সংরক্ষণের অভাবে লোকসানের মুখে আম চাষীরা

 সংরক্ষণের অভাবে লোকসানের মুখে আম চাষীরা

আব্দুল হাই রঞ্জু :কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। কৃষির উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করছে দেশের কৃষক কুল। শত প্রতিকুলতাকে মোকাবেলা করে এ দেশের কৃষক সফল হলেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল নেই। সাড়ে ষোল কোটি মানুষের মুখের আহারের যোগান দিচ্ছে এ দেশের কৃষক। যথোপযুক্ত সরকারি পরিকল্পনার অভাবে কৃষকের কপাল পুড়ছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাড়তি ফলন হলেই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয় চাষীদের। অথচ এ দেশের কৃষক শুধু ধান উৎপাদনেই রেকর্ড গড়েনি, এর বাইরে নানা জাতের সবজি ও ফলমূল উৎপাদনে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে। গোটা বিশ্বে সবজি উৎপাদনে যে ক’টি দেশের নাম তালিকার শীর্ষে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সেই উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপিত হয়নি। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই সবজির ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। এখন উৎপাদিত সবজি দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানি হচ্ছে। এরপরও উৎপাদিত সবজির একটি বড় অংশ শুধুমাত্র সংরক্ষণের অভাবেই পানির দামে বিক্রি করছে চাষীরা, আবার অনেক সময়ই জমিতেই সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

 আমরা যারা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখালেখি করি, তাদের মতোই আমিও এ নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি। এত লেখালেখির পর সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে এসেছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই। তবে, এটুকু নিশ্চিত করেই বলতে পারি, শুধুমাত্র উপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাবেই এখনও চাষীদের উৎপাদিত বাড়তি শস্য পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘রংপুরে সংরক্ষণাগার না থাকায় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে ৫০ হাজার টাকার আম’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। বাস্তবে এ বছর কম দামেই ক্রেতারা আম কিনতে পারছে। যার অর্থ আম চাষীদের কম দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে, তা না হলেতো কম দামে আম কেনার কথা নয়। এমন এক সময় ছিল, যখন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকেই আম উৎপাদনে সমৃদ্ধ জেলা মনে করা হতো। এখন কিন্তু শুধু রাজশাহী কিম্বা চাঁপাইনবাবগঞ্জই নয়, এখন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুরসহ উত্তরের অনেক জেলায় নিজেদের খাবার প্রয়োজনে এবং ব্যবসা কেন্দ্রিক প্রচুর আমের বাগান গড়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আমে নিজেদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আবার আম সমৃদ্ধ জেলাগুলোয় উৎপাদিত আমের বাড়তি ফলন হওয়ায় এ বছর মূল্য বিপর্যয় ঘটেছে। গত বছর এই সময়ে সুস্বাদু হাড়িভাঙ্গা আম কুড়িগ্রামে ৫০/৬০ টাকা কেজিতে দেদার বিক্রি হয়েছে। অথচ এ বছর কুড়িগ্রামে জনপ্রিয় হাড়িভাঙ্গা আম মাত্র ২৫/৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আম ১০/১৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আমভোজি মানুষরা তুলনামূলক অনেক কম মুল্যেই আম কিনে খেতে পাচ্ছে। কিন্তু বারোটা বেজেছে আম চাষীদের। যারা পুঁজি বিনিয়োগ করে আমের বাগান কিনে শুরু থেকে পরিচর্যা করেছেন, তারা পুঁজি হারিয়ে এখন পথে বসেছেন।

এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগান কেনা আম ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান বলেন, গত ২০ বছরের মধ্যে আমের ব্যবসায় এমন বিপর্যয় কখনও ঘটেনি। তিনি আরো বলেন, ২২ লাখ টাকায় কেনা আম বাগানে শ্রমিক-কর্মচারি ও ওষুধের পেছনে আরো প্রায় ৭/৮ লাখ টাকা খরচ করেছি। গত ২ মাস যাবৎ তিনি ৪/৫ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। হয়ত আম বিক্রি করে আরো কিছু টাকা পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে পথে বসতে হবে মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। এমন অভিযোগ শুধু আম ব্যবসায়ী তৌহিদের নয়, এমন অভিযোগ সকল আম ব্যবসায়ীদের। বাস্তবে আমাদের দেশে কৃষি পণ্যের ভাল ফলন হলেই চাষীদের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়। যা আম চাষীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে অথচ সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার থাকলে চাষীদের উৎপাদিত পণ্য চাষীরা হিমাগারে সংরক্ষণ করে ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বিপণন করতে পারতেন। তাহলে একদিকে চাষিরা লাভবান হতে পারতেন, অন্যদিকে দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব ছিল। এমনকি, প্রতিবছর যে পরিমাণ উৎপাদিত কৃষি পণ্য পচে নষ্ট হয়ে চাষীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, সে অবস্থা থেকেও চাষীরা অনেকাংশেই রেহাই পেতেন। প্রকৃত অর্থে কৃষি অর্থনীতির বাংলাদেশে কৃষির যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা আরো বিকশিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ এবং সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কৃষির উন্নয়নে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ না নেয়ায় চাষীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক সময়ই উপযুক্ত মূল্যের অভাবে চাষীরা যে পণ্য চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ চাষের ধারাবাহিকতা অনেক সময়ই বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সে পণ্যের সংকট দেখা দিলে যা মোকাবিলা করতে সরকার বিদেশ থেকে সে পণ্য আমদানি করে দেশীয় চাহিদা মেটায়। এভাবে আমাদের দেশে আমদানি নির্ভরতা প্রতিনিয়তই বেড়েই চলছে। এ বছরও লবণের মতো নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৫ লাখ টন লবণ আমদানি করা হয়েছে। আরো লবণ আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ লবণ আমদানি হওয়ায় সন্দেহ নেই দেশীয় লবণ চাষীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি লবণ রিফাইনারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।

 যারা ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণও যথাযথভাবে পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে অর্থ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সংকটে পড়তে হবে। এসব কারণে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতকে সংকটে পড়তে হয়। শুধু লবণের মতো কৃষি পণ্যই নয়, ভোক্তার কষ্ট লাঘবে চাল ও গমও আমদানি করতে হয়। গত দেড় বছরে প্রায় ৯৯ লাখ টন খাদ্য শস্য বিদেশ থেকে আমদানি হয়েছ। ফলে দেশের ধান চাষীরা এ বছর ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাজার মূল্য কমার বদলে শুধুই বাড়ছে। আর বাড়তি মূল্য হলেও পণ্য কিনে খেতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই। ফলে দিনে দিনে এ দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। দোকানে দোকানে থরে থরে দোকানিরা পণ্যের পসরা নিয়ে বসে থাকলেও ক্রেতার অভাবে তাদেরও ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। এই মন্দাভাব দূর করতে হলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে সরকারকে নজর নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরকারি প্রণোদনা বৃদ্ধি করা। অথচ প্রতি বছরই জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ছে ঠিকই কিন্তু কৃষি প্রণোদনার জন্য কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে না। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে কৃষিতে নয় হাজার কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকি দিলেও গত ৭/৮ বছরে জাতীয় বাজেটের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় কৃষি ভর্তুকি বাড়েনি। এ বছর ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের সুবিশাল বাজেটে কৃষি ভর্তুকির পরিমান মাত্র পাঁচশত কোটি টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ বলতে গেলে যৎসামান্যই বেড়েছে। এ পদক্ষেপ কোন ভাবেই কৃষির সমৃদ্ধির জন্য অনুকূলে নয়, যা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

 প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে বাস্তব কিছু কথা তুলে ধরা হল। দেশের উত্তারাঞ্চলের ১৬টি জেলাকে খাদ্য ভান্ডার বলা হয়। এই উত্তরাঞ্চলের চাষীরা শত প্রতিকূল অবস্থাকে মোকাবিলা করে চাষাবাদ করছে। কখনও পানির তীব্র সংকট, আবার কখনও অতিবর্ষণ, অসময়ে বন্যা, উজানের পানির ঢল এমনি প্রতিকুল আবহাওয়াকে জয় করে নিরন্তরভাবে চাষাবাদ করছে চাষীরা। এমনিতে জলবায়ুজনিত অভিঘাতের মুখে শুধু উত্তারাঞ্চলই নয়, গোটা দেশের চাষীদের বিপর্যয়ের মুখে চাষাবাদ করতে হয়। ঘন জনসংখ্যার বাংলাদেশ, নগরায়ণ, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, অফিস আদালতের কারণে চাষযোগ্য জমির পরিমাণও কমছে, অথচ মানুষ বাড়ছে হু হু করে। ভৌগলিক সীমারেখা কার্যত স্থির। এত সীমিত চাষযোগ্য জমিতে চাষাবাদ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা যোগান দিচ্ছে কৃষক। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলেও যে দ্বারপ্রান্তে উপনিত হয়েছে, তাকে বিকশিত করতে হলে চাষীদের অনুকূলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাকে আরো বাড়াতে হবে। প্রতি বছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে খাদ্যশস্য মজুদ উপযোগী খাদ্যগুদাম নির্মাণ, সবজি, ফলমূল সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার পর্যায়ক্রমে গোটা দেশে সরকারিভাবে স্থাপন করতে হবে এবং ধান চাষীদের উৎপাদিত ধান খাদ্যগুদামে চাষীরা যেন বিক্রি করতে পারে। সবজি, আমসহ উৎপাদিত ফলমূল চাষীরা যেন খুব সহজেই সংরক্ষণও করতে পারে। তাহলে উৎপাদিত সবজি, ফলমূল যেমন সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হবে না, তেমনি এসব পণ্য দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে। তা না হলে হয়ত আপেক্ষিক অর্থে, অট্টালিকার পর অট্টালিকায় নগর, মহানগরকে জৌলুসে ভরপুর করা যাবে সত্য, কিন্তু প্রকৃত অর্থে চাষীদের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হবে। উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, কৃষিই আমাদের সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি। এ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকেই আমাদের এগুতে হবে, তা না হলে শুধু শুধু কৃষকের কল্যাণের কথা বললে প্রকৃত অর্থে সে কল্যাণ কস্মিনকালেও অর্জিত হবে না। এটাই নিখাদ সত্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮