বায়ুদূষণ: আয়ু ও বুদ্ধিমত্তা দু’টোই কমায়

 বায়ুদূষণ: আয়ু ও বুদ্ধিমত্তা দু’টোই কমায়

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বায়ু অপরিহার্য। শুধু মানুষই নয়, জীবমাত্রই বায়ু গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনই একজন পুনবয়স্ক মানুষের দুই হাজার লিটার নির্মল বায়ুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে বায়ু বিশুদ্ধ না হলে এই আবশ্যিক উপাদানটিই মানুষের প্রাণঘাতীর কারণ হতে পারে। আর এই নির্মল বায়ুর সংকট আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই তীব্র হচ্ছে। মূলত উন্নয়ন কর্মকান্ডে ব্যবহৃত ইটের ধুলা, নির্মাণ সামগ্রীর ধুলা, রাস্তা খোঁড়াখুড়ির ধুলায় রাজধানীর বায়ুদূষণের মাত্রা শুধুই বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে শুষ্ক মৌসুমে ড্রেনেজ নির্মাণ, বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কাজের কারণে মাটি খোঁড়াখুড়ির জন্য ধুলার আধিক্য বেশি থাকে। এর ওপর তো বাড়তি যানবাহনের কারণে নষ্ট রাস্তায় ধুলার চাপে বিপর্যস্ত হচ্ছে নগরজীবন। ফলে ধুলা আগ্রাসনে রাজধানী ঢাকার অবস্থা এখন অনেক বেশি কাহিল। এ নিয়ে দুস্তর লেখালেখি হয় ঠিকই, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না, অবস্থারও খুব একটা উন্নতি হয় না।

 এ অবস্থায় নাকে রুমাল দিয়ে চলতে চলতে নগররবাসীর কাছে এটাই এখন যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে! অথচ নগর উন্নয়নে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মাটি খোঁড়ার পর শুকনো মাটিকে নিয়মিত পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখার উদ্যোগ নিলে অনেকাংশেই ধুলার আগ্রাসন রোধ করা সম্ভব। কিন্তু জনভোগান্তি, জনদুর্ভোগ, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করা যাবে না মর্মে সরকারিভাবে আইন থাকলেও আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ নেই। ফলে রাস্তা খোঁড়াখুড়ির পর কাজ সমাপ্তের মেয়াদ পার হয়ে মাসের পর মাস জনদুর্ভোগ বাড়ালেও সে দিকে যেন কারো কোন নজর থাকে না। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মন্তব্য করেছেন, উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখতে হলে রাস্তা খোঁড়ার কেন বিকল্প থাকে না। তবে, আমরা চেষ্টা করছি, উন্নয়ন কাজের কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনার। বাস্তবে জনস্বার্থের কথা সবাই বলেন, কিন্তু প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থ রক্ষা হয় না। অথচ জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা উচিত। কারণ জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় না নিলে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়তেই থাকবে। আর বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়লে মানুষের আয়ুওও কমে আসবে, এটাই স্বাভাবিক।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, দুষিত বাতাসের কারণে সৃষ্ট ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ। তবে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুদূষণ মৃত্যু ঘটানোর পাশাপাশি মানুষের আয়ুও কমায়। প্রথমবাবের মতো বায়ুদূষণের সঙ্গে মানুষের আয়ুর সম্পর্ক নিয়ে আর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘকাল বায়ুদূষণের শিকার হলে মানুষের বুদ্ধিমত্তাও হ্রাস পেতে পারে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে নেতিবাচক প্রভাবটি বাড়তে থাকবে এবং কম শিক্ষিত পুরুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি বাজে আকার ধারণ করবে। চীনে চার বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ মানুষ ক্ষতিকর মাত্রার বায়ু দূষণের মধ্যে বসবাস করছে। চীনের ২০ হাজার মানুষের ওপর গবেষণাটি চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একটি যৌথ গবেষক দল। এই গবেষণায় বায়ুদূষণের শিকার ব্যক্তিদের গণিত ও মৌখিক কিছু পরীক্ষা দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, তাদের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করা। গবেষকরা দেখেছেন, বায়ুদূষণের শিকার ব্যক্তিরা সে সব পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি। এরপরও অনুমান করা হয়, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের যেমন জটিল কিছু কিছু রোগের জন্ম হতে পারে এবং দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের শিকার হওয়া মানুষের মৃত্যুও ঘটে, সেহেতু মানুষের বুদ্ধিমত্তাও কমতে পারে বলে গবেষকগণ মন্তব্য করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেকটস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বায়ুতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান পিএম ২.৫ সবচেয়ে বেশি নির্গত হয়। গত কয়েক বছরে সে অবস্থানকে টপকে সে স্থান দখল করেছে ভারত। আর ভারত ও চীনের পরের স্থানটি এখন দখলে রয়েছে বাংলাদেশের। সেই হিসেবে বিশ্বে দুষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে এখন ঢাকা। আর শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি শহর। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ১২ হাজার ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটছে বায়ুদূষণের কারণে। আর একই কারণে শিশু মৃত্যুর হারের অবস্থানের দিক থেকে পাকিস্তানের পরের স্থানটি এখন বাংলাদেশের দখলে। কিন্তু বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রতিবেদনটিতে ওঠে এসেছে, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেছিলেন, দেশে ব্যাপক ভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ড চলছে। ফলে প্রয়োজনের তাগিদে ইটভাটার সংখ্যাও বাড়ছে। আর ইটভাটার অবস্থান মূলত গ্রাম ও নি¤œাঞ্চল কেন্দ্রিক। এরপরও শহরাঞ্চলে যে পরিমাণ ধুলার আধিক্য বাড়ছে, তার অন্যতম কারণ উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড। তিনি এ কারণেই বায়ুদূষণের ফলে যে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, তা মানতে নারাজ।

 তবে, বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হলে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে বলে সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরও মনে করে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক বায়ুদূষণ ২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, এখনও চীন ও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের বায়ুদূষণ কম মাত্রায় রয়েছে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা শুষ্ক মৌসুমে বেশি থাকে। বাস্তবে ঢাকা শুধু বায়ুদূষণের কারণেই আক্রান্ত নয়, শব্দ দুষণ, মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে ঢাকার বায়ুতে বাড়তি উত্তাপও একটি বড় সমস্যা। সে সমস্যা নিরসনে সরকার ডিজেল, পেট্রোল চালিত যানবাহনগুলোকে গ্যাসে রূপান্তর করে নগর-মহানগরগুলোর যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানেও বিপত্তি! ইতিমধ্যেই গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন আমদানিকৃত এলএনজি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। শোনা যাচ্ছে, এলএনজি ব্যবহার করলে পরিবহনের খরচও বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ খরচ বৃদ্ধি পাওয়া মানে ভাড়া বৃদ্ধি। ঘুরে ফিরে সাধারণ যাত্রীদেরকে বাড়তি খরচে চলাচল করতে হবে। তাও ভালো, যদি যানবাহনে গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করে শিল্প কলকারখানাগুলোকে নির্বিঘœভাবে চালু রাখা যায়, তাহলেও অর্থনীতির চাকা ভালভাবে ঘুরবে। আর অর্থনীতি চাঙ্গা হলে দেশের সমৃদ্ধি আসবে। পাশাপাশি এলএনজি ব্যবহার বাড়লে যানবাহনের কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধ হলে বাতাসে দূষণের মাত্রাও কমে আসবে। বিলম্বে হলেও সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে ভালো কাজ করেছে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা, এর কার্যকারিতা সম্পন্ন করতে কতদিন সময় লাগে?

বায়ুদূষণ বিষয়ক গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, তিনি টানা ১০ বছর ঢাকা ও বাংলাদেশের বায়ুদুষণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া ও ধুলা থেকে বাতাসে ক্ষুদ্র কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। মূলত কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি হয়। শিল্প কলকারখানার ধোঁয়া ও যানবাহনের ধোঁয়ার বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশির কারণে সংকট দিনদিন ঘনিভূত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, এখন বিশ্বের বড় বড় অনেক শহরের চেয়ে ঢাকার বায়ু দূষণের পরিমাণ তুলনামূলক কম। তবে বায়ু দূষণের কারণগুলো নিবৃত্ত করা না গেলে এ সংকট অদুর ভবিষ্যতে তীব্র হবে। শুধু ঢাকা শহর যে বায়ুদূষণের কারণেই একমাত্র আক্রান্ত হচ্ছে, তা নয়, পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নগরগুলোতেও বায়ুদূষণের মাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি অনাবৃষ্টির কারণে ধুলার আগ্রাসনে বায়ুদূষণ বাড়ছে। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য নির্মল পরিবেশের কোন বিকল্প নেই। এখন মহানগরগুলোয়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার নির্মল পরিবেশ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। ঢাকাকে ঘিরে থাকা নদ-নদী, নালা, নর্দমায় প্রতিদিন শত শত টন তরল বর্জ্য নির্গত হচ্ছে। এতে করে পানি কালো রং ধারণ করে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদ-নদী, নালা, নর্দমা থেকে উৎকট গন্ধে সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যস্ত পরিবেশের। এসব এলাকার নির্মল বায়ু দুষিত বায়ুতে পরিণত হয়েছে। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। এসব কারণে রাজধানীর বায়ু দূষণের মাত্রা ক্রামান্বয়েই বাড়ছে। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, সুস্থ দেহে বেঁচে থাকতে হলে নির্মল বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহকে যে কোন মূল্যেই নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নগর-মহানগরে বসবাসরত মানুষের আয়ু ও বুদ্ধিমত্তা দু’টোকে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণের কবল থেকে কোমলমতি শিশুদের রক্ষা করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিমত্তা ও আয়ু দু’টোয় বাধাগ্রস্ত হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮