ছাত্রদলের কাউন্সিল

ভোটারদের মন জয়ে দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা

 ভোটারদের মন জয়ে দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা

রাজকুমার নন্দী ও আলী আজম সিদ্দিকী : দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় পর কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে জমে উঠেছে প্রচারণা। ভোটারদের মন জয়ে ব্যস্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা। গত মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারে নেমেছেন তারা। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। ছাত্রদলের জন্য নিজের ত্যাগ, রাজপথে ভূমিকা, মামলা-গ্রেফতার ও নির্যাতনের চিত্র, সংগঠন পরিচালনায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে ভোট চাইছেন। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন জোরদার করার। জেলা সফরের পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় ও সাবেক ছাত্রদল নেতাদের সাথেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ ডিজিটাল মাধ্যমে চালাচ্ছেন প্রচারণা। অনেকে আবার ইতোমধ্যে প্রার্থী হিসেবে ইশতেহারও ঘোষণা করেছেন। এদিকে কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনের সিদ্ধান্তে আনন্দিত সংগঠনের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রের সাথে তৃণমূলের সুসম্পর্ক গড়ে উঠছে।

* উত্তরবঙ্গের এককপ্রার্থী খোকন
* যথারীতি থাকছে সিন্ডিকেটের প্রভাব

ছাত্রদলের কাউন্সিল উপলক্ষে গঠিত আপিল কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ভোটের মাধ্যমে ছাত্রদলের কাউন্সিল এর আগেও হয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেও হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে কাউন্সিল হলে ভোটারদের কাছে যাওয়ার ফলে উভয়ের মধ্যে একটা হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়। আমার মনে হয় এই প্রক্রিয়াটাই ভালো। এতে দল উপকৃত হয়।

আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ছাত্রদলের কাউন্সিল ঘিরে আগ্রহ রয়েছে বিএনপি নেতাদেরও। বসে নেই সিন্ডিকেটের বড় ভাইয়েরাও, যারা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। ১৯৯২ সালে পঞ্চম কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে ছাত্রদলের সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি গঠিত হয়েছিল। সভাপতি নির্বাচিত হন বর্তমানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং সাধারণ সম্পাদক হন নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলী। এরপর যতগুলো কমিটি হয়েছে সেগুলো মূলত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত পকেট কমিটি। এ কারণে দিনে দিনে দুর্বল হয়েছে ছাত্রদল।

জানা গেছে, দীর্ঘ ২৭ বছর পর কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও বসে নেই তথাকথিত সিন্ডিকেটের বড় ভাইয়েরা। এবার ভোটের মাধ্যমে অনুগত ছোট ভাইদের জিতিয়ে আনতে দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে ইতোমধ্যে তৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন তারা। একটি ইলিয়াস আলী বলয়, গুম হওয়ার সাত বছর পরও তার অনুসারী অংশটি ছাত্রদলে সক্রিয়। অন্য বলয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, যিনি এখন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। সাধারণত ওই দুই নেতার বলয়ের বাইরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসার সুযোগ খুবই কম। তবে এবার উভয় বলয় থেকে শীর্ষ দুইপদে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ‘সিন্ডিকেটের’ ভোটের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভোটও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হবে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর মামুন খান প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ায় ছাত্রদলের কাউন্সিলে সভাপতি পদে মোট প্রার্থী ৯জন। তাদের মধ্যে সুলতান সালাউদ্দিন ্টুকুর আস্থাভাজন যশোরের কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, ইলিয়াস বলয়ের আশীর্বাদপুষ্ট বাগেরহাটের হাফিজুর রহমান হাফিজ এবং উত্তরাঞ্চলের নেতাদের আস্থাভাজন বিএনপির দূর্গখ্যাত বগুড়ার সন্তান ফজলুর রহমান খোকন শক্তিশালী প্রার্থী। সিন্ডিকেট ও আঞ্চলিক দুই হিসেবেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন তারা। এছাড়া ছাত্রদলের সদ্যবিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের আস্থাভাজন জামালপুরের সাজিদ হাসান বাবুও আলোচনায় রয়েছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকার জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। আলোচনায় রয়েছেন সদ্য প্রার্থীতা ফিরে পাওয়া ঝালকাঠির সন্তান মামুন খানও।

ফজলুর রহমান খোকন বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) একমাত্র প্রার্থী। দীর্ঘদিনের ছাত্র রাজনীতিতে তিনি ২২টি মামলা, দুইবার হামলার শিকার ও চারবার কারাবরণ করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে শুরু করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়।  জানা গেছে, খোকনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কাউন্সিলররা এবং ছাত্রদলের সাবেক নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাই নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী খোকন। তিনি বলেন, শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, অন্যান্য বিভাগের কাউন্সিলররাও আমাকে চাইছেন। তাদের চাওয়ার কারণেই সভাপতি প্রার্থী হয়েছি। তাদের কাছে আমার ইশতেহার তুলে ধরছি। খোকন বলেন, নির্বাচিত হলে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ছাত্রদলের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হবে। বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ থেকে আমিরুল ইসলাম খান আলিম ছাত্রদলের সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, সবাই আমার ব্যাপারে জানেন। ১৭টি মামলা আছে আমার বিরুদ্ধে। ওয়ান-ইলেভেন থেকে আন্দোলনে-সংগ্রামে রাজপথে আছি। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছি, গ্রেফতার হয়েছি। অতএব জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় রাজপথে ছিলাম। ছাত্ররাজনীতির কারণে বারবার হামলার শিকার হয়েছি। আশা করি, কাউন্সিলররা আমাকে মূল্যায়ন করবেন।

সাজিদ হাসান বাবু বলেন, যেখানে প্রচারণায় যাচ্ছি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এতে করে আমি আশাবাদী।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী রয়েছেন ১৯ জন। তাদের মধ্যে নোয়াখালীর শাহ নেওয়াজ, সাতক্ষীরার আমিনুর রহমান আমিন, যশোরের মাজেদুল ইসলাম রুমন, পটুয়াখালীর তানজিল হাসান, বরিশালের সাইফ মাহমুদ জুয়েল ও নরসিংদীর ইকবাল হোসেন শ্যামল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। পিছিয়ে নেই একমাত্র নারী প্রার্থী কুমিল্লার ডালিয়া রহমান, যিনি বেগম খালেদা জিয়ার সফরে ‘স্কুটি সঙ্গী’ হিসেবে খ্যাত। এদের মধ্যে ইলিয়াস বলয়ের নেতা শফিউল বারী বাবুর আস্থাভাজন শাহ নেওয়াজ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন । বৃহত্তর চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর কাউন্সিলর ও ছাত্রদলের সাবেক নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে জেতাতে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

শাহ নেওয়াজ বলেন, আমার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে। একাধিকবার কারাবরণ করেছি, নির্যাতনের শিকার হয়েছি। চূড়ান্ত বিচারের ভার আমি কাউন্সিলরদের ওপর ছেড়ে দিলাম।

তবে ইলিয়াস বলয়ের কেউ কেউ আমিনুর রহমান আমিনকে জেতাতেও তৎপর রয়েছেন। আর দুই বলয়ের বাইরে ছাত্রদলের সাবেক কিছু নেতা ও তাদের অনুসারীরা মাজেদুল ইসলাম রুমনকে নিয়ে কাজ করছেন। আমিনুর রহমান ও মাজেদুল ইসলাম রুমন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ওয়ান-ইলেভেন থেকে রাজপথে আছি। মামলা-হামলা-নির্যাতনেরও শিকার হয়েছি। কাউন্সিলরদের কাছে যাচ্ছি। তাদের নিশ্চয়তা দিতে চাইছি-জয়ী হলে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত করব।

ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ইকবাল হোসেন শ্যামল। তাকে জেতাতে কাজ করছেন আকরাম ও তার অনুসারীরা।

তানজিল হাসান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কারণে আটটি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছি। কয়েকবার কারাবরণ করেছি। আশা করি, কাউন্সিলরা আমাকে মূল্যায়ন করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজেই নানাভাবে ছাত্রদলের কাউন্সিল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ মনিটরিং করছেন। সুতরাং কেউ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।