিকল্প নেই। অবসর গ্রহণের পর পুনরায় কাজে আগ্রহী কর্মক্ষম অবসরপ্রাপ্তরা ঘরে বসে সময় কাটাতে চান না। তারা চান কাজের মধ্য দিয়ে তাদের সময় কাটাতে, কিছু উপার্জন করতে এবং কাজের মাঝে আনন্দ খুঁজে পেতে। তাদের কাজের সুযোগ দিলে অবসর জীবন হয়ে উঠবে কর্মমুখর। অন্যদিকে অভিজ্ঞ সেবা দ্বারা দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। জাতীয় উন্নয়নে আরও অবদান রাখতে পারবেন তারা। পুনরায় কাজে আগ্রহী কর্মক্ষম অভিজ্ঞ অবসরভোগীদের সংখ্যা খুব বেশি নেই আমাদের দেশে। সদিচ্ছা থাকলে তাদের সেবাদানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু সেই সুযোগের তো বড়ই অভাব! চুক্তি ভিত্তিতে হোক আর যে ভিত্তিতেই হোক, খুব কম সংখ্যক লোক অভিজ্ঞ সেবাদানের সুযোগ পান আমাদের এখানে। আবার নিয়োগ বা কাজের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম - দুর্নীতি ও দলীয়করণের দৌরাত্মটাই থাকে বেশি।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, ইউরোপের দেশসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে অভিজ্ঞ সেবা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সেবাদানে আগ্রহী কর্মক্ষম অবসরপ্রাপ্তদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত অবসরপ্রাপ্তরা কাজের মধ্য দিয়ে তাদের সময় ব্যয় করেন। আয়-উপার্জন হয়, আবার দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন তারা। অবসর জীবন তথা বৃদ্ধ বয়সেও কাজ করা যায় এবং কাজের মাধ্যমে সম্মান অর্জন সম্ভব। ইংরেজ কবি টেনিশন তার টষুংংবং কবিতায় বলেছেন, ‘ঙষফ ধমব যধং রঃং ঃড়রষ ধহফ যড়হড়ঁৎ.’ কবি যথার্থই বলেছেন। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের চিত্রটা ভিন্ন। এ দেশে অবসরভোগী ও বৃদ্ধদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী-মানসিকতা তেমন ইতিবাচক নয়। এখানে তাদের দিকে দৃষ্টিই দিতে চান না কেউ কেউ। তাই অভিজ্ঞ সেবাদানের সুযোগ পাওয়া লোকের সংখ্যা অতি নগণ্য। ‘যতই কর্মক্ষম, দক্ষ আর অভিজ্ঞ হোক, অবসরপ্রাপ্তদের কোনো কাজে নিয়োগ নয়, সেবাদানের সুযোগ নয়’- এই নীতিটাই লক্ষ্য করা যায় যার মধ্য দিয়ে প্রতিফলন ঘটে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর। অবসর গ্রহণের কারণে শুধু সেবাদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত নয়, অন্যান্য সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন অবসরভোগীরা। এমনকি সকল শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গৃহনির্মাণ কার্যে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পান না তারা। গৃহনির্মাণ খাতে ব্যাংকের ঋণদান কর্মসূচির আওতায় ঋণ না পাওয়ার একমাত্র কারণ চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ। অর্থাৎ অবসরভোগীদের জন্যই ব্যাংকের দরজা বন্ধ!

সরকার অবসরপ্রাপ্তদের কোন্ দৃষ্টিতে দেখেন সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছিলাম আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এ পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। সরকার পরিবর্তন ঘটেছে বারবার। কোন্ সরকারের আমলে কতটুকু পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্তরা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। পর্যবেক্ষণে সরকারের সুদৃষ্টির অভাবটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবসরপ্রাপ্তরা এক সময় স্ব-স্ব অবস্থানে কর্মরত থেকে সেবাদান করেছেন, জাতীয় উন্নয়নে অবদান রেখেছেন- এ সব ভাবেন না সরকার। অতীত নিয়ে মাথাব্যথা কেন আর অবসরপ্রাপ্তদের কথা ভেবেইবা কি লাভ? তারা তো বর্তমানে সরকারের কোনো কাজে আসছে না। সরকারের আচরণ ও কর্মকান্ডে এরূপ মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটতে দেখেছি আমরা। কোনো কোনো সরকারের আমলে অবসরপ্রাপ্তদের মূল্যায়ন নয় বরং অবমূল্যায়ন করা হয়েছে যা বেদনাদায়ক।

পণ্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবন-জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে ওঠায় সরকার কখনো কখনো কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নতুন পে-স্কেল প্রদান করেছেন, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের মাসিক পেনশনও বৃদ্ধি করা হয়েছে কিন্তু এই বৃদ্ধির হারটা নগণ্য যা সম্মানজনক নয়। বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে অবসরভোগীদের ব্যবধানটা বেশ বড়। তথ্যসূত্রে এমনটিও জানা গেছে, চুড়ান্ত পর্যায়ে বৃদ্ধির হার অনুমোদনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অবসরভোগীদের জন্য নির্ধারিত বর্ধিত পেনশন পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। সেই পুনঃনির্ধারণে কাটছাঁট করে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বর্ধিত অঙ্ক। অবসরপ্রাপ্ত পেশনভোগীদের ক্ষেত্রেই সরকার এতটা নির্দয়-নিষ্ঠুর কারণ তারাতো চাকরিতে নেই, কোনো কাজেও লাগছে না তাদের।

তাই অবমূল্যায়ন বা যা-ই করা হোক, কোনো প্রতিবাদ হবে না। অবসরপ্রাপ্তদের প্রতিবাদের ভাষা বা সাহস কোনোটাই নেই!
পরিশেষে বলব, মূল্যবোধের বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়। মূল্যবোধ আক্রান্ত হয় এমন কাজ হতে বিরত থেকে ভালো আচরণ ও কর্মকান্ডের দ্বারা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা উত্তম। শ্রদ্ধা-ভালোবাসা একতরফা হয় না। এটি পারস্পরিক ব্যাপার। শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধালাভ আর ভালোবাসার বিনিময়ে পাওয়া যায় ভালোবাসা। আজ যারা বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন, তারাও একদিন অবসরে যাবেন। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার প্রত্যাশা তাদের থাকবে। প্রত্যাশা থাকবে সাহচর্য-সহানুভূতি-সহমর্মিতা এবং সৌজন্যমূলক আচরণের। বিষয়টি মাথায় রেখে পথ চলাটাই শ্রেয়। আর যখন যে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসুক, সে সরকার কোনো বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয়, সরকার সকলের। অবসরপ্রাপ্তরা বিচ্ছিন্ন কেউ নন। তাদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি কাম্য।             
লেখকঃ অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত)
০১৭১৮-৭৪৭৪৪১