রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক চাপ

 রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে  প্রয়োজন আন্তর্জাতিক চাপ

মো. ওসমান গনি : নিপীড়ন-নির্যাতন-গণহত্যার শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বিশ্বকে দিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের সমর্থন আদায়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছে সরকার। বিশেষ করে মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাববিস্তারকারী দেশ চীনকে এ ইস্যুতে পাশে পেতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরের সময়  ‘রোহিঙ্গা সংকট’ নিয়ে আলোচনা করেন। কারণ  বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ হিসাবে  চীনের হাতেই রয়েছে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের চাবি। যদিও মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং গভীর। অন্যদিকে বাণিজ্যস্বার্থের কারণে ভারতের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক চমৎকার। বিশ্বের শক্তিশালী এ দুটি দেশের প্রত্যক্ষ সমর্থনের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো ধরনের সৌজন্যতাও প্রদর্শন করছে না। দেশটির ওপর দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক চাপেও কোনো ফল আসছে না। তাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এই মুহূর্তে চীনের সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের হাতে।

জাপান সৌদি আরব ফিনল্যান্ড সফর শেষে গত মাসের ৯ তারিখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই জানিয়েছিলেন, নির্যাতনের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আলোচনা করতে তিনি চীন সফর করবেন। কারণ সারা বিশ্ব চাইছে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরুক কিন্তু মিয়ানমার তাদের ফেরাতে চাইছে না। এ সংকট নিরসনে চীনের দিক থেকে সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হাতে হত্যা ধর্ষণ নির্যাতনের মুখে পড়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে থাকে রোহিঙ্গাস্রোত। তারও আগে আশি ও নব্বই দশকে একই পরিস্থিতির মুখে পড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা। এমনকি গত কয়েক দশকে অনেক রোহিঙ্গা মিশে গেছে বাংলাদেশের মূল জনস্রোতে। সে সংখ্যা অনুমান করা হয় ৫ লাখেরও বেশি। এ সংখ্যা নিবন্ধিত নয়। নতুন করে আসা প্রায় ৮ লাখসহ টেকনাফ উখিয়ার ক্যাম্পে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে ১১ লাখের বেশি। বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও এ সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি করার বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, আইন শৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিরূপে আবির্ভূত হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

ইতোমধ্যে জাতিসংঘ ও ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বললেও চীন ও ভারত সমস্যা সমাধানে আগ্রহপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি। উপরন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার ভেটো প্রদান সংকটকে আরো প্রলম্বিত করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীর আচরণ এবং চীনের মতো বন্ধু ও বাণিজ্যিক অংশীদারের ভূমিকা বাংলাদেশকে অনেকটা বিপাকে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে চীন-ভারতকে পাশে পেয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে কিছুই মনে করছে না মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নানা টালবাহানার আশ্রয় নিচ্ছে দেশটি। রোহিঙ্গাদের ফেরানোর পরিবেশ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও মিয়ানমার সে রকম কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। উপরন্তু আরাকান বা রাখাইনের পরিস্থিতি দিন দিন ‘অনিরাপদ’ করে তোলা হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তার অভাবে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। এ অবস্থায় মিয়ামনার চীনের ‘প্রশ্রয়’কেই হাতিয়ার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চীন মিয়ানমারের আকিয়াব উপকূলে বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপন করছে এবং বন্দর স্থাপনের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা যেসব এলাকায় থাকতো সেসব এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে এসব এলাকা। এসব স্বার্থকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো প্রদান করে মিয়ানমারকে সন্তুষ্ট রাখছে চীন। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণ না করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে চীন। অথচ বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখন ‘জীবন-মরণ সমস্যা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিয়ানমারের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে তার চেয়ে কম স্বার্থ জড়িত নয় চীনের। মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ প্রায় দু’হাজার কোটি ডলারের মতো। অপরদিকে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঢাকা সফর করার পর ২ হাজার কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশকে আগে কখনোই একসঙ্গে এত অর্থসহায়তা দেয়নি অন্য কোনো দেশ। ফলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আমলে নিতে হবে চীনকে। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারলে নিজেদের বিনিয়োগও নিরাপদ থাকবে-এ বিষয়টি ভাবতে হবে চীনকে। বাংলাদেশকে সমর্থ হতে হবে চীনকে এ বিষয়ে বোঝাতে।
লেখক ঃ  সাংবাদিক -কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯