হজ-ওমরার বিধান

 হজ-ওমরার বিধান

মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ : হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। হজ অর্থ ইচ্ছা বা অভিপ্রায় ইত্যাদি। হজ হলো যৌগিক ইবাদত অর্থাৎ আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ইবাদত। হজের অপর নাম ‘মানাসিক’। হজের কার্যক্রমকে মানাসিক বলা হয়। বিশুদ্ধ মতে হিজরতের পর নবম হিজরীতে হজ ফরজ হয়। এ বিষয়ে আরও ৪টি মতামত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা) শেষ বছর একবার মাত্র বর্তমান পদ্ধতিতে হজ করেছেন। পূর্বের নিয়ম অনুসারে হিজরতের পূর্বেও তিনি হজ করেছেন। তিরমিজি শরীফে যাবের (রা:) হতে বর্ণিত হাদীসে হিজরতের পূর্বে নবীজী দুবার হজ করেছেন বলে উল্লেখ আছে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল আছীর (রহ) হিজরতের পূর্বে প্রতি বছর নবীজী হজ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওজী বলেন হিজরতের পূর্বে নবীজীর হজের সংখ্যা অজ্ঞাত। তার মতে অনেকবার হজ করেছেন।

 সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। পূর্ববর্তী উম্মতের উপরও হজ ফরজ ছিল। (ইবনু হাজার আসকালানী (রহ))। অন্যদের মতে পূর্ববর্তী নবীদের উপর হজ ফরজ ছিল কিন্তু উম্মতের জন্য নফল ছিল। হজ ফরজ হলে বিনা ওজরে বিলম্ব করা ঠিক নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘‘আল্লাহ বলেন, আমি যে বান্দার শরীর সুস্থ রেখেছি এবং তার জীবন যাত্রায় সচ্ছলতা দান করেছি, এভাবে সে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার ঘরে আগমন করলো না, সে সুনিশ্চিত বঞ্চিত। (সহীহ ইবনু হিব্বান)। এ জন্য ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ হজ তাৎক্ষণিকভাবে আদায় করাকে ফরজ বলেছেন। অবশ্য ইমাম আবু হানিফা ইমাম শাফেয়ী হজ বিলম্বের সাথে আদায় করা জায়েজ বলেছেন। উভয় দলের মতের স্বপক্ষে হাদীস ও যুক্তি রয়েছে। তবে সবাই ফরজ হওয়ার সাথে সাথেই হজ পালন করা ভাল মনে করেছেন। মহিলাদের হজের জন্য মাহরাম সাথে থাকা বা স্বামীর সাথে থাকা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমাদ পূর্ব শর্ত মনে করেন। বুখারী ও মুসলিম এর একটি হাদীস থেকে জানা যায় যে, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন কোন পুরুষ যেন কখনো কোন মহিলার সাথে নির্জনে না হয়, আর কোন মহিলা যেন তার কোন মাহরাম সাথি ব্যতিত একাকী ভ্রমণ না করে। তখন এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসুল আমি তো অমুক অমুক যুদ্ধে নাম দিয়েছি, আর আমার স্ত্রী হজের জন্য বের হয়েছে।

 তখন রাসুল (সা:) বললেন, যাও তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে হজ কর।’’ তবে ইমাম মালিক বলেছেন, কোন মহিলার সঙ্গি বা সাথি একদল মহিলা হয় তাহলে হজ করবে। ইমাম শাফেয়ী (র) বলেন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত কোন মহিলা সঙ্গি সাথি হলে তার সাথে হজ করবে। আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদগণের মতে আগের জামানার মত হজের জন্য যাতায়াত কষ্টকর নয়। বরং অনেক সহজ অতএব কোন মহিলা জামায়াতের সাথে হজ করতে পারবে। তারপরও বলা যায় যে মাহরাম না পেলে যদি কোন মহিলা হজে যেতে না পারে তাতে কোন অসুবিধা নেই। যদি কোন ব্যক্তি হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বে ও হজ করতে পারেনি তার জন্য ওয়াজিব হলো অন্যকে প্রতিনিধি করে হজে পাঠান অথবা অছিয়ত করা। এরূপ হজকে বদলি হজ বলা হয়। বিশুদ্ধ মতে পুরুষের বদলি হজ মহিলাও করতে পারবে। অবশ্য ইমাম মালিক এবং  ইবরাহিম নখরীর মতে নিজে বেঁচে থাকা অবস্থায় নিজের হজ অন্যকে দিয়ে প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে করা না জায়েজ বলেছেন। তবে হজ আদায় করতে পারেনি এমন ব্যক্তি মারা গেলে তার পক্ষ হতে বদলি হজ করতে কার কোন আপত্তি নেই। নিজের আদায় করেছেন এমন ব্যক্তির মাধ্যমে বদলি হজ করান উত্তম। নিজে হজ না করে অন্যের বদলি হজ করাকে আহনাফদের মতে মাকরুহ তবে জায়েজ। আর ইমাম শাফেয়ী, ইসহাক ও আওযায়ী নিজের হজ আদায় না করে অন্যের বদলি হজ করাকে না জায়েজ বলেছেন। অন্যান্যরা যথার্থ ইমাম মালিক ও আহমাদ যায়েজ বলেছেন। হজ সামাজিক কাজ দেখাদেখি করে সবাই হজের ফরজ ওয়াজিব পালন করে থাকেন। তবে কমপক্ষে প্রত্যেক ইবাদতের ফরজ ওয়াজিব সম্পর্কে জানা আবশ্যক।

হজের ফরজ ৩টি ঃ (১) ইহরাম বাঁধা। পুরুষের জন্য সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরা, নিয়ত করা ও তালবিয়া সশব্দের পাঠ করা। মহিলাদের জন্য শুধু নিয়ত করা ও নি:শব্দে তালবিয়া পাঠ করা। (২) ৯ই জিলহজ আরাফায় অবস্থান করা। (৩) ১০, ১১, ১২ যে কোন ১ দিন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা। হজের ওয়াজিব হলো : (১) ৯ই জিলহজ রাতে মুযদালফায় অবস্থান করা। (২)  মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা। ১০ তারিখে শুধু বড় শয়তানকে এবং ১১, ১২ তারিখে তিন শয়তানকে কঙ্কর মারা। প্রতিবার ৭টি করে। (৩) কিরান ও তামাত্তো হাজির জন্য কুরবানী করা (৪) চুল কামান বা ছাঁটা। (৫) সাফা-মারওয়া সায়ী করা কমপক্ষে ৪ চক্কর। অবশিষ্ট ৩ চক্কর না করলে ৩টা ফিৎরা দিতে হয়। (৬) বহিরাগত হাজিদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা। মহিলার যদি মাাসিক হয় তাহলে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয় না। (৭) ওয়াজিব পালনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। যে কোন ওয়াজিব বাদ দিলে অতিরিক্ত কুরবানি দিতে হবে। একাধিক ওয়াজিব বাদ পড়লে একাধিক কুরবানি করতে হবে। হজের সুন্নাত গুলি মুয়াজ্জিমের নিকট থেকে জেনে পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশ মত হজ পালন করলে তবেই তাকে মাবরূর হজ বলা হয়। (কুরতুবি (রহ)। ইবনু আরবীর মতে যে হজের পরে হাজি আর কোন গুনাহ করে নাই সে হজ হলো মাবরুর হজ।

 হাদীসে হজের সময় খাদ্য দান, উত্তম কথা বলা, সালামের প্রচলন অটানকে মাবরুর হজ বলা হয়েছে। ইবনু খালুবিয়া (র) বলেন মাবরুর হজ হলো মকবুল হজ মাবরুর বা মকবুল হজের বিনিময় হলো জান্নাত। (বুখারী, মুসলিম)। সামর্থ্যবানদের উপর জীবনে একবার উমরা করা সুন্নাত। ইমাম মালেক (র) ও শাফেয়ী ওমরাকে ফরজ বলেছেন। ইমাম আবু হানিফা (র) উমরা সুন্নাত বলেছেন। রমজানে ওমরাহ মুস্তাহাব। ওমরা হজের সময়েও করা যায়। হাদীসে রমজানের ওমরা হজের সমান বলা হয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)। অন্য হাদীসে আসছে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘রমজানের ওমরা আমার সাথে হজ করার সমতুল্য। ’’ (জামিউল আহাদিস)। ওমরার ফরজ ২টি। (১) ইহরাম বাঁধা (২) বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করা। ওমরার ওয়াজিব ২টি। (১) সাফা মারওয়া সায়ী করা (২) মাথা মুড়ান বা চুল ছাঁটা।
হজ ওমরার আগে বা পরে রাসুলুল্লাহ (সা) এর রওজা শরীফ তথা মসজিদুন নববী জিয়ারত করা নি:সন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জিয়ারত। মুমিনের কবর জিয়ারত করা হাদিস সম্মত একটি মুস্তাহাব ইবাদত। আর সুন্নাত পদ্ধতিতে কবর জিয়ারতের মাধ্যমে অনেক কল্যাণ রয়েছে। বিশুদ্ধ মতে রাসুলুল্লাহ (সা) এর রওজা জিয়ারত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাছাড়াও মদীনায় বাকী আনসার কাদ কবর স্থান জিয়ারত করা ওহুদ ময়দানের শহীদদের কবর জিয়ারত করা মুস্তাহাব বলা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমার উম্মতের যে কোন ব্যক্তি মদিনার অভাব-অনটন ও দুঃখ কষ্টে ধৈর্য্য ধারণ করবে আমি তার জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবো। (মুসলিম)। সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, মদিনার মাটিতে এবং এর ফলমূলে রোগ নিরাময়ের গুণ রয়েছে। মদিনার কুবা মসজিদকে পবিত্র কুরআনে তাকওয়ার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ বলা হয়েছে। কুবার মসজিদের ২ রাকাত নামাজ ওমরার তুল্য সওয়াব হয়। শরহে মুসলিম। নবীজী প্রতি শনিবার কুবার মসজিদে যেতেন। মুসলিম। সবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা) এর কবর জিয়ারত প্রসঙ্গে ২টি হাদিস উল্লেখ করলাম: (১) ‘‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করবে আমার শাফায়াত তার প্রাপ্য হবে।’’ উক্ত হাদীসের ২টি সনদের মধ্যে ইমাম দারাকুতলীর বর্ণিত সনদটি ইমাম জাহাবী গ্রহণযোগ্য বলেছেন।

ইবনু আদী ও একমত পোষণ করেছেন। (২) যে ব্যক্তি নেক নিয়তে মদিনায় আমার সাথে সাক্ষাত করবে কিয়ামতে আমি তার সাক্ষী এবং শাফায়াতকারী হবো। এই হাদিস বর্ণনাকারী আবুল মুসান্না সুলাইমান ইবনু ইয়াজিদকে মুহাদ্দিস ইবনু হিব্বান বিশ্বস্ত রাবীদের তালিকাভুক্ত করেছেন। ইমাম তিরমিজি ও তাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। যার সামর্থ্য আছে তার প্রতি ৫ বছর পর পর হজ করা আলিমগণ মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম শাফেয়ী মতাবলম্বী গণ সামর্থ্য থাকলে বার বার হজ করাকে ফরজে কিফায়া বলেছেন। তবে তাদের এ মত যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন। হজ ওমরা পালনকারী মহান আল্লাহর মেহমান। এ বছর আমাদের দেশ থেকে ১২৭১৯৮ জন হাজি মহান আল্লাহর মেহমান হতে যাচ্ছেন। মহান আল্লাহ তাদেক কবুল করুন। আমীন।
লেখক ঃ খতিব, উপশহর মসজিদ বগুড়া  
মুহাদ্দিস, উম্মুল কুরা কওমী মাদ্রাসা বগুড়া
০১৭১২-৫১৪৪৭৮