অচলায়তন ভাঙতে হবে

অচলায়তন ভাঙতে হবে

আতাউর রহমান মিটন: একদিকে বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় ভরপুর, অন্যদিকে কোন বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হলো। বরাবরের মতই পরিবার-পরিজনদের নিয়ে ঈদ উৎসব পালনে ঢাকা শহর ছেড়ে গেছে বেশিরভাগ মানুষ। ঈদে ফাঁকা ঢাকা। ফার্মগেট থেকে গাড়িতে ৪ মিনিটে পৌঁছা গেছে মতিঝিলে! আহা! এমন যদি সব সময় থাকত! কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই সপ্তাহে ততটা না হলেও আগামী শনিবার থেকেই ঢাকা ফিরে পাবে তার চেনা চেহারা। তখন ফার্মগেট থেকে মতিঝিল ২ ঘন্টায় পৌঁছা যাবে কি না কোন নিশ্চয়তা থাকবে না। ভেলকি বাজির শহর এই ঢাকা! ঢাকা শহরের জ্যাম নিয়ে নতুন করে বলার বা লেখার কিছু নাই। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, এই শহরের বর্তমান গতি ঘন্টায় ৭ কিঃমিঃ আগামী ২০২০ সালে তা নেমে আসবে ঘন্টায় ৪ কিঃমিঃতে। অথচ একজন মানুষের হাঁটার গতি এর চেয়ে বেশি। সাধারণভাবে একজন মানুষ ঘন্টায় ৬ কিঃমিঃ পথ হেঁটে অতিক্রম করতে পারে। এই যে স্থবির একটা শহর, অথচ সবাই সেখানে থাকবার ও বাস করার জন্য মরিয়া। সবাই অস্বস্তিতে কিন্তু কেউই এই শহর ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে পারেন না। নতুন যারা এই শহরে আসেন, তারা এসেই পেটের অসুখে পড়েন। রাজধানীতে পেট খারাপ হওয়া অর্থাৎ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। এখানে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে খাওয়ার প্রয়োজন হয়। আর পথের ধারের খোলা সেই খাবারগুলো সন্দেহাতীতভাবে নানা ধরনের রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হবার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে শরবত বা নানা ধরনের জুস যা আমরা সরাসরি খাই, তা আমাদের পেটের অসুখের বিরাট কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পথের ধারে খাবার বিশ্ব জুড়েই দারুণ জনপ্রিয়। খোদ আমেরিকা বা জাপানেও পথের ধারে ছোট ছোট খাবারের ভ্যান বা ষ্টল রয়েছে যেখান থেকে মানুষ নির্ভাবনায় খাবার কিনে খায়। কিন্তু সেসব খাবার নিয়ে কাউকে উদ্বিগ্ন বোধ করতে হয় না। ঢাকার খাবারে নিরাপত্তার সেই আস্থা পুরোপুরি অনুপস্থিত। এর জন্য খাবার বিক্রেতা, জনস্বাস্থ্য তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত দপ্তরসমূহ এবং ভোক্তা সকলেই কমবেশি দায়ী। একদিকে আমরা যেমন জানিনা কিভাবে খাবার দূষিত হয় বা ব্যাকটেরিয়া কোন পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে এবং বংশ বিস্তার করে, অন্যদিকে আমরা দূষিত জেনেও পথের ধারের খোলা খাবার অনায়াসেই খেয়ে চলেছি। ভোক্তার পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ নাই। একটা গা সওয়া ভাব সর্বত্র। আর তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কথা বলাই বাহুল্য। তারা শুধু মাসোহারা চেনে এবং সেটা ঠিকমত পাচ্ছে কিনা সেদিকেই যত খেয়াল! ক্ষতি প্রতিরোধ করার কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। সমন্বয়ের অভাবে বিচ্ছিন্নভাবে নেয়া শুভ উদ্যোগগুলিও শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয়। মিশে যায় গড্ডালিকায়! আমার প্রায়শঃই মনে প্রশ্ন জাগে, দেশের মানুষ সবাই সবকিছু জেনেও কেন প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না? অনিয়ম তো আমাদের চারপাশে হরহামেশাই ঘটছে। আমরা সবাই দেখছি, আমরা সবাই জানছি, কারা কি করে সব আমাদের জানা। কিন্তু আমাদের ঘৃণাটা কোথায়? খাবারের দূষণের মত আমাদের সমাজেও একটা দূষণের মহোৎসব চলছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এতটা নীচে নেমে গেছে যে এর চেয়ে আরও খারাপ কিছু হতে পারে কি না তা আমি কল্পনা করতে পারি না। এ কোন বাংলাদেশে আমাদের বসবাস!

রোজা ও ঈদের কারণে বাজেট নিয়ে তেমন কোন আলোচনার শোরগোল শোনা গেল না। সরকার ঘোষিত বাজেটের এক চতুর্থাংশ অর্থের কোন সংস্থান নাই, অর্থাৎ চার টাকার বাজেটে ১ টাকা আদৌ পাওয়া যাবে কি না তার কোনই নিশ্চয়তা নাই। এই অনিশ্চয়তার বাজেটের আকার বড় করে দেখিয়ে সরকার একটা বাহবা পেতে চাইছে। সরকারি দলের বন্ধুরা বলছেন, এর চেয়ে বড় আকারের বাজেট এর আগে বাংলাদেশে কখনও করা হয়নি। কথাটা সত্য। তবে এটাও সাথে সাথে মহা সত্য যে, এর চেয়ে বড় ধরনের ঘাটতি বাজেটও এর আগে কখনও করা হয়নি। সম্ভবতঃ সরকারি দলের বন্ধুদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে, পকেটে টাকা নাই তো কি হয়েছে, ফুটানি তো দেখাতেই হবে! ভোটের আগে এই ফুটানির মূল্য অনেক! আলোকজ্জ্বল রঙিন রঙ্গমঞ্চ যাদের মনোজগতে, চোখ ধাঁধানো ফুটানিতে তারা সহজেই মুগ্ধ হবে!

বলার অপেক্ষা রাখে না দেশে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। গরিবের চাল পাওয়া যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের ঘরে। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ ঘটছে লাগামহীন। মাদক স¤্রাটেরা গা ঢাকা দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে ভেবেছিলাম কিন্তু তাঁরা চলছে বুক ফুলিয়ে। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ স্থবির। তাহলে উন্নয়নের সুফলগুলো যাচ্ছে কোথায়? শুধু মেগা প্রকল্পগুলোই কি আমাদের উন্নয়ন সূচক? ঢাকায় মেট্রো রেল চালুই হলো না, এরই মধ্যে সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে ঢাকার পূর্বধারে (কুড়িল থেকে কাঞ্চন ব্রীজ পর্যন্ত) পাতাল রেল চালু করা হবে। ভাব দেখলে মনে হয় আমাদের দেশে টাকার কোন অভাব নাই কিন্তু বাস্তবে ঢাকার বিভিন্ন বস্তি ও ফুটপাতে কয়েক লক্ষ সুযোগ বঞ্চিত অসহায় মানুষ প্রতিদিন মানবেতর জীবন কাটায়। এবারের ঈদেও এদের অনেকেরই ভাগ্যে একটা নতুন কাপড় জোটেনি। টেলিভিশন প্রতিবেদনে দেখলাম পথের ধারে বাসকারী এক মা বলছেন, বাচ্চারা একটু ভাল খাবার খেতে চায়, কোথায় পাব? তাই ওদের সান্ত¡না দেবার জন্য একটু ভাল খাবার রান্নার চেষ্টা করছি। অথচ এই শহরটাই আমাদের তিলোত্তমা, এই শহরেই কয়েক হাজার কোটিপতির বাস!

অন্য সকলের মত আমিও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি কিন্তু সেই উন্নত দেশটা কার জন্য? উন্নয়ন বঞ্চিত মানুষগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার বদলে তাদেরই দেয়া পরোক্ষ করের পয়সায় ধনীদের সুরক্ষা দেয়ার আয়োজনটা আমার বিবেককে তাড়িত করে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জন্ম নেয়া দেশটা বঞ্চনাহীন নীতিতে পরিচালিত হবে সেটাই তো সকলের চাওয়া ছিল। মানুষ তো সেজন্যই জেগে উঠেছিল, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে’ শত্রুর মোকাবেলা করেছিল। দিনবদলের সেই লড়াইয়ে সেদিন সংখ্যায় বেশি ছিল এই সুবিধা বঞ্চিতরাই। দেশ স্বাধীনের পরে বদলে গেছে বহুকিছু। শুধু বদলায়নি বঞ্চনা। এখনও দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী সব চেয়ে কম খেয়ে, কম পরে, কম স্বাস্থ্য সুবিধা নিয়ে, বাকি সকলের জন্য পরিপাটি এক সমাজ গড়ে তোলায় অবদান রাখছে। পিছিয়ে পড়া এই মানুষগুলোই সংখ্যায় বেশি, তারাই বেশি পরিশ্রম করে অথচ সকলের চেয়ে বেশি অসম্মান তাদেরই। বক্তৃতায় সব সময় তাদের সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয় কিন্তু কথায় কথায় তারা রোগে মরে, উপরওয়ালাদের লাথি ঝাঁটা খেয়ে কোনরকমে বেঁচে থাকে। সমাজটা বদলাতে হবে। একটা নতুন সমাজ গড়ার জন্য আপোষহীন একটা রাজনৈতিক রূপরেখা, একটা বৈপ্লবিক কর্মসূচি প্রয়োজন। সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে তলায় ফেলে রেখে যারা আজ উঁচু তলায় বাস করার সিঁড়ি নির্মাণের মহাযজ্ঞে নেমেছেন, তাদের দুর্গে আঘাত হানতে হবে। লুটপাটকারীদের ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আমরা যেহেতু ভোটের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন চাই, যেহেতু একটা সশস্ত্র সংগ্রামের পথ আমরা গ্রহণ করিনি, তাই ভোটের রাজনৈতিক খেলাতেই মুক্তিকামীদের শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে হবে। ভোট বর্জন করাটা কোন কাজের কথা নয়। সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামী সংগঠকদের ভোটে দাঁড়াতে হবে, জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেদের অবস্থান ও কর্মসূচি স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। মার্কা নয়, নির্বাচন করতে হবে মানুষের গুণাগুণের ভিত্তিতে। ভাল মানুষ, গণ মানুষের পক্ষে যারা, তাদের ভোট দিতে হবে। একজন সৎ ও জনদরদী সংসদ সদস্য কখনই গরিবের চাল ব্যবসায়ীর ঘরে পৌঁছাতে দিবে না।

 তিনি একা না পারলে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। গণমাধ্যমের সহায়তায় সত্য প্রকাশ করবেন এবং জনগণকে সবকিছু জেনে বুঝে পরবর্তি সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবেন। আমি অনেক দিন ভেবেছি, কেন ভোটাররা সৎ মানুষকে ভোট দেয় না? কেন ভোট মানেই শেষ পর্যন্ত ‘টাকার খেলা’ হয়ে যায়? একজন ভোটার হিসেবে যখন ভাবি তখন মনে হয় ভাল মানুষেরা ভোটে না দাঁড়িয়ে ভুল করেছেন। আবার যখন একজন প্রার্থীর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবি তখন মনে হয়, ভাল মানুষের পক্ষে সমাজ নেই। সমাজ উল্টো পথে চলাটাকেই সঠিক মনে করে। এখানে সবাই ‘নগদ যা পাওয়া যায় তাই লাভ’ মনে করে। এই সমাজ ভাল মানুষকে ‘বাহবা’ দিবে কিন্তু ভোটে নির্বাচিত করবে না। ভাল মানুষের জায়গা এখন আর সমাজে নেই। সমাজের দর্শন হলো, একদল সব সময় তলায় থাকবে। কারণ একদল তলায় না থাকলে অপর দলের উপরে থাকার সার্থকতা থাকে না। তাই সমাজটাকে নিজেদের প্রয়োজনেই বিভক্ত ও বৈষম্যে পরিপূর্ণ করে রাখার আয়োজন সচেতনভাবে করা হয়ে থাকে। সমতা বা সাম্যবাদের চিন্তাটা এখানে সচেতনভাবেই বর্জন করা হয়। কোন কিছুতেই সমতার দর্শনকে মোকাবেলা করা না গেলে শেষ পর্যন্ত ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের পরাস্ত করার চেষ্টা করা হয়। আমি নির্বাচনের মাঠে এমন কথা বহুবার শুনেছি, ‘অমুক প্রার্থী খুব ভাল মানুষ কিন্তু উনি কম্যুনিষ্ট’। যেন কম্যুনিষ্ট হওয়াটাই রাজ্যের অপরাধ। একজন বিজ্ঞানমনস্ক, সমাজ সচেতন, জনদরদি, গরীব বান্ধব, সমতাকামী, সৎ মানুষ কেবল ‘কম্যুনিষ্ট’ পরিচয় থাকলেই ভোটের মাঠে তিনি পরিত্যাজ্য হয়ে পড়বেন কেন তা আমার জানা নাই। আমি অনেক ভেবেও এই রহস্যের কোন কিনারা করতে পারি নাই। আমজনতার বন্ধু, যোগ্য প্রার্থীরা কি তাহলে কখনই জনপ্রতিনিধি হবে না?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর রাশিয়ার চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘দয়া করে কোনো স্থায়ী জিনিস করা চলে না; বাইরে থেকে উপকার করতে গেলে পদে পদে তার বিকার ঘটে।’ পরিবর্তনটাও ঠিক তেমনি। বাইরে থেকে ওটা আমদানি করা যায় না। করলেও তা টেকে না। নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য যাঁরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করাটাকেই একমাত্র কর্তব্য জ্ঞান করেন তাঁরা সমাজের কল্যাণে মনোযোগ দেয়ার সময় পান না। তারা শুধু অপরের কথার মাঝেই ‘গোয়ার্তুমি’ খুঁজে পান, নিজেদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন ‘গোয়ার্তুমি’ দেখতে পান না। চিরকাল আমাদের এই দেশটা এই অচলায়তন মেনে নেবে না। দিন একদিন বদলাবেই। তবে একথা ঠিক, দয়া করে ভোটের রাজনীতি হবে না। পরিবর্তনের জন্য দরকার একটা বিপ্লবী চেতনা। দয়া করে ভিক্ষা দেয়া চলে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যত গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হয় সচেতনভাবেই। প্রত্যেক সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যে সমাজে মানুষ মানুষকে সম্মান করতে, প্রীতি দিয়ে গ্রহণ করতে পারবে না, সেই সমাজ মানুষের উপকার করতে অক্ষম। আমাদের সমাজ যতদিন নিজে থেকে সেটা অনুভব না করবে ততদিন রাজনীতির বিরাজমান দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা কঠিন হবে।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৭১১৫২৬৯৭৯