হাসকিং মিলের চালই পুষ্টিকর

 হাসকিং মিলের চালই পুষ্টিকর

আব্দুল হাই রঞ্জু : বৃহৎজনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টার যেন শেষ নেই। তবুও অনেক সময়ই সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না। ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংক ঋণ, মহাজনি ঋণ, কিম্বা এনজিও ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করে লোকসানে পড়লে সেসব ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে চাষীদের দেনাগ্রস্ত হতে হয়। এর ওপর আবার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত ঝড়, বৃষ্টি, আগাম বন্যার কবলে পড়ে অনেক সময়ই ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হয়। ভাগ্যগুণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে না পড়লে ভাল ফলন হয় কিন্তু সেখানেও বিপত্তি! কারণ বাড়তি ফলন হলেই এ দেশের কৃষকের কপাল পোড়ে। এমনি শত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কৃষক স্বাধীনতা উত্তর গত ৪৭ বছরে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য এনেছে। সরকারকেও এখন আর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে খুব বেশি চাল আমদানি করতে হয় না। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চাল থেকে চাহিদার সিংহভাগ অংশ পুরণ হয়। কিন্তু শংকার জায়গাটি হচ্ছে, সরকারের কৃষক বান্ধব বিরোধী সংগ্রহ নীতিমালার কারণে এখন কৃষকের স্বার্থ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মূলত সরকার ধান চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণভাবে ধান ও চাল সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫-১৬ হাজার চাল কল রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৯০-৯৫ ভাগই হাসকিং মিল। আর অবশিষ্টাংশ স্বয়ংক্রিয় রাইস মিল। যাদের সংখ্যা হাতে গোনা গুটিকতক। যার পরিমাণ গোটা দেশজুড়ে ৫/৬ শতের বেশি হবে না। অথচ এখন এই ৫-৬ শত অটোমেটিক রাইস মিলের উৎপাদিত চালে মোট চাহিদার প্রায় ৮০-৮৫ ভাগই পুরণ হচ্ছে। ফলে চালের বাজার এখন নিয়ন্ত্রণ করছে অটোমেটিক চাল কলগুলো। এ জন্য অটোমেটিক চালকলগুলোর অনুকূলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাই মূলত দায়ী। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছর বোরো ও আমন মৌসুমে আপদকালিন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে চাল ও ধান সংগ্রহ করে থাকে। সরকারের উদ্দেশ্য দু’টি। একটি হচ্ছে, সরকার চাল সংগ্রহ করলে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, আর অন্যটি হলো সরকারের আপদকালিন খাদ্য মজুদ গড়ে উঠবে। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি নিশ্চিত হলেও প্রথমটিকে নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এখন সরকারের খাদ্য বিভাগ চাল সংগ্রহের যে বিনির্দেশ নির্ধারণ করেছে, সে ধরনের চাল একমাত্র অটোমেটিক রাইস মিলে প্রস্তুত করা সম্ভব। যা হাসকিং মিলে প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। মান্ধাত্বা আমলের এ্যাংগেল বার্ক পদ্ধতির হলারে ধান ছাঁটাই করলে চাল ভেঙ্গে যায় এবং রাবার পলিশার না থাকায় চালের উপরিভাগের লাল অংশ পুরোটাই নির্মুল করা সম্ভব হয় না।

 অথচ সরকারের নীতিমালায় আছে, চকচকে, মরা ও ভাঙ্গা দানা মুক্ত চালই সংগ্রহ করতে হবে। যেহেতু এ ধানের চাল হাসকিং মিলে উৎপাদন করা সম্ভব হয় না, যেহেতু সরকার এখন অটোমেটিক চাল কলগুলোকে দিন রাতে এক সিফটের বদলে দুই সিফটের ছাঁটাই ক্ষমতা নির্ধারণ করে বরাদ্দকৃত চালের প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ বরাদ্দই হাতে গোনা গুটিকতক অটোমেটিক মিলে প্রদান করা হচ্ছে। আর অবশিষ্ট যৎসামান্য অংশ গোটা দেশের হাসকিং মিলগুলোর অনুকূলে প্রদান করা হচ্ছে। ফলে হাসকিং মিলগুলো সামান্য বরাদ্দের চাল পরিশোধে নিজেদের মিলে চাল উৎপাদন না করে অটোমেটিক মিল থেকে চাল কিনে এনে চুক্তিকৃত চাল সরকারি গুদামে জমা দিচ্ছে। ফলে খাদ্য বিভাগের প্রশান্তি হচ্ছে, উন্নত মানের চাল কেনা হচ্ছে। যা খাদ্য বিভাগের বিনির্দেশ অনুযায়ীই হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। কারণ গুটিকতক অটোমেটিক রাইস মিল নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে অনেকটা সিন্ডিকেটের মতো কম দামে ধান কিনে থাকে। ফলে ধান চাষীদের ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। আর আগে যখন হাসকিং মিলের চাল সংগ্রহ করা হতো, তখন সব হাসকিং মিল চালু থাকায় ধান কেনার জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা বাজারে থাকতো। যার কারণে কৃষক ধানের ভাল দাম পেতো। এ ভাবেই ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ধান চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছে। উল্টো চাষীরা এখন ধান চাষ ছেড়ে দিয়ে পাট, তামাক, শাক-সবজি, ফলমূল ও ফুল চাষের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।

অথচ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর এই দেশে মানুষ বাড়ছে হু হু করে। বসতবাড়ি, নগরায়ন, হাটবাজার, অফিস-আদালত, উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ নানা কাজে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। কিন্তু আমাদের খাদ্য চাহিদা কমার বদলে শুধুই বাড়ছে। এ অবস্থায় ধান উৎপাদনের দিকে যেখানে বেশি করে নজর দেয়া দরকার, সেখানে ধান চাষের জমির পরিমাণ দিনে দিনে কমে আসছে। এ অবস্থা কোন ভাবেই সুখকর নয়। বরং এখন প্রয়োজন এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি ও দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তর করা। অবশ্য সরকার এ লক্ষ্য নিয়ে কাজও করছে। ইতিমধ্যেই স্বল্প সময়ের মধ্যে ধান উৎপাদনে প্রযুক্তিতে কৃষি বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করায় শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ধানের গড় উৎপাদন কমেনি বরং বেড়েছে। এসবই ভাল দিক, তবুও আবাদি জমি রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এমন এক সময় ছিল, যখন মানুষের দু’বেলা ভাতের যোগান দেওয়াই কঠিন ছিল। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের খাদ্যের সে সংকট এখন আর নেই। কিন্তু খাদ্য সংকট না থাকলেও পুষ্টি কর ঘাটতি এখন বড় সমস্যা। বাস্তব এ কারণে সরকার পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নানাভাবে বিতরণ করছে। অর্থাৎ পুষ্টিসমৃদ্ধ কার্ণেল চাল স্বাভাবিক চালের সঙ্গে মিশিয়ে নি¤œআয়ের মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে কিম্বা কমমূল্যে সরকার বিতরণ করছে।

 যেমন দেশের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ জেলা কুড়িগ্রামের উপজেলাগুলোর মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার সহায়তায় বিনামূল্যে পুষ্টি সমৃদ্ধ চাল বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রামের দুই উপজেলায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ১০টাকা মূল্যের চাল সুবিধাভোগী কার্ডধারীদের মধ্যে বছরের ৫ মাস বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারের এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সরকার একদিকে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ করছে, অন্যদিকে বৃহৎজনগোষ্ঠীর খাবার চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে পশু-পাখীর খাবারে পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করছে। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। এক সময় ঢেঁকিতে ধান ছাঁটাই করে সে চাল খাওয়া হতো। তখন চালের উপরে আকাড়া লাল অংশটুকু থেকে যেত। যে চালে প্রচুর পরিমাণ পুষ্টিগুণ ছিল। এরপরে হাসকিং মিলে ধান ছাঁটাই করে সে চাল খাওয়া হতো। সে চালেও প্রচুর পরিমাণ পুষ্টিগুণ ছিল। এখন স্বয়ংক্রিয় চাল কলে রাবার পালিশার দিয়ে ঘষে মেজে চকচকে যে চাল প্রস্তুত করা হচ্ছে; সে চালে কোন পুষ্টিগুণ নেই। পুষ্টিগুণ থাকে চালের উপরিভাগে। যা রাবার পালিশার দিয়ে ঘষে মেঝে রাইস ব্রান বের করা হচ্ছে। সে রাইস ব্রান দিয়ে পুষ্টি সমৃদ্ধ দামি ভোজ্যতেল তৈরি হচ্ছে। সে তেল সাধারণ মানুষের কেনার সামর্থও নেই। আর অবশিষ্টাংশ পশু-পাখির খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে গোটা বৃহৎজনগোষ্ঠী এখন যে চকচকে চাল খাচ্ছে, প্রকৃত অর্থে সে চালে কোন পুষ্টিগুণ নেই।

বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে চালের উপরিভাগের পুষ্টিগুণ অক্ষুন্ন রেখে ধান ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য দেশের সকল হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়ন করে পলিশার ব্যতিত উন্নত প্রযুক্তির হাস্কার ব্যবহার করে ধান ছাঁটাই করে চাল প্রস্তুত করতে পারলে চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট হবে না এবং চালও ভেঙ্গে যাবে না। শুধু হাসকিং মিলেই নয়, প্রতিটি অটোমেটিক রাইস মিলেও পালিশারের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। শুধু মাত্র কালার শর্টার ব্যবহার করে মরা দানা বাছাই করতে হবে। আর উন্নত প্রযুক্তির হাস্কার ব্যবহার করলে চালের দানাও ভেঙ্গে যাবে না। তাহলে চাল দেখতেও ভাল হবে এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল ভোক্তারা খেতে পারবেন। এ জন্য সরকারের উচিত কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা হাসকিং মিলগুলোকে ন্যুনতম পর্যায়ে আধুনিকায়ন করতে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। তাহলে হাসকিং মিলে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে কর্মরত লাখ লাখ মহিলা, পুরুষ শ্রমিকের কাজের নিশ্চয়তা বিধানের পাশাপাশি কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘উত্তারাঞ্চলে অধিকাংশ হাসকিং মিল বন্ধ: কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত খবরের সূত্র ধরেই কৃষকের বাস্তব অবস্থা এবং ভোক্তার স্বার্থ কি কি কারণে ক্ষুন্ন হচ্ছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।পরিশেষে শুধু এটুকুই বলবো, কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। সেই কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তনে সময়োপযোগী বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কারণ কৃষকের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে কৃষি তথা দেশের সমৃদ্ধি কশ্মিনকালেও অর্জন করা সম্ভব হবে না। অথচ আমরা স্বপ্ন দেখছি, মধ্যম আয়ের দেশ বিনির্মাণের। হয়তো কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হলে, এ দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করাও সম্ভব হবে। অন্তত সরকারকে কৃষকের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে ধান বেচা কেনায়-বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে হয়ত কৃষকের উন্নয়নের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তোলা সম্ভব হবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮