সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

 সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

রিপন আহসান ঋতু : পৃথিবী জুড়ে যে কোন সন্ত্রাসবাদের শুরুটাই হয় অসহিষ্ণুতা, হীনমন্যতা, ভারসাম্যহীন প্রেরণা তথা উরংড়ৎমধহরুবফ ঃযরহ-শরহম ঢ়ৎড়পবংং এবং নষ্ট ইল্যুশনের মধ্য দিয়ে। এই নষ্ট মাইন্ডসেট উদ্ভুত চিন্তা-চেতনা সন্ত্রাসীর মনোজগতে এমন ক্রোধ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ইচ্ছা সৃষ্টি করে যা তাকে টেনে নেয় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে। সন্ত্রাসীকর্ম প্রতিটি সন্ত্রাসীকে উচ্চমাপে নিয়ে যায় বলে তারা বিশ্বাস করে। একে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর চিন্তা ও পরিচয় অধিকতর পরিচিত করবার পথ বলে মনে করে সন্ত্রাসের পথে পা-দেওয়া মানুষগুলো।

আপাতদৃষ্টিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠিত (ঙৎমধহরুবফ) বা অসংগঠিত (উরংড়ৎমধহরুবফ) দুধরনেরই হতে পারে। জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও বড় সন্ত্রাসগুলো অপেক্ষাকৃত সংগঠিত অপরাধ চিন্তার ফসল। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছা ও কল্পনাপ্রসূত চিন্তা সত্য জেনে পরিকল্পিতভাবে এমন ধ্বংসাত্মক কাজ করে যা রাষ্ট্র বা সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। সন্ত্রাসের সর্বোচ্চ রূপই হল জাতিগত যুদ্ধ এবং পররাজ্যে আগ্রাসন যা কিনা একটি সম্পূর্ণ সংগঠিত অপরাধ (ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব)। সকল সন্ত্রাসবাদ এবং সকল যুদ্ধই আরও যুদ্ধ, সংঘাত ও সন্ত্রাস টেনে আনে। ২৮ বছর বয়সী ব্রেন্টন টারেন্ট নামক এই হামলাকারী নিজেকে একজন শ্বেতাঙ্গ এবং কর্মজীবী পরিবারের সন্তান দাবি করে, তার মতো মানুষদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে এই হামলা চালিয়েছে বলে অনলাইনে পোস্ট করা ৭৩ পৃষ্ঠাব্যাপী এক ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেছে। সে নিজেকে একজন অস্ট্রেলিয়ান বলে দাবি করেছে।

শুধু তাই নয়, ১৬ মিনিটের হামলার সেই ভয়াবহ দৃশ্যও সে ভিডিওতে ধারণ করে খানিক বাদে অনলাইনে পোস্ট করে। তার এই ভিডিও ধারণ শুরু হয় গাড়িতে উঠে মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় থেকে, যা সে পার্টি শুরু বলে উল্লেখ করে। এই হামলার ধরন দেখে এটা খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, হামলাকারী সহসা এমন হামলার সিদ্ধান্ত নেয়নি, বরং অনেক আগে থেকেই এই হামলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। যদিও নিউজিল্যান্ডে এই ধরনের বন্দুক হামলার ঘটনা বিরল। ১৯৯০ সালে সাউথ আইল্যান্ডের আরামোয়ানা শহরে মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তি গুলি করে ১৩ জনকে হত্যা করে। এর পর দেশটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কড়াকড়ি করা হয়। ক্রাইস্টচার্চে হামলায় প্রমাণিত হয়, পশ্চিমা বিশ্বে আজ বহুত্ববাদ নানা দিক দিয়াই হুমকির শিকার। এখানে অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থিরা দিন দিন মাথাচাড়া দিয়া উঠছে। তারা অনেক দেশে সরকার পরিবর্তনেও কলকাঠি নাড়ছে। ২০০৯ সালে বিশ্বমন্দা শুরু হবার পর এসব দেশের স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে এই ধারণা তৈরি করা হয় যে, তাদের চাকরিগুলো অন্য দেশের নাগরিকরা এসে কেড়ে নিচ্ছে।

অথচ বিশ্বায়নের ধারণা হতে উৎপাদনের অন্যতম মিনস বা উপাদান হিসাবে শ্রমিকের দেশান্তরের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে মন্দাভাব দেখা না দিলে হয়ত এতটা খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এমতাবস্থায় যেসব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ ইউরোপ-আমেরিকায় শ্রমিক পাঠাচ্ছে, তাদের নিরাপত্তাগত নানা দিক বিবেচনা করে দেখতে হবে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো দেশে বাংলাদেশি নাগরিকগণ যাতে না যান, সেই ব্যাপারেও এখন হতেই আমাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তশিষ্ট হিসেবে পরিচিত দেশে এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা সত্যিকার অর্থেই নজিরবিহীন এবং এক্ষেত্রে বিশ্বের সব দেশকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একজোট হতে ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। আমরা দেখেছি ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর ইউরোপ-আমেরিকায় মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে সব ধর্মের সাধারণ মানুষকেই টার্গেট করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সন্ত্রাসীকে ধর্ম-বর্ণ দিয়ে বিবেচনার পরিবর্তে কেবল সন্ত্রাসী হিসেবে দেখতে হবে।

হামলাকারী মুসলিম হলে সন্ত্রাসী, অন্য ধর্মের হলে ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’- এমন নীতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে বাধ্য। মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে দিনদুপুরে হামলার শিকার হয়ে এতগুলো মানুষের প্রাণহানি হৃদয়বিদারক। এই মর্মান্তিক ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ক্রাইস্টচার্চে হামলা এবং এই হামলার পরদিন সেখানে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ক্রিকেটকে ঘিরে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ভেন্যু ভবিষ্যতে কমবেশি বিতর্কিত হতে পারে। এর আগে আমাদের মনে আছে, ২০০৯ সালে শ্রীলংকা দলের পাকিস্তান সফরের সময় একইভাবে সন্ত্রাসী হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায় শ্রীলংকার ক্রিকেট দলের সদস্যরা। এই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ রয়েছে এবং পাকিস্তান সরকারের অনেক অনুরোধেও কোনো দল সেখানে খেলতে যেতে সম্মতি জানায়নি। ক্রাইস্টচার্চে যে হামলাটি সংঘটিত হয়ে গেল, তা নিউজিল্যান্ডের জাতীয় গৌরবের জন্য যতটুকু না কলঙ্কজনক, তার চেয়ে বেশি ভোগাবে দেশটির ক্রিকেটকে। যে কারণে পাকিস্তান কার্যত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভেন্যু হিসেবে নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছে গত ১০ বছর ধরে। সেই একই কারণে নিউজিল্যান্ডেও যদি ভবিষ্যতে নিরাপত্তার শঙ্কায় অপর কোনো দল যেতে সম্মত না হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এই হামলা করেছে ঘৃণাবাদি ভাবাদর্শধারীরা। শান্তির দেশ হিসেবে খ্যাত নিউজিল্যান্ডে এ হামলার ঘটনায় বিশ্ববাসী বিস্মিত। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, ২০১৮ সালে বিশ্বে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল নিউজিল্যান্ড। তালিকায় প্রথম অবস্থানে আইসল্যান্ড। তৃতীয় থেকে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও ডেনমার্ক। দেশটিতে খুনের ঘটনাও বিরল। ২০১৭ সালের হিসাবে দেশটিতে ৪৬ লাখ মানুষ বাস করে। সে বছর খুনের ঘটনা ঘটে মাত্র ৩৫টি। তবে দেশটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা বিপুল। ২০১৭ সালে দেশটিতে ১২ লাখ নিবন্ধিত আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। ২০১৩ সালের আদমশুমারি অনুসারে নিউজিল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৪৬ হাজার, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১ ভাগ। তবে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করছেন। বন্দুক নিয়ে হামলা চালানোর কিছুক্ষণ আগে ইন্টারনেটে ব্রেন্টন টারেন্ট একটা ইশতেহার প্রকাশ করে। সেই ইশতেহারের লাইনে লাইনে ছিল মুসলিম-বিদ্বেষ, ঘৃণা আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের উগ্র মতাদর্শের কথা। সে ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ নাম দিয়ে ইশতেহারটিকে প্রকাশ করেছে। সেখানে এই মতাদর্শের মাধ্যমে ‘নতুন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে পদক্ষেপ’ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থীদেরই পৃথিবীজুড়ে সব সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউরোপের মাটি থেকে বিদেশিদের খেদাতে এবং ইউরোপের লাখ লাখ শ্বেতাঙ্গ মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে এই ইশতেহারে। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য নিয়ে একটি স্লোগানও দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। পুরো বিষয়গুলোতে আমরা দেখছি পৃথিবীর অনেক দেশেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এক্ষেত্রে সচেতনতামূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি নজরদারি ও আগাম নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে হবে। খোলা চোখে নিবিড় পুলিসিংসহ আইটি নজরদারিতে যুব সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। আইটি-বেইজড হাইটেক পুলিসিংগুলো নিরাপত্তা বাহিনীকেই করতে হবে।

নানা ধরনের যানবাহন এবং নতুন মানুষের চলাচলের দিকে চোখ রাখবার দায়িত্ব সচেতন সকল মানুষকে নিতে হবে। অহিংসা এবং শান্তির বাণী জনগণের কাছে পৌঁছে দেবার বিষয়টি আইটি ব্যবসায়ীদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। এই বাস্তবতার আলোকে তথাকথিত মানবতাকে সত্যিকার মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। সকল স্তরে নতুন করে মূল্যবোধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।  বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমরা বর্তমানে উগ্র চরমপন্থীদের হুমকির মুখে রয়েছেন। এর আগে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অন্যান্য দেশেও মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার পুনরাবৃত্তি রোধে ইসলাম বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদী প্রোপাগান্ডা বন্ধে বহুত্ববাদী ও শান্তিকামী বিশ্বসম্প্রদায়কে একটি ঐক্যবদ্ধ ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসতে হবে। বিশ্ববাসীর শান্তি, মর্যাদা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্যই এ কাজটি বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ ভাবেই করতে হবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩