অবশেষে ডাকসু’র কাছে ফিরে যাওয়া

অবশেষে ডাকসু’র কাছে ফিরে যাওয়া

মোহাম্মদ নজাবত আলী : অবশেষে স্বপ্নের ডানা মেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তফশিল ঘোষণা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আগামী ১১ই মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রাচ্যের কক্সফোর্ড নামে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সলে। দীর্ঘ পরিক্রমা ও সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের উত্থান, শিক্ষা, সংস্কৃতি আন্দোলন সংগ্রামে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কালের সাক্ষী হিসেবে নিরবে দাঁড়িয়ে আছে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান ও পরবর্তি স্বাধীন বাংলাদেশে ৯০দশক পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক কথায় বলা যেতে পারে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ও নেতৃত্ব তৈরির মূল সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নানা কারণে দেশের অন্যান্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ ছিল প্রায় তিন দশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে দীর্ঘদিন থেকে সমাজের বিভিন্ন মহল দাবি তোলে। তাছাড়া বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনগুলো ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে তারা নানা সময় সরব ছিল। ডাকসুকে বলা হয় দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট ভবিষ্যত জাতীর নেতৃত্ব তৈরির মূল কেন্দ্র। স্বধীনতার ৪৭ বছরের ইতিহাসে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র সাতবার। অথচ বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল একটি গণতান্ত্রিক চেতনা ছিল ডাকসু। বিগত ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। এ দীর্ঘ সময় ডাকসুর কোন কার্যক্রম ছিল না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ডাকসু নির্বাচনের বিষয়টি আবারো আলোচনায় আসে। যার ফলে ১০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল তেরোটি ছাত্র সংগঠনের সাথে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা মত বিনিময় করেন।

পাকিস্তান আমলে আমাদের এ পূর্ব বাঙলায় স্বল্পসংখ্যক যে কয়েকটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ছিল।  আজ যারা জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মন্ত্রী, এমপি হয়ে প্রথম সারিতে আছেন , তারা প্রায় সবাই ছাত্র সংসদের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। ’৬৯’র গণঅভ্যূত্থানে সে উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছিলেন তারুণ্য শক্তির প্রতীক। আজ তাদের মধ্যে অনেকেই মধ্যম ও প্রথমসারীর নেতার আসনে আসীন। এ ধারা অব্যাহত ছিল স্বাধীনতার পর পর্যন্ত। তারপর এক সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কেন বন্ধ হয়ে গেল সেটা আমাদের কাছে আজও অজানা। তবে ৯০ দশকের সামরিক শাসনামলে ছাত্র সংসদ ছিল। সে সময় বিভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী ছাত্ররা একতাবদ্ধ হয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। সে সময় সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকসু) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চাকসু) সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা দলমত নির্বিশেষে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জীবন বাজি, লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সফল হন। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে তরুণরা নেতৃত্ব দেয়ার মতো গুণাবলী অর্জন করেন।
 
ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারলে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে, সুস্থ ধারার রাজনীতির পথ  তৈরি হবে কিভাবে। কিভাবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতে দেশে নেতৃত্ব দেয়ার মতো দক্ষতা ও গুণাবলী অর্জন করবে। আজ যদি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ থাকতো তাহলে তাদের চিন্তা ভাবনায় থাকতো তরুণদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো গুণাবলী অর্জন করতে হবে। বিভিন্ন দল উপদলের তরুণদের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি গড়ে উঠতো। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ তৈরি হতো। আজ দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুস্থ রাজনীতির চর্চা নেই। অসুস্থ রাজনীতি আজ তরুণদের গ্রাস করছে। ফলে তারা নানা দিক থেকে বিপথগামী, পথভ্রষ্ট। প্রতিযোগিতামূলক সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অনুপস্থিতিতে কিছু সংখ্যক তরুণরা ভুল পথে ধাবিত হচ্ছে। অথচ তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের মধ্যে যে উদ্দীপনা চেতনা রয়েছে তা বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন তাদের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এজন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে ডাকসুর কাছে, ফিরে যেতে হবে রাকসুর কাছে, চাকসুর কাছে। আমাদের ফিরে যেতে হবে জবির কাছে, ফিরে যেতে হবে জাবির কাছে যেখানে ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি হয়। ছাত্র সংসদ না থাকলেও যেখানে সারা দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মানববন্ধন করে জঙ্গিবাদকে ও প্রত্যাখ্যান করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন- সেখানে তাদের নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ কেন দেয়া হয়নি। পরিশেষে বলতে চাই, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ ধারার রাজনীতির চর্চাও চালু করতে সন্ত্রাস চাঁদাবাজী, জঙ্গিবাদমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ গড়ে তুলতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ডাকসুর কাছে। কেননা নিয়মিত ছাত্র সংসদ চালু থাকলে জয়ী হওয়ার আশায় তারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী সহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবে। ডাকসু নির্বাচন হোক সবদলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ।
লেখক: শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১