৭ই মার্চ মুক্তি সংগ্রামের অগ্নিশপথে ভাস্বর

 ৭ই মার্চ মুক্তি সংগ্রামের অগ্নিশপথে ভাস্বর

এড. মোঃ মনতেজার রহমান মন্টু : ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বৃটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান আলাদা হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন। সেই সময় শেখ মুজিবসহ ছাত্র নেতারা প্রতিবাদ করে। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরের শেষে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের পূর্ব বাংলায় আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ভূখা মিছিল বের করলে ১৪ অক্টোবর তাঁকে গ্রেপ্তার করে একটানা ২ বছর ৫ মাস জেলে আটক রাখে। ফলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব কারাগারে বন্দি থাকেন। এই বাংলা ভাষার জন্য তিনি ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি একটানা ১৩ দিন কারাগারে অনশন করার পর সন্ধ্যাবেলায় মুক্তি পান। এই ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে শহীদ হন।
১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পাকিস্তান গণপরিষদ নির্বাচনের জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ৩৪ বছর বয়সে কনিষ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ মুজিব। ওই নির্বাচনের পর বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য নব্য পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে পাকিস্তানি করার জন্য গণপরিষদে বিল নিয়ে আসে। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট এই বিলের বিরোধিতা করে শেখ মুজিব গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলেন, “স্পিকার মহোদয়, এই পরিষদ পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখতে চায়। আমরা বার বার দাবি জানাচ্ছি আপনারা বাংলা নাম ব্যবহার করুন। বাংলা নামের ইতিহাস আছে। আছে নিজস্ব ঐতিহ্য-ট্রাডিশন।’ কিন্তু শেখ মুজিবের এই বক্তব্য কর্ণপাত না করে, বাঙালিদের মতামত না নিয়ে, পূর্ব বাংলার নাম মুছে দিয়ে ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পূর্ব বাংলাকে সরকারিভাবে পূর্ব পাকিস্তান, জাতীয়তা পাকিস্তানি এবং প্রথম শাসনতন্ত্র কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালিদের তুমুল আন্দোলনের চাপের মুখে ওই বছরের শেষের দিকে সংবিধান সংশোধন করে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
পাকিস্তান সংবিধান রচনা হওয়ার পর রাজনীতি ঘোলাটে হতে থাকে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে শেখ মুজিব তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। ১৯৬২ সালে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ফের কারাবরণ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহেরে গোল টেবিল বৈঠকে ৬ দফা দাবি পেশ করেন এবং ৭ জুন বেশ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে এবং পরবর্তীতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্বে সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলে গোপনে আগরতলা সফর করে ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। ফলে ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে ১ নম্বর আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিভক্তির অজুহাত তুলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হলে আবারও আটক হন তিনি। এই মামলায় ক্যান্টনমেন্টে প্রহসন বিচার করে ফাঁসির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বাংলা এবং বাঙালি নিষিদ্ধ করার কারণেই ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ জনতার সামনে প্রতিশোধমূলক শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন এবং বলেন, “বাংলার মানুষের পক্ষ হতে আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তান নাম বদলে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’ হবে।” তখনই পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
দুই পাকিস্তান মিলিয়ে জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৬৯টি আসন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যার ১৬৭টিতেই জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। আবার প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টিতেই জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান সংবিধান মোতাবেক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা দিলে সারা বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং তা পালিত হয়। তিনি অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের প্রতি দাবি জানান। দাবি না মানায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ডাক দেন। ওই দিন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে স্বাধীনতার ডাক দেন। যদি কোনো কারণে ৭ই মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হতো, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চের পরিবর্তে ৭ই মার্চেই হতে পারতো। কেননা তিনি তাঁর ভাষণে বলেছেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা সবকিছু বন্ধ করে দিবে।” এবং ওই ভাষণে স্বাধীনতা এবং মুক্তির সংগ্রামে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের নাকের ডগার ওপর এই ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার সময় সেই মহাসমুদ্রের মাথার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার বার বার চক্কর দেওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থামাতে পারেনি এবং একটি বোমাও ফেলতে সাহস পায়নি। এমনকি ওইদিন তাঁকে গ্রেপ্তারও করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটি দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১৭ সালে জাতিসংঘ ইউনেস্কোর দি মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডব্লিউতে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। ৭ই মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যা বলেছেন, সত্য বলেছেন। তিনি মরেছেন বটে, কিন্তু তাঁর ভাষণ মরেনি। যুগ যুগ ধরে তাঁর এই ভাষণ বাজতেই থাকবে। বাঙালিরা মনে করে, ৭ই মার্চ ‘জাতীয় ভাষণ দিবস’ ঘোষণা করা হোক। এই দিনে সরকারি-আধা সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমে, অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার ও বাজানো হোক।  
 লেখক : আইনজীবী-কলামিস্ট
০১৭১১-৪২৫৯৮১