বিশ্ব দর্শন দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

 বিশ্ব দর্শন দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

প্রফেসর ড. মোঃ আউয়াল হোসেন তালুকদার : ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব দর্শন দিবসটি আজ ১৫ নভেম্বর সারা বিশ্বে পালিত  হতে যাচ্ছে। আমরা জানি ইউনেস্কোর যাত্রা শুরু ১৯৪৫ সালে। ১৯৯৬ সাল থেকে ইউনেস্কো সেকশন অব ফিলোসফি এন্ড হিউম্যান সায়েন্সের যাত্রা শুরু করে। লক্ষ্য যথার্থ শিক্ষার প্রসার, মানব কল্যাণে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবিদ্যার চর্চাকে উৎসাহিত করা এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতির  বিকাশ ও লালনের মাধ্যমে মানবকল্যাণ এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। সমগ্র বিশ্বে  আমরা লক্ষ্য করছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার নিঃশর্ত, অবাধ ও সার্বিক প্রয়োগ সত্ত্বেও বিশ্ব শান্তির  সন্ধান পাচ্ছে না মানুষ। ইউনেস্কো ঘোষিত ২০০২ সালে ১৫ নভেম্বর সমগ্র বিশ্বে দর্শন দিবস  পালিত  হয়েছে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার দর্শন দিবস হিসেবে এ দিবসটি পালিত হয়। যদিও দর্শনানুশীলন, আবেদন, তাৎপর্য বিশ্লেষণ কোন একটি দিবস দ্বারা সীমাবদ্ধ করাও সমীচীন নয়। দর্শন জীবন সম্পৃক্তবিদ্যা। মানব জীবন ও জীবনের প্রয়োজন থেকেই দর্শনের উৎপত্তি। দার্শনিকের জ্ঞান ও সত্যের সাধনা মানুষের মহৎ মূল্যবোধ পুষ্ট জীবন রচনায় সহায়ক হয়ে থাকে। তাই দর্শনের আবেদন কালজয়ী।

বাংলাদেশ তথা বিশ্বপল্লীতে আজ শান্তির বড় অভাব। সর্বত্রই প্রতিহিংসার তান্ডব খেলা। সমকালীন সময় বড়ই দুঃসময়। তাই সবারই লক্ষ্য এখন বিশ্বশান্তি।  “সত্যম, শিবম, সুন্দরম” এর অনুধ্যান বড় প্রয়োজন। দর্শনের সুষ্ঠু ব্যাখা ও অনুশীলনই হতে পারে এ অনুধ্যানের চাবিকাঠি। দর্শন সত্য সুন্দর ও কল্যাণের অভিলাষী। সত্যের জন্য নিবেদিত হবে যুক্তি। সমস্ত অযৌক্তিকতা, ধর্মীয় কুপমন্ডুকতা, স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে, কুৎসিত ও কুশ্রীর বিরুদ্ধে সৌন্দর্য এগিয়ে যাবে। শুভ, শ্রেয়, সুন্দরের সন্ধান পাবে মানুষ। নীতি, মনুষ্যত্ব, মূল্যমান, মূল্যবোধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।  নচেৎ পৃথিবীতে বস্তুর প্রতিমা গড়ে উঠবে কিন্তু  তাতে প্রাণ থাকবে না।

বাংলাদেশের মত অনগ্রসর অর্থনীতির দেশে দর্শন চর্চার  আদৌ দরকার আছে কিনা  এ প্রশ্ন আজ আমাদের অনেকের। শিক্ষিত সচেতন, এমনকি যারা দর্শনের শিক্ষার্থী যারা দর্শনের ধারক, বাহক, পরিবেশক, অনুরাগী এবং গবেষক তারাও এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেন নিরন্তর। এর কারণ হল, আমরা দর্শনের স্বরূপ, প্রকৃতি এবং এর প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে যথার্থভাবে অবহিত নই। অনেকে প্রশ্ন তোলেন যে দেশে শতকরা আশিভাগ লোক দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করেন তাদের জীবনের মুখ্য লক্ষ্য হল ক্ষুধা নিবৃৃত্তির জন্য আহার, মাথা গোঁজার জন্য বাসস্থান, লজ্জা নিবারণের জন্য বস্ত্র এবং রোগমুক্ত জীবনের জন্য চিকিৎসার। সঙ্গত কারণেই সেখানে দরকার, একটি চমৎকার অর্থনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মত প্রায়োগিক বিজ্ঞানের। দর্শনের অন্ধকারে কালো বিড়াল খোঁজার  মত, বা ডিম আগে না মুরগি আগে এহেন বিলাসী ভাবনার বাস্তবিকই কোন দরকার নেই । অবশ্য এ অপবাদ আমরা সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস  তথা  সমগ্র মানববিদ্যা অনুষদের বিষয়াবলীর উপর আরোপ করতে পারি। মানববিদ্যার শিক্ষা সমগ্র মানবজাতির বোধের,মননের উৎকর্ষ সাধনে তথা মানবতাবাদের উন্নতিতে এক বিরাট সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। আর দর্শন  মানুষের বিচারশীলতার বোধকে শাণিত করে, তীক্ষè করে। একজন যথার্থ দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। শুধু বাংলাদেশে নয় সমগ্র বিশ্বে আজ নীতিবোধের স্বাস্থ্য বড় বেশি অসুস্থ। একে সুস্থতা দিতে পারে যথার্থ নৈতিক ও মানবিক চেতনা নির্ভর শিক্ষা। আর এটাই তো দর্শনের শিক্ষা।     
    
সমকালীন বিশ্ব বিবেক আজ বড় বেশি অশান্ত। এই অশান্ত,অস্বস্তিকর বিশ্ব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নীতিশিক্ষার একটি বিশেষ  তাৎপর্য আছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতিতে এই মাটির মানুষ আজ মহাকাশ জয় করছে। কিন্তু পারছে না এই বিশ্ব পল্লীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার এই অভাবনীয় প্রাপ্তির মধ্যেও আজ সর্বত্র বিরাজমান এক অস্বস্তিকর অবস্থা, প্রাচুর্যের মধ্যেও দিকে দিকে ধ্বনিত হচ্ছে দুঃখ বেদনার এক করুণ সুর। শান্তি নেই  কোথাও। ‘ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ বাঙালি জাতির এই মহান বাণীর বাস্তবতা আজ আর দেখতে পাই না বড় বেশী। তার বদলে এখন বরং শোনা যায় হতাশা ও আস্থাহীনতার এক আকুল আর্তনাদ। যুগ যুগ ধরে লালিত নৈতিকতা,মূল্যমান ও মূল্যবোধ হারিয়ে সমকালীন মানুষ নিপতিত হয়েছে এক দুঃসহ, অসহায় নিরবলম্ব অবস্থায়। চারিদিকে শুধু সন্ত্রাস, হানাহানি, মাদকাসক্ত, স্বার্থের এক কুৎসিত লড়াই। নৈতিকতা, মানবতা,মমত্ববোধ যেন আটকা পড়েছে কোন এক অদৃশ্য কানাগলিতে। মানুষের বিবেক আজ জিম্মি হয়ে আছে কোন এক পাশবিক শক্তির হাতে। অবক্ষয়ের এই স্তরে  আমাদের সমাজে বিদগ্ধ পন্ডিতব্যক্তির অভাব নেই, অভাব নেই তত্ত্ব কথার,অভাব নেই প্রাকৃতিক সম্পদের। অভাব দেখা দিয়েছে মানুষের নৈতিকতা,অকৃত্রিম হৃদয়াবেগ, প্রেমপ্রীতি, দয়ামায়া তথা মানবিক মূল্যবোধের।

 বিত্তবান দেশসমূহে শুধু নয়, বিত্তহীন এই অভাগা বাংলাদেশেও নেমে এসেছে  চরম দুর্দিন। জীবনের স্বরূপ ও লক্ষ্য সম্বন্ধে বিভ্রান্তি মূল্যবোধের প্রতি উদাসীনতা, একপেশে উগ্র বস্তুবাদী মানসিকতা প্রভৃতি মিলে বিভ্রান্ত ও দিশেহারা করে ফেলেছে সমকালীন মানুষকে। ধন-জন-জ্ঞানের অধিকারী হয়েও মানুষ পাচ্ছে না শান্তির সন্ধান,জীবনের যথার্থ লক্ষ্য নির্ধারণে তারা বিভ্রান্ত। ফলে সমাজ জীবন হারিয়েছে সামাজিক প্রশান্তি। বিভ্রান্ত ও ব্যর্থ মানুষ আজ এ সত্য উপলব্ধিতে সিহত যে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান-ভিটামিন যেমন প্রয়োজন তার দৈহিক প্রাণকে টিকিয়ে রাখতে তেমনি তার নৈতিক প্রাণকে টিকিয়ে রাখার জন্য ও আধ্যাত্মিক সত্তার পুষ্টির জন্য প্রয়োজন দয়া, মায়া, ন্যায়, সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের চর্চার। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে যে শিশুটি আজ জন্ম নিল কয়েকদিন পর সে আর শিশুর সারল্য নিয়ে জীবনের প্রতি তাকায় না সে ক্রমশ হতে থাকে অকালপক্ক, ধড়িবাজ, মদ্যপ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ধর্ষক, দায়িত্বজ্ঞানহীন উচ্ছৃংখল কিশোর বা যুবকে। আর যিনি প্রৌঢ় তিনি শঙ্কা, ভয় আর সংশয়ের শিকার চারপাশের হৃদয়হীনতা, অমানবিকতা আর পাশবিকতায়। কি যেন সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে এই অস্বস্তিবোধে। আর বৃদ্ধেরা হাঁটেন নিরালায় জবুথবু অকর্মণ্য বোঝা হয়ে, অসহায় হয়ে। এ পরিস্থিতিতে আজ অনিবার্য হয়ে পড়েছে সর্বত্র নৈতিকতা তথা ন্যায়বোধের অনুশীলনের।

সমগ্র বিশ্বে আজ যে মূল্যবোধের দুঃখজনক অবক্ষয় ও তীব্র মানবসংকট তা থেকে অব্যাহতি পেতে হলে মানুষকে আজ অগ্রসর হতে হবে প্রেম-সম্প্রীতির পথে। সকলকে আজ নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে যে, বস্তু চর্চা বা উগ্র বস্তুবাদী মানসিকতা ও বৈষয়িক সমৃদ্ধি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়,এটি উপলক্ষ্য মাত্র। এও উপলব্ধি করা দরকার যে, হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস,কিংবা যুদ্ধে নয়,দয়া মায়া ও প্রেম-প্রীতি অনুশীলনেই নিহিত মনুষ্যত্বের প্রকৃত গৌরব,তার স্বকীয়তা ও শ্রেষ্ঠত্ব। অনাবিল প্রেম-শক্তিবলে মানুষ মুক্ত হতে পারে পাশবিক প্রবৃত্তির বেষ্টনী থেকে এবং সেতু-বন্ধন রচনা করতে পারে সর্বজীব ও স্রষ্টার মধ্যে। এমন প্রেমধর্ম ও মানবতাবাদী দর্শনে কোনো ভেদাভেদ থাকে না ব্রাহ্মণ ও শূদ্রে, হিন্দু ও মুসলমানে,বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানে, এক কথায় মানুষে মানুষে,জাতিতে জাতিতে। এ প্রেম  ও মানবিক আদর্শের স্পর্শে  একাকার হয়ে যায় যুগ,জাতি,দেশ,ধর্ম ও সমগ্র মানবতা। প্রেমের এই সর্বকর্ষক স্পর্শ পেয়েই মানুষ ঘোষণা করে, ‘মানুষে মানুষে পার্থক্য আমি জানি না’।

 শ্বেতকায়ে কৃষ্ণকায়ে প্রভেদ দেখি না, ছোট বড় বুঝি না, সবাই শক্তিময় স্রষ্টার সৃষ্টি। দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল,  নৈতিকতা, মানবতা ও মানব কল্যাণের অনুভূতি দিয়ে মানুষের মনে এক অনাবিল প্রেমবোধ সৃষ্টি করা। সব রকম সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে,জাতি, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের মনে এক অখন্ড ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে চায় দর্শন। সুসমৃদ্ধ দর্শন ও গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা, অবহেলা ও অসচেতনতা আমাদের কল্যাণপ্রসূ জাত্যাভিমানকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করছে এবং অনেকটা অহেতুকভাবেই আমরা আমাদের আত্মপরিচয়ের মিথ্যা সঙ্কট সৃষ্টি করছি । কোন সমাজ যদি তার  আবহমান সংস্কৃতি, দর্শন ও জীবনবোধ থেকে দূরে সরে যায় তখনই সমাজে আসে অবক্ষয়, সন্ত্রাস,নারী নির্যাতন,চাঁদাবাজি প্রভৃতি জাতীয় অনৈতিক ক্রিয়াকলাপ- যা একটি জাতিকে ধ্বংসের শেষ সীমায় পৌঁছে দিতে পারে। সৃষ্টির আদি কাল থেকেই মানব সমাজে চলে আসছে শুভ ও অশুভ, ন্যায়-অন্যায় তথা শোষক শোষিতের মধ্যে সংগ্রাম। এই সামাজিক সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই বিকশিত হয়েছে মানুষের নৈতিক চেতনা।

 নীতিবোধের অবক্ষয়ের কারণে পশ্চিমা অনেক উন্নত দেশে বিপিতা কর্তৃক তার কন্যাকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে দেখি। আর সঙ্গত কারণে এই জাতীয় উন্নত নামের অনুন্নত দেশে সবচেয়ে বেশি দরকার একটি বলিষ্ঠ নীতিশিক্ষার। এই নীতিবোধের শিক্ষা তথা নৈতিকতার শিক্ষা আমরা পাই দর্শন থেকে। এ্যারিস্টটলকে যখন বলা হয়েছিল দর্শন পাঠ থেকে আপনি কি সুফল পেয়েছেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন ‘অন্যেরা যা আইনের ভয়ে করে তা আমি নিঃসংকোচে,স্বাচ্ছন্দ্যে করার শিক্ষা দর্শন থেকে পেয়েছি’। মাছের পচন ধরে মাথা থেকে। আর  একটি সমাজের নীতিনির্ধারকদের তথা রাঘব বোয়ালদের নীতিবোধে,বিবেকবোধে যদি পচন ধরে এ পচন সঞ্চারিত হবে ক্রমান্বয়ে সমাজ দেহে। তাই বড় বেশি দরকার এমন শিক্ষা যা মানুষের বিবেককে করে তুলবে সত্যিকার অর্থে মানবীয় বিবেক। বিজ্ঞান গতি দিবে,প্রগতি দিবে কিন্তু সেই গতিকে,সেই প্রগতিকে আরও মানবীয় করে তুলবে মানববিদ্যার বিষয়াবলী। এই গতির উচিৎ-অনুচিতের সমাধান, যুক্তির আলোকে দিবে দর্শন। সুতরাং মানুষের নীতিবোধ,উচিৎ-অনুচিতের বোধকে জাগ্রত,বলিষ্ঠ রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে দর্শন। তাই আমাদের জন্য দর্শনের শিক্ষা তথা মানবিক মূল্যবোধপুষ্ট শিক্ষা আজ বড় বেশি দরকার। তাই সুষ্ঠু, সুন্দর প্রাণের সত্যিকারের মানবোচিত যথার্থ জীবনের  জন্য চাই দর্শনের চর্চা, অনুশীলন ও প্রয়োগের। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প সংস্কৃতি, নৈতিকতা, মানবিকতা সব দিক থেকেই উন্নয়নের প্রশস্ত সরণিতে বাংলাদেশ সপ্রতিভ পদচারণায় মুখরিত হোক -এই হোক দর্শন দিবসের শুভ কামনা।   
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, দর্শন বিভাগ
  সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ, বগুড়া
০১৭১১-১০০৯৪৩